বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন




শেষ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু টানেলের কাজ, চালু জানুয়ারিতে

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২২ ৬:০১ am
সুড়ঙ্গ karnaphuli Bangabandhu Sheikh Mujibor Rahman Tunnel কর্ণফুলী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল সুড়ঙ্গ
file pic

বাংলাদেশের জন্য আরেক বিস্ময়, আরেকটা গৌরব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর গভীরের প্রকল্প। চট্টগ্রামবাসী অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন চালু হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণের। তাদের কাছে স্থানীয়ভাবে এই টানেলের পরিচিতি বঙ্গবন্ধু টানেল নামে। আগামী জানুয়ারিতে খুলে দেয়া হবে যাতায়াতের জন্য।

টানেলের দক্ষিণ টিউবের পূর্ত কাজের সমাপ্তি উদ্যাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ভার্চ্যুয়ালি যোগ দেবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তত্ত্ববাবধানে গত বৃৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে সাংবাদিকদের একটি টিমকে সরজমিন দেখাতে নিয়ে আসা হয়েছে টানেল পয়েন্টে। গতকাল টানেল এরিয়ায় দেখা যায়, পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে শুরু হওয়া টানেল শেষ হয়েছে আনোয়ারায়।

কর্ণফুলী নদীর ১৫০ ফুট তলদেশে তৈরি এই বঙ্গবন্ধু টানেল সত্যিই এক বিস্ময়। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত যেতে সময় লেগেছে মাত্র চার মিনিট। এতে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে সময় ও পথের সাশ্রয় হবে অনেক। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য মূলত যেটা বলা হয় স্ট্রাকচার বা আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন। সেই অবকাঠামো উন্নয়নের চূড়ান্ত মাইলফলক হচ্ছে কর্ণফুলী তলদেশ দিয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করেছেন। তার সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগ আছে, বিদেশি বিনিয়োগ আছে। দেশীয় উৎপাদন বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে, একইভাবে বিদেশেও ছড়িয়ে যাবে। সেজন্য দরকার আমাদের রাস্তাঘাট, ব্রিজ এবং বন্দর। এই টানেলের সঙ্গে মাতারবাড়ির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আছে।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যাওয়ার ৪০ কিলোমিটার কমে যাবে। সময় বাঁচবে, দ্রুততর হবে। যারা কাজ করে তাদের সময় বাঁচা মানে খরচ কমে যাওয়া। এই টানেল আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে বিশাল অর্জন। আগামী জানুয়ারি থেকে যান চলাচলের আশা করে মুখ্যসচিব বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আল্লাহর রহমতে প্রধানমন্ত্রী এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন, শক্ত ভিত্তি যেটা বলে সেটার ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ভূমিকম্পকে সাসটিং করার মতো যে রকম দালান তৈরি হয়েছে, আমাদের অর্থনীতি আল্লাহর রহমতে সেই রকম অবস্থানে আছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আইএমএফ দল এসে বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টর পর্যালোচনা করে দেখেছে। যদি মার্কিংয়ের হিসাব করা হয় তাহলে বাংলাদেশ পেয়েছে এ প্লাস। এই যে এ প্লাস পেয়েছে এটা কিন্তু একদিনে হয় নাই। বিভিন্ন নীতি, পদ্ধতি এবং উন্নয়নমূলক কাজের ফলাফলের হিসাবে সেটা হয়েছে। আমরা উন্নয়নশীল দেশ হচ্ছি। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য যে সমস্ত নীতি, কৌশল নেয়ার কথা সেটা ইতিমধ্যে প্রণীত হয়েছে। আইএমএফ’র দল সেটি দেখে ইম্পেস্ট হয়েছে। এই যে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যাওয়া, তার একটা নবদিগন্ত বা নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে কর্ণফুলী টানেল। আমি আজকে টিউবের মাঝখান দিয়ে এসেছি। একটু আগে শাহ আমানত ব্রিজ পার হয়ে গিয়েছিলাম। সারাজীবন আমাদের কল্পনা ছিল নদী পার হতে হলে উপর দিয়ে যেতে হবে, নৌকা দিয়ে যেতে হবে, না হলে একটা ব্রিজ দিয়ে যেতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মিত হচ্ছে। আমার বাড়ি পটিয়া, পটিয়া থেকে কর্ণফুলী টানেল দিয়ে এসেছি।

নিজেদের গর্বিত হওয়ার মতো, এর চাইতে আর কি হতে পারে? নিজেদের ওপরে নিজেদের যে আত্মসম্মান বৃদ্ধি এর চাইতে আর কি বড় নিদর্শন হতে পারে। গতকাল প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত ছিলেন, সেতু বিভাগের সচিব মো. মনজুর হোসেন, প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ। সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীর তলদেশে নির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল এটি। কর্ণফুলী নদীর দুই তীরকে সংযুক্ত করে চীনের সাংহাই শহরের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে টানেল প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেতু বিভাগ। দুই টিউব সংবলিত মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এই দুই টিউব তিনটি সংযোগ পথের (ক্রস প্যাসেজ) মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। বিপদকালীন সময়ে অন্য টিউবে গমনের জন্য এই ক্রস প্যাসেজগুলো ব্যবহৃত হবে। মানবজমিনকে তারা জানান, টানেল টিউবের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিমি এবং ভেতরের ব্যাস ১০ দশমিক ৮০ মিটার। ২০১৬ সালের ১৪ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং টানেল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৯ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম টানেল টিউবের বোরিং কাজ উদ্বোধন করেন এবং ২০২০ সালের ১২ই ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দ্বিতীয় টিউবের বোরিং কাজ উদ্বোধন করেন। চীনের এক্সিম ব্যাংক এই প্রকল্পের জন্য ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়। বাকি টাকার জোগান দেয় বাংলাদেশ সরকার।

চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি টানেলটি নির্মাণ করছে। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, ৩ দশমিক ৩২ কিমি দীর্ঘ টানেলটি কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে পশ্চিম প্রান্তে পতেঙ্গা নেভাল একাডেমির নিকট হতে শুরু হয়ে পূর্ব প্রান্তে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল) এবং কর্ণফুলী সার কারখানার (কাফকো) মাঝখান দিয়ে আনোয়ারা প্রান্তে পৌঁছেছে। মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম প্রান্তে (পতেঙ্গা) ০.৫৫০ কিমি ও পূর্ব প্রান্তে (আনোয়ার) ৪.৮ কিমিসহ মোট ৫.৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক রয়েছে। এ ছাড়াও আনোয়ারা প্রান্তে সংযোগ সড়কের সঙ্গে ৭২৭ মিটার ভায়াডাক্ট (উড়াল সড়ক) রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গবন্ধু টানেলের কাজ যত এগিয়েছে ততই স্থাপিত হচ্ছে নতুন নতুন শিল্প কারখানা, আসছে নতুন বিনিয়োগ। আবার পুরনো অনেক কারখানাও সম্প্রসারিত হচ্ছে। অনেক বড় বড় শিল্প গ্রুপ ইতিমধ্যেই কারখানা গড়ে তোলার চিন্তা থেকে কিনে রেখেছেন আগাম জমি। সবমিলিয়ে কর্ণফুলী টানেল বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ল্যান্ডস্কেপে আনছে বড় ধরনের পরিবর্তন। দক্ষিণ চট্টগ্রাম হয়ে উঠছে দেশের নতুন বিজনেস হাব। গত চার বছরে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে গার্মেন্ট, জাহাজ নির্মাণ, ভোজ্য তেল, মাছ প্রক্রিয়াকরণ, ইস্পাত, সিমেন্টসহ অন্তত ৮০টি শিল্প কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনও শুরু করেছে। টানেল নির্মাণের আগে ২০১৩ সালে করা সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, টানেল চালুর পর এর ভেতর দিয়ে বছরে ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারবে। সে হিসাবে দিনে চলতে পারবে ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি। ২০২৫ সাল নাগাদ টানেল দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচল করবে। যার মধ্যে অর্ধেক থাকবে পণ্যবাহী যানবাহন। ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন গড়ে ৩৭ হাজার ৯৪৬টি এবং ২০৬৭ সাল নাগাদ ১ লাখ ৬২ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। টানেল নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বাকি ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা দিচ্ছে চীন সরকার। চীনের এক্সিম ব্যাংক ২ শতাংশ হারে ২০ বছর মেয়াদি এ ঋণ দিয়েছে। চীনের কমিউনিকেশন ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) টানেল নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। তবে ডলারের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়বে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD