মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৮:৫৯ পূর্বাহ্ন




সঞ্চয়পত্র, ব্যাংকে আমানত থাকলে কীভাবে রিটার্ন দেবেন

মো. জাহাঙ্গীর আলম
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২২ ৭:৩৭ am
করদাতা nbr National Board of Revenue জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর nbr আয়কর রিটার্ন Income tax tax-retern
file pic

আপনার আয়কর নথিতে যদি সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত, ডিপোজিট পেনশন কর্মসূচি বা ডিপিএসের সঠিক বিবরণ না থাকে, তবেই বিপত্তি। সঠিকভাবে সঞ্চয়ের হিসাব নথিভুক্ত না হলে তার খেসারত দিতে হয়। গুনতে হয় অতিরিক্ত আয়কর। এমনকি জেল বা জরিমানাও হতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, করদাতাদের একাধিক ব্যাংক হিসাব থাকলেও আয়কর নথিতে সব তথ্য না দিয়ে আয়কর রিটার্ন জমা দেন অনেকে। আবার রিটার্নে দেখানো ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আয়কর নথিতে যে আয় দেখানো হয়েছে, ব্যাংকে লেনদেন তার চেয়ে বেশি; অর্থাৎ আয়কর রিটার্নের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই।

কিন্তু মনে রাখা দরকার, আয়কর রিটার্ন বিভিন্ন সময় পর্যালোচনা করা হয়। যেমন,

(১) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতিবছর কিছু আয়কর রিটার্ন নিরীক্ষা করে।

(২) কিছু আয়কর রিটার্ন যুগ্ম কর বা অতিরিক্ত কর কমিশনারের পক্ষ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয়, আয়করের ভাষায় যাকে অর্থোডক্স বলা হয়।

(৩) কর পরিদর্শন বিভাগ বা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলও কিছু আয়কর নথি পর্যালোচনা করে।

(৪) উপকর কমিশনার (ডিসিটি) যেকোনো সময় যুগ্ম কর কমিশনার বা অতিরিক্ত কর কমিশনারের অনুমতি সাপেক্ষে ৯৩ ধারায় ফাইল পুনঃ উন্মোচন করতে পারেন। আয়কর আইনে ছয় বছর পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন পুনরায় চালু করা যায়।

(৫) আয়কর কার্যালয় বিভিন্ন সময় ব্যাংক হিসাব তলব করে তথ্য বের করতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের ডেটাবেজ, যেমন সঞ্চয় অধিদপ্তরের ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

সঞ্চয়পত্র

(১) যে অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র কেনা হয়, সেই বছরই নির্দিষ্ট হারে বিনিয়োগের রেয়াত সুবিধা নিতে হবে। কেবল সংশ্লিষ্ট বছরেই আয়কর রেয়াত পাওয়া যাবে। অন্য কোনো বছর রেয়াত পাওয়া যাবে না

(২) সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত সুদ চূড়ান্ত কর দায়; অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র থেকে যে সুদ পাওয়া যায় এবং যে পরিমাণ টাকা উৎসে আয়কর হিসেবে কেটে রাখা হয়, সেটাই চূড়ান্ত কর দায়। ধরা যাক, মোহাম্মদ জাফর সঞ্চয়পত্র থেকে ৫ লাখ টাকা সুদ পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর হিসেবে তাঁর কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা কেটে রাখা হয়। ফলে তিনি প্রকৃতপক্ষে সুদ পেয়েছেন পৌনে ৫ লাখ টাকা। ফলে জাফরকে ২৫ হাজার টাকার বাইরে সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত সুদের জন্য আর কোনো আয়কর দিতে হবে না।

(৩) সঞ্চয়পত্র কেনার ফটোকপি, আয়কর রিটার্নের সঙ্গে জমা দিতে হয়।

(৪) সঞ্চয়পত্র ভাঙানো, প্রাপ্ত সুদ এবং উৎসে আয়কর কেটে রাখার প্রমাণপত্র বা সার্টিফিকেট রিটার্নের সঙ্গে জমা দিতে হবে।

স্থায়ী ও মেয়াদি আমানত

আয়কর নথিতে স্থায়ী আমানত-সংক্রান্ত (এফডিআর) বিষয়ে বেশ কিছু মিশ্র ধারণা আছে। অনেকেই বিনিয়োগ হিসেবে স্থায়ী আমানতকে বিবেচনা করেন। আবার সম্পদ বিবরণীতে দেখালেও প্রতিবছরের সুদ বা মুনাফা হিসাবভুক্ত করেন না। এ‌ ক্ষেত্রে প্রতিবছর সঞ্চয়ী ব্যাংক হিসাবের বিবরণীর মতো স্থায়ী আমানতের বিবরণীও তুলতে হবে।

(১) যে বছর স্থায়ী আমানত বা এফডিআর খোলা হবে, সেই বছরই তা সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হবে।

(২) কিছু কিছু স্থায়ী আমানত থেকে প্রতিবছর সুদ বা মুনাফা উত্তোলন করা যায়। এই সুদ বা মুনাফা আয়কর ফাইলে অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে দেখাতে হবে।

(৩) কিছু স্থায়ী আমানতের মেয়াদ শেষে সুদ প্রদান করা হয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। মেয়াদ শেষে মুনাফা প্রদান করলে যে বছর মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে, সংশ্লিষ্ট কর বছরেই তার সনদ আয়কর নথিতে যথাযথভাবে দেখাতে হবে।

ডিপিএস

ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা রাখাকেই ডিপিএস হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিছু ব্যাংক মাসিক, ত্রৈমাসিক বা ছয় মাস অন্তর বা বছর ভিত্তিতে সুদ দেয়। কিছু ব্যাংক সুদ বা মুনাফার ওপর উৎসে আয়কর কেটে রাখে। আবার কিছু ব্যাংক বছর বছর উৎসে কর না কেটে মেয়াদ শেষে উৎসে আয়কর কেটে রাখে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষÿরাখতে হবে।

(১) বার্ষিক ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ সুবিধা পাওয়া যাবে।

(২) যদি প্রতিবছর মুনাফা বা সুদের ওপর উৎসে আয়কর কেটে রাখে, তাহলে (গ্রস) সুদ বা মুনাফা অন্যান্য উৎসে আয় হিসেবে দেখাতে হবে। বছর শেষে স্থিতি সম্পদ বিবরণীতেও তা দেখাতে হবে।

(৩) মুনাফা ব্যাংক বিবরণীতে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু উৎসে আয়কর কেটে রাখছে না। এ ক্ষেত্রেÿযে বছর মেয়াদপূর্তি বা ভাঙানো হবে, সে বছর পুঞ্জীভূত মুনাফা অন্যান্য উৎসের আয় হিসেবে দেখাতে হবে।

(৪) প্রতিবছরের ব্যাংক বিবরণী নিতে হবে এবং ভাঙানোর সময় সনদ নিতে ভুল করা যাবে না।

ব্যাংক হিসাব

ব্যাংকে যে লেনদেন হবে, তা অবশ্যই আপনার আয়কর নথিতে প্রদর্শিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্য কোনো প্রকার লেনদেন হলে তার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা থাকতে হবে। মোট ব্যাংক সুদ বা মুনাফা অন্যান্য উৎসের আয় হিসেবে রিটার্নে দেখাতে হবে। সে ক্ষেত্রে উৎসে কর প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় হবে।

অন্যান্য

সিটি করপোরেশনের মধ্যে যাঁদের গৃহ-সম্পত্তি নেই, বিনিয়োগ করেননি এবং ৪০ লাখÿটাকার কম যাঁদের মোট পরিসম্পদ, তাঁরা ১ পাতার ফরম ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যরা সুবিধাজনক ফরম ব্যবহার করবেন বা অনলাইনে আয়কর জমা দিতে পারবেন।
এ সময়ের মধ্যে যাঁদের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া খুবই কষ্টকর, তাঁরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত ফরমে সময় চেয়ে আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ২% হারে বিলম্ব সুদ আরোপযোগ্য হবে। উপকর কমিশনার দুই মাস সময় এবং যুগ্ম/অতিরিক্ত কর কমিশনার পরবর্তী সময়ে আরও দুই মাস সময় মঞ্জুর করতে পারবেন। তবে সময় বাড়ানোর জন্য করদাতাকে যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে হবে। যাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হবেন, তাঁদের জরিমানা গুনতে হবে।

লেখা:মো. জাহাঙ্গীর আলম, আয়কর আইনজীবী




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD