গত কয়েক মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। হামলাকারী ও ছিনতাইকারীরা খুবই মরিয়া হয়ে উঠছে। এই অপরাধীদের অধিকাংশই ঢাবির শিক্ষার্থী। এমনকি তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অন্য বাসিন্দাদেরও ছাড় দিচ্ছে না। কোনও এক বা দু’দিনের খবর এটি নয়, প্রায়ই এমন খবর সংবাদমাধ্যমে আসছে। জুটি, দম্পতি, বয়স্ক ব্যক্তি, এমনকি ভ্যানচালক বা দিনমজুরও ক্যাম্পাসে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। কোনও কোনও ঘটনা আদিম বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। খোদ ক্যাম্পাসবাসীরা বলছেন, তারা সন্ধ্যার পর নিরাপদবোধ করেন না।
বেশিরভাগ যারা ধরা পড়ছে বা নাম আসছে, দেখা যাচ্ছে এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র, থাকে বিভিন্ন হলে। এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এদের অনেকের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আসছে। ছাত্রলীগ তার ২১ নেতাকর্মীকে বহিষ্কারও করেছে নানা অভিযোগের কারণে।
জামায়াত মতাদর্শের কবি আল-মাহমুদ বহু আগে বলেছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডাকাতদের গ্রাম’। তখন এ কথার তীব্র প্রতিবাদ হয়েছিল। কিন্তু এখন কী বলা হবে? এটি কীসের গ্রাম? কেমন করে কবে থেকে এমন ঠান্ডামাথায় অপরাধী হয়ে গেলো এখানকার কিছু শিক্ষার্থী?
ছিনতাই, চুরি বা কাউকে নিপীড়ন করার উপযুক্ত স্থান হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। একটি বড় কারণ এই এলাকায় আলোর অভাব। অন্ধকার সড়ক এবং নেই সিসিটিভি। ফলে ক্যাম্পাস অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে সমাজবিরোধীদের। আলো না থাকা, সিসিটিভি না থাকা কারণ হতে পারে ঠিকই, কিন্তু সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছেলেরা এমন অপরাধী হয়ে উঠবে সুযোগ আছে বলেই?
রাজনৈতিক সহিংসতা, আধিপত্য চর্চা, হল দখল, সিট দখল, ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা-নিপীড়ন, চাঁদাবাজির অভিযোগ ঐতিহাসিককাল ধরেই আছে। এবার দেখছি এরা আতঙ্কজনক হারে দাগী অপরাধী হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হলো, ছাত্ররা কি সাংঘাতিকভাবে হতাশ হয়ে এমনটা করছে? ছাত্র চরিত্র কেমন হওয়া উচিত, ছাত্রসমাজের মূল্যবোধ কেমন হওয়া উচিত, অনেক পড়ুয়ার মধ্যেই কি সেই বোধ আজকাল লোপ পাচ্ছে?
ছাত্র রাজনীতি বলে যা আছে সেটা পড়ুয়াদের কোনও কাজে আসছে না, বরং এই রাজনীতি শিক্ষাস্বার্থবিরোধী। ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনা বাড়ছে, হিংসাত্মক হানাহানি চলছে, পড়ুয়ারা নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, শিক্ষক-অধ্যাপকরাও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এটা কোন ধরনের ছাত্র রাজনীতি? এই রাজনীতিতে ছাত্রছাত্রী এবং প্রতিষ্ঠান কারও কোনও কল্যাণ নেই।
তবে কি এই একচ্ছত্র রাজনীতির কারণেই কোনও কোনও শিক্ষার্থী বেপরোয়া হয়ে উঠছে, দাগী অপরাধী হয়ে উঠছে? বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। আসলে একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে যেখানে ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরকার রাজনীতি একটা বিচারহীনতার সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। অত্যন্ত গর্হিত কুকর্ম করেও আইনের ফাঁক গলে নিশ্চিন্তে থাকার আয়োজন আছে এখনকার রাজনীতিতে। ছেলেরা তার বাইরে নিজেদের ভাবতে পারছে না।
একটা কথা বলা বাহুল্য, এই প্রবণতা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নয়, প্রায় সব পাবলিক তথা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্ররা দখল করে রেখেছে প্রায় সব ক্যাম্পাস। সংবাদমাধ্যম যখন এসব নিয়ে রিপোর্ট করে তখন প্রক্টর বা উপাচার্যদের বক্তব্য থাকে সেসবে। কিন্তু ওগুলো সবই গতানুগতিক। বলা দরকার, পুলিশ প্রশাসন প্রথম থেকে যথেষ্ট সক্রিয় হলে এসব অনাচার বন্ধ করা কঠিন নয়। কিন্তু তার আগে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কোনও বিরোধী পক্ষ নেই। যারা সাধারণ মানুষের ওপর উৎপাত করে এবং অন্তরালে থেকে যে রাজনীতিবাজরা তাদের প্ররোচনা ও রসদ জোগায়, রাজনৈতিক দুর্বলতা কিংবা স্পর্ধাই তাদের অপরাধী হয়ে ওঠার প্রধান উৎস। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই এরা দল পাকিয়ে ক্যাম্পাসের রাস্তায় চড়াও হয়, সাধারণ নাগরিকের ওপর অত্যাচার চালায়। শাসকরা সত্যিই চাইলে এদের সহবত শেখাতে বেশি সময় লাগার কোনও কারণ নেই।
যে রাজনৈতিক কু-সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এখনকার ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, তা তাদের দুর্বৃত্তায়িত হতেই সহায়তা করছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন সেই ভয়ঙ্কর খবরটি এলো। কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) হলে একজন নবীন ছাত্রীকে রাতভর নির্যাতন করা হয়েছে। তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলের নেত্রী ও শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সানজিদা চৌধুরী অন্তরা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী ছাত্রী। হল প্রভোস্ট, ছাত্র উপদেষ্টা ও প্রক্টর বরাবর এই অভিযোগ দেওয়া হয়।
গত বছর ১৭ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ও তার বন্ধুর কাছ থেকে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পর ছাত্রীকে বেঁধে বিবস্ত্র করে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে দুর্বৃত্তরা। তাহলে প্রশ্ন জাগে, তবে কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাজবিরোধী তৈরির কারখানা?
ভয়ঙ্কর নৈরাজ্যই অপরাধীকে বড় সুযোগ করে দিচ্ছে। প্রকাশ্যে অন্যায়-অনিয়ম-অবিচার করে দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করছে অপরাধীরা। তাদের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের কোনও ধরনের দৃশ্যমান ব্যবস্থাও নেই। ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে অবস্থান করে বা তাকে কাজে লাগিয়ে ক্যাম্পাসসমূহে তারা অনায়াসে যা খুশি করে যাচ্ছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভয় দেখানোর মতো কাজ তাদের জন্য মামুলি নস্যি। যাকে খুশি তাকে অপমান, লাঞ্ছনা, নির্মম মারধর তারা ক্যাম্পাসে করছে। অপরাধ করে তার একপক্ষীয় বয়ানও তারা দিচ্ছে। কারও যেন কিছু বলার নেই। এ অবস্থার অবসান প্রয়োজন। জবাবদিহির আওতায় আসুক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন।
লেখক: সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, সাংবাদিক।