সরকারের বিভিন্ন দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিরুদ্ধে।
টেলিটক ৪জি প্রজেক্টের অ্যান্টেনা দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ দেওয়ায় সর্বনিম্ন দরদাতা অভিযোগ দিতে গেলে তাকে ভর্ৎসনা করা হয়। ৪টি লট মিলে এই কাজে সরকারের গচ্ছা যাচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এভাবে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করে যাচ্ছেন তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর ভুক্তভোগী এবিএম মইনুল হোসেনের দেওয়া এক লিখিত অভিযোগপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান যোগদানের পর থেকেই ইচ্ছেমতো যাচ্ছে-তাই ভাবে মন্ত্রণালয় পরিচালনা করে যাচ্ছেন। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রীকে এড়িয়ে তার কাছে ফাইল উপস্থাপন না করে সচিব বহু সিদ্ধান্ত দিয়ে সচিবালয় নির্দেশমালা অমান্য করে যাচ্ছেন।
বিভাগের কোনো পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার কোনোরূপ মতামতও তিনি গ্রহণ করেন না। যে কারণে বিভাগের স্বাভাবিক অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। সচিবের পিএস মাহবুব আলম এবং উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদই হচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের সব প্রকার সিদ্ধান্তদাতা আর সেই সিদ্ধান্ত সচিব নিজে বাস্তবায়ন করেন।
এছাড়া মন্ত্রীর কাছে ফাইলে অনুমোদন ব্যতীত বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেলিফোন শিল্প সংস্থা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেলিটকের জিএম পদমর্যদার ৪ জন কর্মকর্তা ও ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদমর্যাদার ২ জনকে পদায়ন করেন। যা অতীতে হয়নি। বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ফাইল অতীতে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন।
অন্যদিকে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৯ মার্চ নির্দেশনা দিয়ে পত্র পাঠায়। কিন্তু সেই পত্র সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান মন্ত্রীকে অবহিত করেননি। বরং এক মাস পর মন্ত্রীর অনুমোদন ব্যতীত পুনরায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ে কিছু অপ্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পত্র পাঠান। মূলত এভাবে পত্র পাঠিয়ে সময়ক্ষেপণ করে যাচ্ছেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, বিটিসিএলের অন্য এক কর্মকর্তার কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা নিয়েছেন। তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বানাতে চান এই সচিব।
সে কারণে বিটিসিএলের সিনিয়র ডিএমডি ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্জীব ঘটককে মগবাজারের একটি স্কুলে ডেকে নিয়ে সচিব তার কাছ থেকে চার্জ নিয়ে প্রকল্প পরিচালক আসাদুজ্জামানকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করেন। যা নিয়মবহির্ভূত। কারণ জনপ্রশাসনের নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে যে, প্রকল্পে কর্মরত কোনো কর্মকর্তাকে কোনো সংস্থায় প্রধান পদে অতিরিক্ত বা চলতি দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা গেছে, বিটিআরসি থেকে প্যাসিফিক বাংলাদেশ লিমিটেডের ২-জি সেলুলার মোবাইল অপারেটরের লাইসেন্স বাতিলের পূর্বানুমোদনের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পত্র দেয়। যেহেতু লাইসেন্স বাতিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, সে বিষয়টি মন্ত্রী পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য উল্লেখ থাকার পরেও সচিব নথিতে অনুমোদনসহ স্বাক্ষর করেন।
মন্ত্রী পরে সচিবকে উক্ত ফাইল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে কারিগরি ত্রুটির কারণে মন্ত্রীকে দিতে পারেননি বলে জানান। অথচ পত্র অনুমোদনের ৫ দিন পরও কারিগরি ত্রুটির বিষয়ে তিনি মন্ত্রীকে অবহিত করেননি। মূলত তিনি মন্ত্রীকে অসত্য তথ্য দিয়েছেন। কারণ সচিব ফাইল অনুমোদন দিয়েছেন ১৩ মার্চ এবং বিটিআরসিতে অনুমোদনের চিঠি পাঠানো হয়েছে ১৪ মার্চ। যার স্মারক নং ১৪.৩০.০০০০.০১০.১৮.০০১.২২.১১০৫; তারিখ ১৪ মার্চ, ২০২৩। আর মন্ত্রী উক্ত ফাইল তলব করেছেন ১৮ মার্চ ২০২৩ তারিখে।
টেলিটকের টাকায় সচিবের বই বিক্রির অভিযোগ: রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পুনর্মিলনীতে দশ লাখ টাকা খরচ করে স্টল বানিয়ে সচিবের বই বিক্রি করতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।
অথচ টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড যেখানে আর্থিক সংকটের কারণে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না, সেখানে টেলিটককে বাধ্য করে স্টল দিলেও কেউ বই কিনেননি। অন্যদিকে ওএসডি কর্মকর্তাদের পদায়িত করারও অভিযোগ উঠেছে সচিবের বিরুদ্ধে।
এদিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীনে তিনটি সংস্থা ও কয়েকটি কোম্পানি আছে। সচিবের আধিপত্যের কারণে প্রতিটি সংস্থা ও কোম্পানিতে এখন বদলি আতঙ্ক বিরাজ করছে। সচিবের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত উপসচিব আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের সঙ্গে সখ্য থাকলে যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক অথবা তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও তার পদায়ন হতে সময় লাগে না। যারা দীর্ঘদিন ধরে ওএসডি অবস্থায় ছিলেন তারাও এখন পদায়িত হয়েছেন।
টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার জন্য অভিযুক্ত বিএনপি ঘরানার কর্মকর্তা নুরুল মাবুদকে পদোন্নতি দিয়ে অপারেশন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। টেলিটকে অবৈধ ভিওআইপির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা খালেদ হোসেন ও মামুনুর রশিদকে ভালো ভালো পদে পদায়িত করেছেন।