মহান আল্লাহ বান্দার প্রতি অনেক দয়াশীল। তিনি মানুষের প্রতি দয়া করে কিছু আমলের বরকতে রিজিক বাড়িয়ে দেন। সমাজে অবহেলার কারণে অনেক মানুষ সাধারণত এসব কাজ থেকে বিরত থাকে। কুরআন-সুন্নাহর ঘোষণায় রিজিক বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ আমল আছে। সেগুলো কী?
বরকত মানুষের জন্য জরুরি বিষয়। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা দীর্ঘ হায়াত পেয়েছেন, সে হিসেবে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কিংবা আমল-ইবাদতেও বরকত নেই। আবার অনেকে কঠোর পরিশ্রম করেন কিন্তু প্রাপ্তি সেভাবে আসে না। কাজে কোনো বরকত নেই।
পক্ষান্তরে এমন অনেক লোক আছেন, যারা কম হায়াত পেয়েছেন কিন্তু ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্তুতি, আমল-ইবাদতে বরকত লাভ করেছেন। অনেক অল্প পূজিতে ব্যবসা এবং অল্প বেতনে চাকরি করার পরও তার রিজিকের অভাব নেই। পরিবারে অফুরন্ত বরকত।
সুতরাং সব কাজে বরকত অনেক জরুরি বিষয়। আর বান্দার রিজিক বৃদ্ধির কার্যকরী উপায়গুলো হলো-
কিভাবে রিযিক বাড়ানো যায় তার কিছু আমল আছে কি?
বেশি বেশি ইস্তেগফার করা:
“তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহা ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। তিনি তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করবেন এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন বহু বাগান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।”
(সুরা নুহ ৭১: ১০-১২)
উচ্চারণ : ‘আস্তাগফিরুল্লাহ।’
অর্থ : আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
উচ্চারণ : ‘আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।‘
অর্থ : আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর দিকেই ফিরে আসছি।
উচ্চারণ : ‘রাব্বিগ্ ফিরলি ওয়া তুব আলাইয়্যা ইন্নাকা (আংতাত) তাওয়্যাবুর রাহিম।’
অর্থ : ‘হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবাহ কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি মহান তাওবা কবুলকারী করুণাময়।’
উচ্চারণ : ‘আস্তাগফিরুল্লা হাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলায়হি।’
অর্থ : ‘আমি ওই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোনো মাবুদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী এবং তাঁর কাছেই (তাওবাহ করে) ফিরে আসি।’
আল্লাহকে ভয় করে চলা:
আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং তাকে ভয় করলে তিনি বান্দার প্রতি বরকত বা কল্যাণ দান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
“…আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার নিষ্কৃতির পথ (সমস্যা সমাধানের পথ)করে দেবেন।এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রুযী দান করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করবে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই। আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা।”
(সুরা ত্বলাক : ২-৩)
“… আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছে তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছে কমিয়ে দেন।…”
(সুরা আল ক্বাসাস -৮২)
‘আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং পরহেযগারী অবলম্বন (তাকে ভয়) করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও দুনিয়ার নেয়ামতসমূহ উম্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি তাদের কৃতকর্মের বদলাতে।’ (সুরা আরাফ : আয়াত ৯৬)
সুতরাং শিরক, কুফর ও নেফাক থেকে নিজেদের ঈমানকে হেফাজত করতে হবে। সব হারাম থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহকে সব বিষয়ে বেশি বেশি ভয় করতে হবে। তবেই আল্লাহ তাআলা ওই বান্দার জন্য আসমানি ও জমিনের সব রিজিকে বরকতের দুয়ার খুলে দেবেন।
সৎ কাজ করা ও দু’আ করা:
অভাব থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে, রিজিকে বরকত পেতে চাইলে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়ার বিকল্প নেই। যে কোনো বিষয়ে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করার কথা মহান আল্লাহ এভাবে বলেছেন-
কেবল সৎ কর্মই আয়ু বৃদ্ধি করে এবং দু’আ ব্যতীত অন্য কিছুতে তাকদীর রদ হয় না। মানুষের অসৎ কর্মই তাকে রিয্ক বঞ্চিত করে।”
(ইবনে মাজাহ: ৯০)
“দু’আ ছাড়া আর কিছুই তাকদীর রদ করতে পারে না আর নেক আমল ছাড়া আর কিছুই বয়সে (আয়ু) বৃদ্ধি ঘটায় না।”
(তিরমিজী -২১৪২)
বেশি বেশি দান খয়রাত করা:
যারা আল্লাহর রাস্তায় দান করে, আল্লাহ তাআলা তাদের বেশুমার রিজিক দান করেন মর্মে মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে এভাবে ঘোষণা করেন-
“নিশ্চয় আমার রব তো তার বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছে রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং তার জন্য সীমিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে, তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।” (সুরা সাবা : আয়াত ৩৯)
প্রতিদিন ভোরে দু’জন ফেরেশতা নাযিল হয়। তাদের একজন এ দু’আ করতে থাকে যে, “হে আল্লাহ, আপনি (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয়কারীকে বিনিময় দিন। আরেকজন দু’আ করে যে, হে আল্লাহ, যে ব্যয় করে না তার সম্পদ ধ্বংস করে দিন”
[বুখারী:১৪৪২, মুসলিম:১০১০]
আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায়/রক্ষা করা:
“যে ব্যাক্তি চায় যে, তার রিযক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক; সে যেন তার আত্নীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখে।”
(বুখারী: ৫৫৬০)
আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে বরকত ও কল্যাণ নেমে আসে। এটি অনেক পরীক্ষিত একটি আমল। আত্মীয়-স্বজন তথা মা-বাবা, ভাই-বোন তথা রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। হাদিসে এসেছে-
হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কামনা করে যে, তার রিজিক বাড়াতে চায় বা প্রশস্ত করতে চায়; তার হায়াত বা আয়ুকে দীর্ঘ করতে সে যেন আত্মীয়-স্বজন, পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
দু’আ করা;
“হে আল্লাহ্! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিযিক ও এবং কবূল হওয়ার যোগ্য কর্মতৎপরতা প্রার্থনা করি।”
(ইবনে মাজাহ ৯২৫)
বার বার ওমরাহ করা
যারা অভাব কমাতে চায়, গোনাহ কমাতে চায় তাদের জন্য বার বার ওমরাহ করা জরুরি। হাদিসে এসেছে-
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ওমরাহ করে; ওমরাহ তার গোনাহ, তার অভাব অনেক দূরে পাঠিয়ে দেয়।’ (তিরমিজি)
বিয়ে করা
রিজিক বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকরী আমল বিয়ে করা। যারা অবিবাহিত তারা নেক নিয়তে বিয়ে করলে মহান আল্লাহ তাদের অভাব দূর করে দেবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ন, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা নুর : আয়াত ৩২)
যে কোনো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন খাবার খায় আর যদি বিসমিল্লাহ বলে; তবে শয়তান ওই খাবারে অংশ নিতে পারে না। যেটুতু খাবার আছে তা (পরিমাণে কম হলেও) তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
অনুরূপভাবে কেউ যদি ঘরে প্রবেশ করার সময় বিসমিল্লাহ বলে তখনও শয়তান তার সঙ্গে বাসায় ঢুকতে পারে না। এভাবে বান্দা যখন সব কাজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে, তখন শয়তান সব কাজ থেকে মাহরুম হয়। আর আল্লাহ তাআলা সব কাজেই বরকত দান করেন।
নিম্নলিখিত বিধান মেনে চলা:
১. সৎকর্মশীল হতে হবে।
২. সকল প্রকার হারাম থেকে বেচে থাকতে হবে।
৩. যার হক তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে ও ইন্সাফ করতে হবে।
৪. ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।
৫. জিহবা জিকিরে সিক্ত থাকতে হবে।
৬. অপচয় থেকে বেচে থাকতে হবে।
৭. নজরকে হেফাজত করতে হবে, পর্দা করতে হবে।
৮. নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া জান্নাতীদের লক্ষণ।
৯. আত্মশুদ্ধি দুনইয়া ও আখিরাতে সফলতা আনে।
IFM desk