রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন




মানবজমিনকে ড. সালেহউদ্দিন

এমন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ আগে কখনো পড়েনি

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৪ জুন, ২০২৩ ৮:১২ pm
governor Salahuddin Ahmed DR. SALEHUDDIN গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ অর্থনীতিবিদ
file pic

বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বলেছেন, এর আগে বাংলাদেশ একসঙ্গে এত চ্যালেঞ্জে পড়েনি। মানবজমিন’র সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বিশ্লেষণ করেছেন দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি দিয়েছেন দিকনির্দেশনাও। বরেণ্য এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন অর্থনীতির নিজস্ব গতিপথ রুদ্ধ করে দেয়ার কারণে সংকট ঘনীভূত হয়েছে। অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রে সরকার হস্তক্ষেপ করেছে যার কারণে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সুশাসন এবং সচ্ছতার অভাব সংকটের অন্যতম কারণ মনে করেন তিনি।

ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ৫০ বছরে অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছি। অনেক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি ছিল। তবুও আমরা আটকে যাইনি। সেগুলো কাটিয়ে আমরা এতদূর এসেছি। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।

এর আগে এত চ্যালেঞ্জ ছিল না। আগেও রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি ছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যা ও জিয়াউর রহমান হত্যার পর টালমাটাল হয়েছে। তবে এগুলো কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে কোনো দেশকে গিয়ে টাচ্ করেনি। কিন্তু এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই, বাক স্বাধীনতা…সবমিলিয়ে মানুষের যে সৃজনশীলতা, বা নিজেদের যে চিন্তাধারা সেটা বাস্তবে প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না, বা বলতে পারছে না।

যুবকদের মধ্যে যারা নতুন উদ্যোক্তা তারা ব্যাংক ঋণ নিতে পারছে না। ব্যাংক ঋণ পাচ্ছে যাদের পলিটিক্যাল কানেকশন আছে, আর যাদের বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি আছে, অথবা তাদের ছেলেমেয়েরা পাচ্ছে। তার মানে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে স্বাভাবিক যে গ্রোথ সেটা থেমে যাচ্ছে। আমি তো বলি সরকার যদি এতটা ইন্টারেকশন না করতো, বাংলাদেশ আরও বেটার করতো। সরকার শুধু আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, প্রাথমিক শিক্ষা, খাদ্য এগুলো যদি নিশ্চিত করতো, বৈদেশিক যোগাযোগ ঠিক রাখতো আর বাকিগুলো ছেড়ে দিতো কিন্তু আইনের কড়াকড়ি প্রয়োগ করতো তাহলে বাংলাদেশ আরও ভালো করতো।

সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো হলো- মূল্যস্ফীতি, কর ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, সম্পদের অপচয় এবং সরকারের ব্যয়ের অপচয়। তিনি বলেন, ২ বছরের প্রকল্প ৫ বছরে করছেন, ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প ৫০০ কোটি টাকায় করছেন এগুলো কীসের আলামত? এগুলো সব হলো সুশাসনের অভাব আর হলো স্বচ্ছতার অভাব। কোনো জবাবদিহিতা নেই। ভুল করলে তার শাস্তি হচ্ছে? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কতো দুর্নীতি হলো, তখন বলছে আমার সময়ে তো এটা হয়নি। এভাবে একজন এসে চুরি করে চলে যাবে, আরেকজন এসে বলবে আমি তো চুরি করি নাই। এই রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা…।

আমাদের সমস্যা হলো ব্যাংক সেক্টরের করাপশন। এ ছাড়া এখন যোগ হয়েছে বৈশ্বক সমস্যা। বৈশ্বক বাজারে এনার্জির দাম বেড়ে গেছে, ডলারের টালমাটাল অবস্থা, আবার ডলারকে রিপ্লেস করে দিচ্ছে রাশিয়ার রুবল আর চীনের ইউয়ান। এগুলোর ফলে আমাদের খাদ্য আমদানি, মেশিনারিজ আমদানিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আবার দেখছি আরএমজিতে শুধু বারবার প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে আর অন্যগুলোর ব্যাপারে চুপচাপ। এরমধ্যে আবার রপ্তানিতে চ্যালেঞ্জ শুরু হয়েছে। জিএসপি সুবিধা দিয়েও কতোদূর যাবে? আমরা আছি অন্যের সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে। এই যে নারীদের সস্তা শ্রম। চায়নার মতো ওয়েজ দেন, ভিয়েতনামের মতো বেশি দেন। ইভেন ভারতের মজুরিও বেশি। এগুলো দিয়ে আপনি প্রতিযোগিতা করেন। তার মানে আপনি প্রতিযোগিতায় পারবেন না। আপনার শ্রমিকের অভাব, দক্ষতার অভাব, ম্যানেজমেন্ট দুর্বল। আবার আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবেন কীভাবে? স্নো-পাউডার, চানাচুর আর বিস্কুট বন্ধ করে তো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে পারবেন না। আমদানিও তো বাড়াতে হবে। রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে। আর আমদানি কমিয়ে দিলে কী হবে? তখন মেশিনারিজ আসবে কোত্থেকে, কাঁচামাল আসবে কোত্থেকে? ওষুধের কাঁচামাল সব তো আসে বাইরে থেকে। তাহলে কীভাবে চালাবেন?

সালেহউদ্দিন আহমেদের দৃষ্টিতে দেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। এরফলে সৃষ্টি হয়েছে আভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় আরেকটি সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। এই যে এতগুলো প্রতিষ্ঠান এতগুলো অফিস… এই সময়ে আমি মনে করি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ, যেগুলো অলরেডি লিগেসি। ঐতিহাসিকভাবে এগুলো বহন করে চলেছি সমাধান করছি না। এখন আইএমএফ বলছে এই করো সেই করো। এগুলো তো বহু আগে থেকেই বলা উচিত ছিল। আমরা আগে থেকেই সব বলে আসছি। এখন আইএমএফ বলে সত্যি হলো, আমরা বললে সত্যি হয় না। অতএব, এই চ্যালেঞ্জগুলো হলো আভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। এগুলো মোকাবিলা করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে। প্রথমত আমরা নিজেরা নিজেরা শক্ত হই। হিসাব করি নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কতোটুকু। এখন তো অর্থনীতি ভঙ্গুর। রিস্ক আছে, যেকোনো সময় নিচে চলে যাবে। কারণ ওরা দেখছে যে, যেগুলো ফল্ট করে গেছে সেগুলো খুব স্ট্যাবল না। স্থিতিশীলতা নেই। ব্যাংকে নেই, ইন্ডাস্ট্রিতেও নেই। আর রেমিট্যান্সের কথা তো বাদ দিলাম। এই শ্রমিকদের জন্য কী করছে? তারা নিজেদের টাকা-পয়সা দিয়ে যায়। তাদেরকে স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য কিছু করে না। তারা যখন আসে তাদের টাকাগুলো বিনিয়োগ করবে নাকি কী করবে সেটারওতো কোনো ঠিক নাই। অতএব, মানুষের যে কন্ট্রিবিউশন সেটা বেশি জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা জবাবদিহিতা না থাকলে আপনি বেশি দূর আগাতে পারবেন না।

নানা চ্যালেঞ্জর মধ্যে সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। এ বিষয়ে সাবেক এই গভর্নর বলেন, অনেক বাজেট দিয়ে আসছে কিন্তু কোনোটিই বাস্তবায়ন হয় না। খরচের ব্যাপারে আবার ঠিকঠাক আছে। বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়। আর ব্যয় মানেই অপচয় হয়। কিন্তু খরচটা হওয়া দরকার সাশ্রয়ী; প্রাধিকারভুক্ত ভালোভাবে। তবেই কিন্তু আমাদের ট্যাক্সের বোঝাটা কমে যাবে। এখন দেখছেন কর বাড়িয়ে দিচ্ছে কিন্তু খরচ তো সরকার কমাবে না; বরং দেখছি সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়াবে। কী দরকার? আবার নতুন নতুন প্রকল্প কেন দরকার? তারপর আবার মেগা প্রকল্প। চলমান প্রকল্পগুলোই আগে শেষ করো। যেখানে গ্রামের রাস্তাগুলোই খারাপ, সেখানে কক্সবাজার থেকে দোহাজারি পর্যন্ত রেলওয়ে করে ফেলছেন। পদ্মা সেতু দিয়ে রেলে করে আপনি চলে যাবেন ইশ্বরদী। আরে বাবা সেখানে তো রাস্তাই আছে! আপনি কোনটাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন?
বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, প্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধি করে আমরা একেবারে শেষ। সম্পদের পাহাড় চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট লোকদের কাছে। প্রবৃদ্ধি না হয়ে বরং সার্বিক উন্নয়ন এবং সামাজিক উন্নয়ন দরকার। প্রবৃদ্ধি হবে, গ্রোথ প্রয়োজন আছে। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্যের মান বাড়বে, সুষম খাদ্য, স্বাধীনতা থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ কমানো যাচ্ছে না এটার মূল কারণ ব্যাংকাররা সিরিয়াস না। মূল দায়িত্ব ব্যাংকারদের। আর বাংলাদেশ ব্যাংক তো শুধু ছাড় দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রোল শক্ত না। টাকা পাচার হচ্ছে, কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। যারা টাকা পাচার করছে তাদের নাম আসছে। ইন্ডিয়াতে দেখেন নাম আসলে সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে। বাংলাদেশে করছেন কাউকে? এই যে এত দুর্বলতা…এটা করলে তো হবে না। আইনের শাসন বলতে কিছু নাই। আর ইনকুয়ারিং’র নামে দীর্ঘসূত্রতা। এটা তো হতে পারে না। চার্জশিট হচ্ছে না। ভয়ে করছে না।

বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো হয়নি উল্লেখ করে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে এমনকি মুজিবনগরের মূল বিষয় ছিল অর্থনীতি। রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। রাজনৈতিক স্বাধিকার আমরা পতাকায় পেয়েছি। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাইনি। বাড়ির ভেতরে ফাইন ডেকোরেশন। বাকিগুলো নড়েবড়ে। আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি পাইনি কারণ সেদিকে রাজনীতিবিদদের খেয়াল নেই। তারা তো সেটার ধার ধারে না। নির্বাচন দেন না দেন… সেটাও অসুবিধা নেই তাদের।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষ অতিষ্ঠ। মূল কারণ সরবরাহজনিত। আপনি আমদানি না করে উৎপাদন করুন। তাতে জিনিসপত্রের দাম একটু কমতো। আরেকটা জিনিস সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে বাংলাদেশে। সেটি হলো- বাজার নিয়ন্ত্রণ করে না। বাণিজ্যমন্ত্রী বসেন মাঝে মাঝে। আবার দুইদিন পর বাড়িয়ে দেয়। বলে দেবে বাড়াতে পারবে না- এক কথা। কিন্তু উনিই তো ব্যবসায়ী আর কী করবেন? এখন সময় হলো বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। ওই কমিউনিজম, সোশ্যালিজমের দরকার নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। বাইরে কোথাও দেখেছেন যে, হঠাৎ করে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়? [মানবজমিনকে ড. সালেহউদ্দিন]




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD