২০২২ সালের শেষ ১৫ দিনে বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে এসেছেন অন্তত ৮ লাখ পর্যটক। থাকা-খাওয়া, যাতায়াত এবং কেনাকাটার বিপরীতে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যবসা হয়েছে। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স ও হোটেলমালিকদের কাছ থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
কক্সবাজারে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও চাঙা ভাব ফিরে এলেও সুযোগ–সুবিধা বাড়ছে না বলে অভিযোগ পর্যটকদের। তাঁরা বলছেন, লোকজনের উপচে পড়া ভিড়ের সুযোগ নিয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকেরা অতিরিক্ত কক্ষভাড়া ও খাবারের বাড়তি দাম নিয়েছেন। সৈকতে নিরাপদ গোসলের (সুইমিং জোন) ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি। ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রের পানিতে গোসলে নেমে নিখোঁজ হলে জীবিত উদ্ধারে একজন ডুবুরিও নেই। সর্বশেষ গত ২৩ ডিসেম্বর সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে গোসলে নেমে স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে মারা গেছে কুমিল্লার এক মাদ্রাসাছাত্র।
সৈকতে সৃষ্ট গুপ্তখাল কিংবা বড় গর্তে আটকা পড়ে গত ১৮ বছরে ১২৪ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ ফোরামের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী।
জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, পর্যটকের নিরাপদ গোসলের জন্য সুইমিং জোন দরকার। গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটকদের দ্রুত উদ্ধারে ডুবুরিও প্রয়োজন। সৈকত রক্ষণাবেক্ষণে গঠিত সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা গেছে, এক কিলোমিটার সৈকতে কয়েক হাজার পর্যটকের সমাগম। সুগন্ধার উত্তরে সিগাল ও লাবণী এবং দক্ষিণ দিকের কলাতলী পয়েন্টের আরও তিন কিলোমিটারে কয়েক হাজার পর্যটকের উপস্থিতি চোখে পড়ে। বেশির ভাগ পর্যটক সৈকতের পানিতে নেমেছেন। কেউ দ্রুতগতির জলযান জেডস্কি নিয়ে গভীর সমুদ্রের জলরাশি ঘুরে আসছেন। বালুচরে বিচ বাইক ও ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাচ্ছেন এদিক–সেদিক। কিন্তু সন্ধ্যার পর বিনোদনের আর কিছুই নেই। তারপরও নামছে পর্যটকের ঢল।
পর্যটকদের কেউ ছুটছেন কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ ধরে দরিয়ানগর, হিমছড়ির ঝরনা, প্যাঁচারদ্বীপ সৈকত, পাথুরে সৈকত ইনানী, পাটোয়ারটেক, টেকনাফ সৈকত, মাথিন কূপ, নাফ নদীর মিয়ানমার সীমান্ত, জালিয়ারদিয়া, রামুর বৌদ্ধপল্লি, চকরিয়ার সাফারি পার্কে। কেউ বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে যাচ্ছেন মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, শুঁটকির রাজ্য সোনাদিয়া দ্বীপে।
ঢাকার মগবাজারের ব্যবসায়ী নাজমুল হক বলেন, গলাকাটা ব্যবসা ছাড়া পর্যটকের বিনোদন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর চিন্তা কারও মাথায় নেই। অরক্ষিত ও নির্জন এলাকায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে গেলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। তবু সমুদ্রের টানে লাখো মানুষ আসছেন-যাচ্ছেন। সমুদ্রটাও দিন দিন শ্রীহীন হয়ে পড়ছে।
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, ২৪ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ দিনে ভ্রমণে এসেছেন প্রায় ৫ লাখ পর্যটক। এর আগে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ দিনে এসেছেন আরও ৩ লাখ। সব মিলিয়ে ১৫ দিনে ভ্রমণে এসেছে ৮ লাখের মতো পর্যটক। বর্তমানে ৫০ হাজারের বেশি পর্যটক হোটেল গেস্টহাউস রিসোর্টে অবস্থান করছেন।
একজন পর্যটকের মাঝারি মানের হোটেলে দুই রাত তিন দিন অবস্থান করলে ভাড়া, খাওয়া, যাতায়াতের বিপরীতে গড়ে ১০ হাজার টাকা করে খরচ হয় বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, অনেকের ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকাও খরচ হয়। মাথাপিছু খরচ ১০ হাজার টাকা ধরলে ৮ লাখের মানুষের বিপরীতে ব্যবসা হয়েছে ৮০০ কোটি টাকার।
আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, লোকসমাগম বাড়তে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হলেও বিনোদনসহ পর্যটকের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর চিন্তা কারও নেই। ১২০ কিলোমিটার সৈকতের ১১৬ কিলোমিটার অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে যুগ যুগ ধরে। সৈকতের কোথাও নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা নেই। সমুদ্রের পানিতে গোসলে নেমে কেউ মারা গেলে দায়দায়িত্বও কেউ নেয় না।
বেড়েছে হোটেল ভাড়া, খাবারের দাম
২৫ ডিসেম্বর কলাতলীর একটি রিসোর্টে ওঠেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ব্যবসায়ী মনছুর আলম। সঙ্গে স্ত্রী, এক ভাই ও তিন সন্তান। ১ হাজার টাকা দামে দুই সিটের (ডাবল) একটি কক্ষভাড়া গুনতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। মনছুর আলম (৫০) বলেন, কোথাও কক্ষ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই পাঁচ গুণ ভাড়া দিয়ে তাঁদের হোটেলে উঠতে হয়েছে। ফলে চার দিনের ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে বাড়ি ফিরতে হয় তাঁদের।
স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ২৬ ডিসেম্বর সৈকত ভ্রমণে আসেন রাজশাহীর বাঘার ব্যবসায়ী নাজিউর রহমান। রাতে সুগন্ধা সৈকতের একটি ভাজামাছ বিক্রির দোকানে যান সবাই। সোয়া এক কেজি ওজনের একটি কোরাল মাছ ১ হাজার ৮০০ টাকায় গ্রিল করে খাওয়ার দরদাম ঠিক করা হয়। কিন্তু কোরালের পরিবর্তে তাঁদের খেতে দেওয়া হয় রেডস্লিপার জাতের আরেকটি মাছ। প্রতিবাদ করেও টাকা ফেরত পাননি নাজিউর।
প্রতারণার শিকার ফেনীর স্কুলশিক্ষক সাজ্জাদ আলী বলেন, পাঁচ বছর আগে তিনি কলাতলীর যে গেস্টহাউসে ১ হাজার ২০০ টাকায় থেকেছিলেন, সেই কক্ষের ভাড়া এখন পরিশোধ করতে হয়েছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। কক্ষের চেহারা আগের মতোই। টেলিভিশন ছাড়া কক্ষে বিনোদনের আর কিছু নেই। কক্ষভাড়ার তালিকাও টাঙানো নেই কোথাও।
অতিরিক্ত কক্ষভাড়া, খাবারের বেশি দাম আদায়সহ ভোগান্তির শিকার হলে আগে পর্যটকেরা অভিযোগ করার সুযোগ পেতেন না। গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পৃথক তিনটি তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
বেশ কয়েকজন পর্যটকের অভিযোগ, তিন বছর আগে কলাতলীর হোটেল মোটেল জোন ও সৈকত এলাকার মাঝারি মানের হোটেল কক্ষের ভাড়া ছিল ৭০০-৮০০ টাকা, সেটি এখন ২ হাজার ৫০০-৪ হাজার টাকা। একইভাবে ১ হাজার ৫০০ টাকা দামের কক্ষের ভাড়া এখন আদায় হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। খাবারের দামও বেড়েছে মাথাপিছু ৩০০-৬০০ টাকা।
শহরে রেস্তোরাঁ আছে পাঁচ শতাধিক। এর মধ্যে সমিতির আওতাধীন রেস্তোরাঁ ১২০টি। কক্সবাজার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম ডালিম বলেন, সমিতিভুক্ত রেস্তোরাঁতে খাবারের তালিকা টাঙানো থাকে। পর্যটকেরা তালিকা দেখে খাবারের অর্ডার করেন। কিন্তু অবশিষ্ট রেস্তোরাঁয় ইচ্ছেমতো টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এসব রেস্তোরাঁর লাইসেন্সও নেই। সড়কের পাশে, উন্মুক্ত সৈকতে গভীর রাত পর্যন্ত চার চাকার ভ্যান রেস্তোরাঁতে পোড়া ও নিষিদ্ধ পাম্প তেলে ভেজে বেচাবিক্রি হচ্ছে পচা সামুদ্রিক মাছ। এসব বন্ধের উদ্যোগ নেই।
রেস্তোরাঁর মালিকেরা বলেন, তিন বছর আগে ২০০ টাকায় যে খাবার খাওয়া যেত, এখন সে খাবারের দাম ৩৫০-৭০০ টাকা পড়ছে। কারণ, বাজারে মাছ-মাংস-তরকারি, সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। একসঙ্গে কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটলে তখন মাছের সংকট দেখা দেয়। তখন দাম বাড়ে আরও তিন গুণ।
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, অনিবন্ধিত কিছু হোটেল গেস্টহাউস, কটেজ-রিসোর্ট মালিক পর্যটকদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগ আছে। বৈধ হোটেল গেস্টহাউস রিসোর্ট মালিকদের কক্ষভাড়ার মূল্য তালিকা টাঙানোর নির্দেশনা দেওয়া আছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান বলেন, অতিরিক্ত কক্ষভাড়া, খাবারের বেশি দাম আদায়সহ ভোগান্তির শিকার হলে আগে পর্যটকেরা অভিযোগ করার সুযোগ পেতেন না। গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে শহরের কলাতলীর হাঙর ভাস্কর্য মোড়, সৈকতের সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে পৃথক তিনটি তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং ঘটনার সুরাহা হওয়ায় হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকেরা যেমন সতর্ক হচ্ছেন, তেমনি পর্যটকেরাও হয়রানি থেকে রক্ষা পাচ্ছেন। তা ছাড়া পর্যটক হয়রানি রোধে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে।