রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০২:১০ পূর্বাহ্ন




রাষ্ট্র রূপান্তরের ২৮ দফা রূপরেখা দিচ্ছে বিএনপি

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২২ ১২:৩৩ am
Bangladesh Nationalist Party BNP ‎বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি
file pic

সরকার পতন আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে ১০ দফা ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। যুগপৎ আন্দোলনের ১০ দফার প্রথম কর্মসূচি শুরু হচ্ছে আগামী ২৪শে ডিসেম্বর। যদিও এ তারিখটি পরিবর্তন হতে পারে। বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য বর্তমান সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সমন্বেয়ে রাষ্ট্র সংস্কার বা শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন চায় সমমনা দলগুলো। এনিয়ে ২০ দলীয় জোট, গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন শীর্ষ নেতারা। বিএনপি’র বিভাগীয় সমাবেশ চলাকালীন সময়ে খসড়া করে, সমমনাদের দাবি- দাওয়া যুক্ত করে তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহের যে কোনো দিন সংবাদ সম্মেলন করে রাষ্ট্র রূপান্তরের ২৮ দফা প্রস্তাবনার ঘোষণা দেবে বিএনপি। এর আগে ২৭ দফার কথা বলা হলেও সম্প্রতি নতুন আরেকটি দফা যুক্ত করেছে বিএনপি। দলীয় একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

যুগপৎ আন্দোলনের পাশাপাশি রাষ্ট্র রূপান্তরের রূপরেখা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছিল দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম। চলমান আন্দোলনের মধ্যেই গত ১৫ই নভেম্বের ২৭ দফা রূপরেখা প্রকাশ করতে চেয়েছিল দলটি। এর আগে বিএনপি’র জোট ও গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও তা আর হয়নি। সর্বশেষ গত ৭ই ডিসেম্বর লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করে ৮ই ডিসেম্বর রূপরেখা দেয়ার কথা ছিল। তবে এর একদিন আগে নয়া পল্টনে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের কারণে সেটিও পিছিয়ে যায়। এরই মধ্যে যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যে ঢাকার সমাবেশ থেকে ১০ দফা ঘোষণা করা হয়। বিএনপি’র সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ১০ দফায় সমর্থন দিয়েছে অন্যান্য দলগুলো। গণতন্ত্র মঞ্চ আলাদাভাবে ১৪ দফা দিয়েছে। তাদের দাবিগুলোর অনেকটা বিএনপি’র ১০ দফার মধ্যেও আছে।

গণতন্ত্র মঞ্চ তাদের দফায় রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে। ওদিকে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলন এগিয়ে নিতে দু’-একদিনের মধ্যে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করবে বিএনপি। তাদের উপস্থিতিতেই ২৮ দফা রূপরেখা ঘোষণা করবে দলটি।

এর আগে রাষ্ট্রের সার্বিক মেরামতের রূপরেখায় বিএনপি যে ২৭টি বিষয় উল্লেখ করেছে সেখানে বলা হয়েছে- সরকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে হীনউদ্দেশ্যে অযৌক্তিক মৌলিক সাংবিধানিক সংশোধনী করেছে। বিএনপি একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’- গঠন করে অত্যাবশ্যকীয় সাংবিধানিক সংস্কার করবে। সেখানে গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করবে।

প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সকল মত ও পথের সমন্বয়ে, পারস্পারিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে করবে। এজন্য একটি জাতীয় সমঝোতা কমিশন গঠন করবে। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করবে। সংসদ সদস্যদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। রাষ্ট্রপতি ও সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য রক্ষা করা হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সুসমন্বয় করা হবে। দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট’ আইনসভা গঠন করা হবে। একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন করার লক্ষ্যে বর্তমান “নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন” সংশোধন করা হবে। ইভিএম বাদে, সকল কেন্দ্রে পেপার-ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদান নিশ্চিত করাসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল করা হবে।

বর্তমান বিচারব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি ‘জুডিশিয়াল কমিশন’- গঠন করবে। বিচারবিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকিবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসন প্রশ্নে সংবিধানে বর্ণিত ইতিপূর্বেকার ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’- ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হইবে। সংবিধানের ৯৫(গ) অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ড সংবলিত ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’ প্রণয়ন করা হবে।

প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন করে সৎ সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা হবে। সেই সঙ্গে চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাসহ সকল সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। দেশের বাইরে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ করা হবে। গত দেড় দশক ধরে সংঘটিত সকল বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ারের নামে নির্বিচারে হত্যা, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ, নির্মম শারীরিক নির্যাতন, নিষ্ঠুর ও অমানবিক অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল ব্যক্তির সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, কর্পোরেট নেতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’- গঠন করা হবে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’- এই মূলনীতির ভিত্তিতে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করতে পারবে।

বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হবে। ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একটি তালিকা প্রণয়ন ও যথাযথ মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নেয়া হবে। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপি’র ৫% অর্থ বরাদ্দ ও জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপি’র ৫% অর্থ বরাদ্দ করা হবে।

এদিকে বিএনপি ঘোষিত যুগপৎ আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি শুরু হচ্ছে আগামী ২৪শে ডিসেম্বর। দলটির সঙ্গে একইদিন ঢাকা সহ সারা দেশে গণমিছিল করবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। গণতন্ত্র মঞ্চ থেকেও বলা হয়েছে-বিএনপি’র সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকবেন মঞ্চের নেতারা। যদিও সেদিন একত্রে কিংবা ভিন্নভিন্নভাবে গণমিছিল করবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। মঞ্চের নেতারা বলছেন- বিএনপি’র সঙ্গে লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের পর তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবেন। এছাড়া একইদিনে ঢাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হওয়ার কথা। একই দিনে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি থাকায় বিএনপি ও সমমনা দলের কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন হতে পারে। বিএনপি ইতিমধ্যে তারিখ পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এনিয়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মানবজমিনকে বলেন, ২৪ তারিখে আমাদের কর্মসূচি রয়েছে। এদিন গণমিছিল হবে। তবে পরিবেশ পরিস্থিতির উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। সময়ই বলে দেবে আমাদের কি করণীয়।

গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গতকাল রাতে মানবজমিনকে বলেন, রাষ্ট্র রূপান্তরের প্রস্তাবনা অনেক আগেই ঘোষণা করার কথা ছিল। বিএনপি একটি বড় দল, সবকিছু ঠিক করতে একটু সময় নিচ্ছে। অন্যদিকে দু’-একদিনের মধ্যেই বিএনপি’র সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন হবে। আমরা নাম পাঠিয়ে দিয়েছি। ২৪শে ডিসেম্বরের গণমিছিল নিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী ২৪ তারিখের কর্মসূচি পরিবর্তন হবে। [মানবজমিন]




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD