‘ওলে ওলে আর্জেন্টিনা, ভামোস আর্জেন্টিনা’ গানে মুখরিত লুসাইল স্টেডিয়াম। কাতারের এই স্টেডিয়াম যেন আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স। ৮৮ হাজার দর্শকের মধ্যে ৬০ হাজারের বেশি ছিলেন মেসি ভক্তরাই। আর্জেন্টিনার জয় মানে উল্লাস। অন্য ম্যাচের তুলনায় আজ ছিল বেশি। ৩-০ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছে!
বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি তার সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপটা রাঙিয়ে তুললেন। নিজে এক গোল করেছেন, আরেক গোল করিয়েছেন, অবদান রেখেছেন আরও এক গোলেও৷ পাঁচ গোল করে গোল্ডেন বুটের যেমন দাবিদার তেমনি গোল্ডেন বলেও সমান দাবি রাখবেন এই আর্জেন্টাইন।
মেসির ঝলকের সাথে এই ম্যাচে আলো কেড়েছেন ইউলিয়ান অ্যালভারেজ। ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি করেছেন তিনি। কিক অফ জোন থেকে বল একাই টেনে নিয়ে গেছেন। দুই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে গোল করেছেন। অ্যালভারেজের এই গোল আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোলকেও যেন স্মরণ করিয়ে দিলো একটু করে।
৩৯ মিনিটে অ্যালভারেজের করা গোলের আগে ম্যাচের লিড এনে দেন অধিনায়ক মেসি। পেনাল্টি থেকে গোল করেন এই মহাতারকা। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড অ্যালভারেজকেকে ফাউল করেন ক্রোয়েট গোলরক্ষক। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ডিফেন্ডার পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক করায় তাকেও একটি কার্ড দেন। ক্রোয়েট গোলরক্ষক ব্রাজিলের বিপক্ষে পেনাল্টি শ্যুটআউটে শট রুখে দিলেও আজকের ম্যাচে ব্যর্থ হয়েছেন।
পেনাল্টিতে গোল খাওয়ার আগ পর্যন্ত ম্যাচের চিত্র ছিল ভিন্ন। ক্রোয়েশিয়া দারুণ ভাবে খেলায় ছিল। বল পজেশন, আক্রমণ সব কিছুতেই এগিয়ে ছিল। আর্জেন্টিনা কাউন্টার অ্যাটাকেই খেলার চেষ্টা করেছে। ত্রিশ মিনিটে বল পজেশন ও আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও গোলের সুযোগ সেভাবে তৈরি করতে পারেনি। ৩৪ মিনিটে পেনাল্টির পরই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া; যারই ফল, পাঁচ মিনিট পর আরও এক গোল হজম!
দ্বিতীয়ার্ধে ক্রোয়েশিয়া শুরুতে দুই জন খেলোয়াড় বদল করে। খেলোয়াড় বদল করেও ম্যাচের চিত্র বদলাতে পারেননি। এই অর্ধে মেসিদের নিয়ন্ত্রণ ছিল আরো বেশি। ৬৮ মিনিটে মেসির বাড়ানো দুর্দান্ত পাসে অ্যালভারেজ প্লেসিংয়ে গোল করেন৷ এই গোলের মাধ্যমে গত আসরে ০-৩ গোলে হারের মধুর প্রতিশোধও নেওয়া হয়ে যায়৷
ক্রোয়েশিয়ার তারকা ফুটবলার লুকা মদ্রিচকেও উঠিয়ে নেন কোচ দালিচ। ফলে ম্যাচের বাকি সময় ছিল শুধু আর্জেন্টিনার জয়ের অপেক্ষা। শেষে আকাশি-সাদাদের বিপদসীমায় বহুবার আঘাত হেনেছে ক্রোয়াটরা। তবে লাভ হয়নি, চোয়ালবদ্ধ রক্ষণে সব সামলেছেন নিকলাস অটামেন্ডিরা। যাতে ৩-০ গোলের জয় নিয়েই আর্জেন্টিনা চলে যায় বিশ্বকাপের ফাইনালে।
মাঠে নামলেই রেকর্ড গড়বেন মেসি, এটা জানা ছিলোই। আরও রেকর্ড অপেক্ষা করছিলো তার জন্য। এ জন্য প্রয়োজন ছিল মেসির একটি গোল।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে মাঠে নেমে গোলও পেলেন মেসি। মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলো অন্তত দুটি রেকর্ড। একটি রেকর্ডে ভাগ বসালেন এবং সে সঙ্গে পেনাল্টি থেকে গোল করে অন্য আরও একটি রেকর্ড গড়ে ফেললেন আর্জেন্টাইন মহা তারকা।
লুসাইল স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নেমেই বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন মেসি। এতদিন তার নামের পাশে শোভা পাচ্ছিল বিশ্বকাপের ২৪টি ম্যাচ। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলো ২৫টি ম্যাচ।
বিশ্বকাপে এতদিন সর্বাধিক ২৫টি ম্যাচ খেলে শীর্ষে ছিলেন জার্মানির লোথার ম্যাথাউস। এবার মেসি এই রেকর্ডে বসে গেলেন তার পাশে। এই বিশ্বকাপেই ম্যাথাউসকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটা গড়ে ফেলনে আর্জেন্টাইন তারকা। এমনিতেই প্রথমার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে। জিতলে তো ফাইনাল খেলবেনই। হেরে গেলেও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলবেন। তাতে রেকর্ডটা হবেই।
সেমিফাইনাল খেলতে নেমে আরও একটি রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন মেসি। বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসাবে এই ম্যাচের আগ পর্যন্ত ১৮টি ম্যাচ খেলে মেসি বসেছিলেন মেক্সিকোর সাবেক অধিনায়ক রাফায়েল মার্কুয়েজের সঙ্গে। আজ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার পর অধিনায়ক হিসাবে মেসির হয়ে গেলো ১৯ ম্যাচ। বিশ্বকাপে এটা একটা রেকর্ড।
এই তো গেলো মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ড। এরপর পেনাল্টি থেকে গোল করে আরও একটি রেকর্ড গড়লেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে মেসি এবং গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার গোল ছিল সমান ১০টি করে। আজ পেনাল্টি থেকে গোল করে নতুন রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন তিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে এখন সর্বোচ্চ ১১টি গোল লিওনেল মেসির।
এই বিশ্বকাপেই ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে যান মেসি। ম্যারাডোনার ছিল ৮ গোল। মেসি এখনও পর্যন্ত এই বিশ্বকাপে করলেন ৪ গোল।