সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণে ধসে পড়া ভবনের সামনে নিখোঁজদের জন্য দিনভর অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন স্বজনরা। তাদের চোখে-মুখে ছিল উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা। কণ্ঠে ছিল স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। এমনি একজন আব্দুর রউফ। তিনি নিখোঁজ ব্যবসায়ী মমিন উদ্দিন সুমনের শ্বশুর। তিনি বলেন, সারা রাত হাসপাতালে জামাইকে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। সন্ধান না পেয়ে এখানে বসে আছি। মঙ্গলবার বিকালে জামাইয়ের সঙ্গে শেষ কথা বলেছি। এরপর থেকে তাকে ফোন দিয়ে যাচ্ছি। ফোন ধরছে না। পরে জানতে পারি ভবনে বিস্ফোরণ হয়েছে।
তিনি বলেন, বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত ওই ভবনের নিচে ‘আনিকা স্যানিটারি’ নামে জামাইয়ের দোকান রয়েছে। জামাই বিধ্বস্ত দোকানের নিচে চাপা পড়ে আছে কিনা নিশ্চিত নই।
আব্দুর রউফ বলেন, মমিন উদ্দিনের দুই মেয়ে, ১ ছেলে। বড় মেয়ে মালয়েশিয়ায় লেখাপড়া করে। বিস্ফোরণের খবর পেয়ে সে দেশে চলে এসেছে। আরেক মেয়ে ও এক ছেলে ধানমন্ডিতে পড়াশোনা করে। এজন্য ধানমন্ডিতে পরিবার নিয়ে থাকেন মমিন উদ্দিন সুমন। ওর দোকানের কর্মচারী রাজীব ও চাচাতো ভাই সম্রাট মারা গেছেন। আনিকা এজেন্সি ছাড়াও সিদ্দিকবাজারের গলিতে নিউ আনিকা স্যানিটারিসহ মোট চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। এ ছাড়া তার দুটি শোরুম আছে এলিফ্যান্ট রোডে। এই ছয় প্রতিষ্ঠানে অর্ধশতাধিক লোক কাজ করেন। এছাড়া একটি ছোটখাটো কারখানা গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সেখানে ৩০-৩৫ জন কর্মচারী আছেন। বংশালের মালিটোলায় নিজের বাসাসংলগ্ন একটা মোটরসাইকেলের শোরুমেরও মালিক তিনি। সেখানে কাজ করেন ১০-১৫ জন। সব মিলে মমিন উদ্দিন সুমনের ওপর শতাধিক পরিবার নির্ভরশীল।
মমিন উদ্দিন সুমনের বাল্যবন্ধু আবদুল আজিজ। তিনি বিধ্বস্ত ভবনের পাশে ফাতেমা মার্কেটের ব্যবসায়ী হাই স্যানিটারির মালিক। আবদুল আজিজ বলেন, ‘বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট আগেও সুমন আমার দোকানে বসা ছিল। ওর দোকানে একজন বড় ক্রেতা আসায় চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা।’
দুর্ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টার মাথায় বুধবার বিকাল সাড়ে চারটায় ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি লাশ বের করার পর অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্বজনরা সেখানে গিয়ে মমিন উদ্দিন সুমনের লাশ শনাক্ত করেন। খবর পেয়ে আব্দুর রউফ ঢাকা মেডিকেলের দিকে ছুটছিলেন। কোথায় যাচ্ছেন প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, জামাইর লাশ পাওয়া গেছে। ঢাকা মেডিকেলে যাচ্ছি লাশটা দেখতে। এর আধা ঘণ্টা পর ৫টার দিকে মমিন উদ্দিনের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী রবিন হোসেন শান্তর লাশ উদ্ধার করা হয়। শান্তর ভাই শাহাদাত হোসেন ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে তার লাশ শনাক্ত করেন।
রবিন হোসেন শান্তকে খুঁজতে শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় আসেন তার শ্বশুর নুরুল ইসলাম। রাতভর ছোটাছুটি হাসপাতাল আর মর্গে। কয়েক মাস আগে শান্তর সঙ্গে নিজের আদরের মেয়েকে বিয়ে দেন তিনি। ঈদের সময় উঠিয়ে নেওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘খবর শোনার পরই মেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। তাকে বাড়িতে রেখে আমরা জামাইয়ের খোঁজে এসেছি।’ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বিস্ফোরণের আগে জামাইয়ের সঙ্গে কথা হয় মেয়ের। আজান দেওয়ার কারণে ফোন রেখে দিয়েছে। বলেছিল আসরের পর আবার ফোন দেবে। সেই ছিল তাদের শেষ কথা।’ সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণে নিখোঁজ রয়েছেন মেহেদি হাসান স্বপন। তার বড় ভাই তানভীর হাসান সোহাগ ধ্বংসস্তূপের পাশে আর্তনাদ করে বলছিলেন, ‘ভাইরা আমার ছোট ভাইরে বাঁচান, সে ভবনের নিচে আছে। সেনাবাহিনীকে বলেন, একটু খুঁজতে।’
তিনি জানান, তার ছোট ভাই স্বপন ‘বাংলাদেশ স্যানিটারি’ নামে একটি দোকানের কর্মচারী ছিলেন। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর জেলার সোনাইমুড়ী থানার বজরা এলাকায়। বিস্ফোরণের পর থেকেই স্বপনের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেনি পরিবার। বন্ধ রয়েছে মোবাইল ফোন।
স্বপনের শ্বশুর আব্দুল মান্নান বলেন, ‘স্বপন স্যানিটারি’ দোকানের ম্যানেজার ছিল। তার সঙ্গে আরও দুজন ছিল। তাদের গুরুতর আহতাবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু স্বপনকে এখনো পাওয়া যায়নি। তার এক ছেলে ও মেয়ে আছে।’ এছাড়া মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী সিরাজকে খুঁজছিলেন স্বজনরা।
বুধবার দ্বিতীয় দিনে উদ্ধার অভিযান শুরুর পর ঘটনাস্থলে ভিড় জমায় হাজারো মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনের সড়ক ক্রাইম সিন জোন হিসাবে ফিতা দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। এরপরও দোকান মালিক-শ্রমিক কর্তৃপক্ষ ও পথচারীরা সেখানে ভিড় করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবুও বারবার ভিড় করেন তারা।
মঙ্গলবার বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে গুলিস্তানে বিআরটিসির বাস কাউন্টারের পার্শ^বর্তী সিদ্দিকবাজারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে পাশাপাশি দুটি বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি ভবন ছয়তলা, আরেকটি পাঁচতলা। এর মধ্যে ছয়তলা ভবনের বেসমেন্ট, প্রথম ও দ্বিতীয়তলা বিধ্বস্ত হয়েছে। আর পাঁচতলা ভবনের নিচতলাও বিধ্বস্ত হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় ১৯ জন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।