শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন




আজ পবিত্র শবেমেরাজ ও ইতিহাস

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩ ৬:৪৮ am
Eid-e-Miladunnabi sobe borat Shab e Barat namaz রজনী নিসফে শাবান‎ লাইলাতুল বরাত শা'বান মাস ইবাদত বন্দেগি শবে বরাত প্রার্থনা মুসলিম উম্মা মহিমান্বিত রাত শবে বরাত নফল ইবাদত কোরআন তেলাওয়াত জিকির-আসকার জিকির আসকার মোনাজাত ফজিলত ধর্মপ্রাণ মুসলমান শবে মেরাজ শবেমেরাজ ইসলাম islam eid e miladunnanabi Eid Milad un Nabi Rabi al awwal রবিউল আউয়াল ঈদে মিলাদুন্নবী Rabi al-Awwal eid মুহাম্মদ সা রবিউল আউয়াল ঈদ
file pic

পবিত্র শবেমেরাজ আজ। এই রাতেই প্রিয় নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর বিশেষ মেহমান হিসাবে আরশে আজিমে আরোহণ করেন। তখন তিনি আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করেন ও পৃথিবীতে ফিরে আসেন। উম্মতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম নিয়ে আসেন। তাই হিজরি রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতের তাৎপর্য মুসলিম জাহানের কাছে অপরিসীম।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযথ মর্যাদায় পবিত্র লাইলাতুল মেরাজ পালন করা হয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ আদায়সহ নানা ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে এ রাতে আল্লাহর রহমত কামনা করে থাকেন। অনেকেই আগে-পরে রোজা রাখেন।

আরবি শব্দ ‘লাইলাতুল’ অর্থ রাত আর ‘মেরাজ’ মানে ঊর্ধ্বগমন। মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পবিত্র এ রাতে মহানবি (সা.) মহান আল্লাহতায়ালার রহমতে প্রথমে বোরাক নামের বাহনে করে মক্কার কাবা শরিফ থেকে ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদে যান। সেখানে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। পরে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন বিশ্বনবি। প্রতিটি আসমানে হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে বিশিষ্ট নবিদের সঙ্গে মহানবি (সা.) সালাম ও কুশলাদি বিনিময় করেন। তারপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় উপনীত হন। এ পর্যন্ত হজরত জিবরাইল (আ.) তার সফরসঙ্গী ছিলেন। এরপর থেকে মহানবি (সা.) একা রফরফ নামক বিশেষ বাহনে চড়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হন। আল্লাহতায়ালার দিদার লাভ করেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম নিয়ে দুনিয়াতে প্রত্যাবর্তন করেন।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন শরিফের সুরা বনি ইসরাইলের শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করালেন, যার চতুর্দিকে আমার রহমত ঘিরে রেখেছেন-যেন আমি কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই।’

পবিত্র ধর্ম ইসলামে মেরাজের বিশেষ গুরুত্ব আছে। কেননা, এই মেরাজের মাধ্যমেই ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের দ্বিতীয়টি বা নামাজ মুসলমানদের জন্য অত্যাবশ্যক বা ফরজ হয়।

শবেমেরাজের ইতিহাস

মুফতি মোহাম্মদ এনামুল হাসান: মেরাজ আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ হলো ঊর্ধ্বালোকে গমন বা আহরণ। নবুওয়তের একাদশ মতান্তর দ্বাদশ বছরে রজব মাসের ২৬ তারিখে দিবাগত রাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর পবিত্র শবেমেরাজ সংঘটিত হয়।

পবিত্র মেরাজ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন, ‘সুবহানাল্লাজি আসরা বি আবদিহী লাইলাম মিনাল মাসজিদিল হারামে ইলাল মাসজিদিল আকসা, অর্থাৎ পবিত্র সেই মহান স্রষ্টা যিনি নিজ প্রিয় বান্দাহকে বোরাকে আরোহণ করিয়ে কাবা ঘর থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত নৈশভ্রমণ করিয়েছিলেন।

এই মেরাজে আল্লাহর মূল উদ্দেশ্য ছিল তার প্রিয় বান্দাহকে সৃষ্টিজগৎ আরশে মুয়াল্লাহর কিছু নিদর্শন দেখানো এবং তার সান্নিধ্য লাভ করানো।

এমন একসময় রাসূল সা:-কে মেরাজ করানো হয়েছিল যখন মক্কাজুড়ে ইসলামের নবজাগরণকে স্তব্ধ করার জন্য পুরোপুরি ষড়যন্ত্র চলছিল। মক্কার কাফের সম্প্রদায় রাসূল সা:-এর সংস্পর্শে এসে দলে দলে যখন ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে ছিল ঠিক তখনি কাফেরদের সরদাররা চিন্তা করতে লাগলেন যে, এভাবে চলতে থাকলে মক্কার সব মানুষ তাদের বাপদাদার পৌত্তলিক ধর্ম মক্কার জমিন থেকে চিরবিদায় নিতে বাধ্য হবে। তাই তারা ইসলামের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করে।

সব ষড়যন্ত্রে ব্যর্থ হয়ে মুসলমানদের সাথে বয়কট করা ছাড়া আর কোনো পথ না দেখে সম্মিলিতভাবে তারা মুসলমানদেরকে শিয়াবে আবু তালিব (আবু তালিবের স্বত্বাধিকারী পাহাড়ের পাদদেশে) আবদ্ধ করে ফেলে।

মুসলমানদের সাথে মক্কার সব গোত্র সর্বপ্রকার যোগাযোগ, লেনদেন, বিয়েশাদি এমনকি দেখাসাক্ষাৎও বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘ আড়াই বা তিন বছর মুসলমানরা সেখানে বন্দি অবস্থায় দিনযাপন করেছিলেন।

কাফেরদের এই দুর্ব্যবহারের শিকার হয়ে মুসলমানরা এমন কোনো কষ্ট নেই যা তারা সহ্য করেনি। খাদ্যাভাবে মুসলমানদের বৃক্ষলতা খেতে হতো। এসব নিঃশেষ হয়ে গেলে মুসলমানদের তৃণ খড় পর্যন্ত খেতে হয়েছিল।

চার দিক থেকে যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবরোধ চলছিল তখনি রাসূল সা:-এর পিতৃব্য আবুতালিব ইন্তেকাল করেন। বয়কট পরিসমাপ্তির কাছাকাছি সময়ে হুজুর সা:-এর সব বিপদ-আপদের সাথী এবং সাহায্যকারী উম্মাহাতুল মুমিনিন হজরত খাদিজা রা:ও ইহজগৎ ত্যাগ করেন।

অতি আপনজন এই দুই ব্যক্তির ইন্তেকালে হুজুর সা: যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তখনই সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা:-কে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করিয়েছেন।

রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে মহানবী সা: এশার নামাজ সম্পন্ন করে চাচাতো বোন উম্মেহানির ঘরে নিদ্রায় নিমগ্ন ছিলেন। এমন সময় জিব্রাইল আ: উপস্থিত হয়ে প্রিয়নবী সা:-কে বললেন, হে আল্লাহর নবী, আপনি জাগ্রত হোন। আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য দ্রুতগামী বাহন ‘বোরাক নিয়ে এসেছি। পূর্ববর্তী সব নবী-রাসূল ও সব ফেরেশতা আপনাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

মুহাম্মদ সা: জাগ্রত হয়ে প্রথমে অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর নির্দেশক্রমে পবিত্র বোরাকে আরোহণ করে প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাস এসে পূর্ববর্তী সব নবীর উপস্থিতিতে দুই রাকাত নামাজের ইমামতি করেন।

আবার বোরাকে আরোহণ করে ঊর্ধ্বালোকে গমন করেন। প্রথম আকাশে হজরত আদম আ: বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা:-কে অভ্যর্থনা জানান। তার পর দ্বিতীয় আকাশে ঈশা আ: ও ইয়াহিয়া আ:, তৃতীয় আকাশে ইউসুফ আ:, চতুর্থ আকাশে ইদ্রিস আ:, পঞ্চম আকাশে হারুন আ:, ষষ্ঠ আকাশে মুসা আ: এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইবরাহিম আ:-এর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন।

তার পর বায়তুল মামুর নামক স্থানে ফেরেশতাদের নিয়ে আবার দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। এখানে এসে বোরাক থেমে যায় এবং জিব্রাইল আ: বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ পর্যন্তই আমার সীমানা। এরপর এক কদম অগ্রসর হওয়ার শক্তি আমার নেই। এখান থেকে রফরফ নামক আরেকটি কুদরতি বাহন রাসূলকে আল্লাহ তায়ালার আরশে মুয়াল্লাহয় নিয়ে যান। সেখানে আল্লাহ তায়ালার সাথে সালাম বিনিময়ের পর কথোপকথন হয়। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সেখানে প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত ও পরবর্তীতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উম্মতের জন্য হাদিয়াস্বরূপ দেয়া হয়। তার পর হুজুর সা: জান্নাত জাহান্নাম অবলোকন করেন।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। কিন্তু অসংখ্য নবী-রাসূলের মধ্যে কেবল আমাদের প্রিয়নবী সা:-ই মাখলুকাতের মধ্যে সশরীরে মহান আল্লাহ তায়ালার দিদার লাভে সক্ষম হয়েছেন।

পবিত্র শবেমেরাজ আশ্চর্য ও অলৌকিক ঘটনা অবশ্যই। শবেমেরাজ রাতটি সব উম্মতে মোহাম্মদির কাছে অত্যন্ত মহিমান্বিত ও ফজিলতপূর্ণ। এ রাতে প্রত্যেক মুসলমানদের নফল নামাজ আদায় করা, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করা, দান খয়রাত করা, অধিক পরিমাণে তাসবিহ তাহলিল, জিকির আজকার করার পাশাপাশি তাওবা ইস্তেগফার ও কান্নাকাটি করে, ইসলামবহির্ভূত কাজে লিপ্ত না হওয়ার তাওফিক কামনা ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে অতিবাহিত করাই বাঞ্ছনীয়।

লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, ইসলামী ঐক্যজোট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD