হজ যাত্রার খরচের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় ফ্লাইটের টিকিটের জন্য। দেশে হজ ফ্লাইটের টিকিটের মূল্য নির্ধারণ হয় রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনের প্রস্তাবিত ভাড়ার ভিত্তিতে। হজ এজেন্সির মালিকদের দাবি, বিমান বাংলাদেশ এককভাবে অতিরিক্ত মুনাফা রেখে ভাড়ার প্রস্তাব করে। সেকারণে টিকিটের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে ভাড়া নির্ধারণে স্বতন্ত্র টেকনিক্যাল কমিটি চান তারা।
হজ এজেন্সি মালিকরা আরও বলছেন, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন সারা বছরের লোকসানের ধকল কাটায় হজযাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা চাপিয়ে। হজ ফ্লাইট থেকে বিমান ৮০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত মুনাফা করে। সংস্থাটির আয়ের ১৫ শতাংশই এই হজ ফ্লাইট থেকে।‘
বিমান বাংলাদেশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১০ থেকে ২০ কোটি টাকা মুনাফা রেখে ভাড়া প্রস্তাব করলে হজ যাত্রীদের ওপর আর্থিক চাপ কমবে বলেও মনে করেন হজ এজেন্সি মালিকরা। তারা বলছেন, প্রতিবছর বিমান জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধি, হজে ডেডিকেটেড হজ ফ্লাইটসহ নানা কারণে ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। বিমানের প্রস্তাবিত ভাড়ার আলোকেই ভাড়া নির্ধারণ হয়, তারপর হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। আর হজ প্যাকেজে নির্ধারিত ভাড়া নেয় বিমানসহ অন্যান্য এয়ারলাইন।
জানা গেছে, ২০২২ সালেও টিকিটের মূল্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের জন্য প্রস্তাব করে বিমান। অন্য দিকে হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের জন্য প্রস্তাব করা হয়।
হাব সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রায় প্রতি বছরই হজযাত্রীদের জন্য টিকিটের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে আহ্বান জানিয়ে আসছে হাব। ২০২০ সালে সংগঠনটি বিমানের প্রস্তাবিত ভাড়া অযৌক্তিক দাবি করে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছিল।
এজেন্সি মালিকরা বলছেন, সরকার হজ প্যাকেজে বিমান ভাড়া নির্ধারণ করে ডেডিকেটেড ফ্লাইটের জন্য। কিন্তু এয়ারলাইন্সগুলো একই ভাড়ায় রেগুলার ফ্লাইটেও হজ যাত্রী নেয়। কখনও কখনও লিটারে ১০ থেকে ২০ সেন্ট জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে। কিন্তু বিমান এ অজুহাত দেখিয়ে জনপ্রতি ভাড়া ২০-৩০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ফেলে।
বিমানের একচেটিয়া ভাড়া নির্ধারণের প্রবণতা রোধে হজ যাত্রীদের বিমান ভাড়া নির্ধারণের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি গঠনের প্রস্তাব হজ এজেন্সি মালিকদের। হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেন, `হাব বরাবরই হজযাত্রীদের খরচের বোঝা কমাতে তৎপর ছিল। অনেক আগে থেকেই আমাদের দাবি ছিল, দুটি এয়ারলাইনের পরিবর্তে অন্য আরও এয়ারলাইন হজ যাত্রী পরিবহনের সুযোগ রাখা হোক। তাহলে একচেটিয়া ভাড়ার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া নির্ধারণ হবে।‘ প্রতি বছরই অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়ানো হয় বলেও দাবি তার।
এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেন, ‘টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়, সেটি অনুমোদন করে হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। আমরা মনে করি, যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ হওয়া উচিত। এজন্য এভিয়েশন খাতের বিষয়ে যারা বোঝেন, তাদের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করতে পারে সরকার। এই কমিটি সব ধরনের খরচ, সব কিছু বিবেচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করবে। বিমান এককভাবে কোনও প্রস্তাব করলে; সেটির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কমিটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ হবে।’
গত ৯ জানুয়ারি সৌদি আরব-বাংলাদেশ হজ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর সর্বমোট ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রী বাংলাদেশ থেকে হজে যাবেন। এরমধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৫ হাজার, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ লাখ ১২ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রী পবিত্র হজ পালন করবেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ৫০ শতাংশ ও সৌদি এয়ারলাইন্স ৫০ শতাংশ হজযাত্রী পরিবহন করবে।
হজ চুক্তি শেষে দেশে ফিরে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান বলেছেন, ‘কোনও অবস্থাতেই আমরা হজের খরচ বাড়াতে চাই না। যে ব্যয় গত বছরে হয়েছিল সেটাই রাখার চিন্তা করছি। তারপরও কিন্তু খরচ বাড়বে। কেন বাড়বে সেটা বলি— সৌদি রিয়েলের দাম গত বছর ছিল ২১-২২ টাকা, আর এখন প্রতি রিয়ালের দাম বাংলাদেশি ৩০ টাকা। আমরা দাম বাড়ানো ছাড়াই এমনিতেই ব্যয় বেড়ে গেলো এই কারণে। তারপরও আমরা চেষ্টা করবো যে করেই হোক ব্যয় কম রাখার জন্য।‘
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, ‘বিমান এবার নিজস্ব উড়োজাহাজের মাধ্যমে হজ ফ্লাইট পরিচালনা করবে। কোনও উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া হবে না। সব কিছু বিবেচনা করে বিমান সংশ্লিষ্টরা ভাড়া নির্ধারণ করবে। আমি আশাবাদী ভাড়া রিজনেবল হবে। হজ ফ্লাইট নিয়ে সকল ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’ [বাংলা ট্রিবিউন]