মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১০:৩১ পূর্বাহ্ন




মোদির হ্যাটট্রিক নাকি পতন?

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১ জুন, ২০২৪ ৫:২০ pm
Shri Narendra Modi Narendra Damodardas Modi Prime Minister of India ভারত ভারতের ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি মোদী नरेंद्र दामोदर दास मोदी নরেন্দ্র মোদি
file pic

আগামী ৪ জুন নির্ধারিত হবে দিল্লির মসনদে কে বসছে। কে হবে লোক কল্যাণ মার্গের আগামী পাঁচ বছরের বাসিন্দা? এসব উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র কয়েকটি দিন। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রায় ৯৬ কোটি ৯০ লাখ ভোটারের রায়ে নির্ধারিত হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তির ভবিষ্যৎ। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা, শান্তি ও শৃঙ্খলা এই দেশটির উপর অনেকাংশেই নির্ভর করছে। তাই ভারতের নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশে রয়েছে তুমুল আগ্রহ। বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো অমীমাংসিত বিষয় নির্ভর করছে দিল্লির এই সদিচ্ছার উপরে।

বুথ ফেরত সমীক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হলেও এবারে নির্বাচন নরেন্দ্র দাস দামোদর মোদির জন্য বড় চ্যালেঞ্জও বটে। নির্বাচনের শুরুতে মোদির এনডিএ জোট ৪০০ আসন পাওয়ার যে টার্গেট বেঁধে দিয়েছে, ফলাফল বেরোনোর আগে তা অনেকটাই ফিকে হয়ে যাচ্ছে বলছে ভোট কৌশলীরা। শুধুমাত্র ভোটারদের কাছে টানতে মোদির এই রাজনৈতিক স্ট্যান্ড বলে ভাবছে অনেক। বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করতে মোদির এই ম্যাজিক অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। চতুর্থ দফা ভোট দান শেষ হওয়ার পরে নরেন্দ্র মোদির জোট এখন ম্যাজিক ফিগার ২৭২ অতিক্রম করতে পারবে কিনা সে আশঙ্কা দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তবে এটা ঠিক মোদির জয়রথ এবার আগের মতন মসৃণ হবে না।

একক কোনো জাতীয় ইস্যু না থাকায় মোদির পালে এবার হাওয়া অনেক কম। তার উপরে ভোটারদের কম উপস্থিতি চিন্তার ভাঁজ দ্বিগুণ করেছে শাসকদলকে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই নির্বাচনে রাম মন্দির ও হিন্দুত্বের টনিক এর চেয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও উচ্চ বেকারত্ব। তার সাথে যুক্ত হচ্ছে দুর্নীতি, বন্ড কেলেঙ্কারি, ধর্মীয় সহিংসতা ও জাত পাতের রাজনীতি। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোদির এবার বৈতরণী পার হতে হলে আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে চূড়ান্ত বোঝাপড়া করতে হবে তা না হলে ভেস্তে যেতে পারে মোদির ক্ষমতায় আসার অভিলাষ।

অন্যদিকে মোদির বিরোধী কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট শুরুতে বিহারের নীতিশ কুমারের জন্য হোঁচট খেলেও নির্বাচনের ফলের দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই ব্যাক ফুটে হয়ে যাচ্ছে। মোদি বিরোধী এই বৃহৎ শক্তি যেকোনো কিছুকে রুখে দেয়ার ক্ষমতা রাখে এখন। এই বিরোধী জোট এখন আগের চেয়ে অনেক পরিণত, পরিপক্ক ও পরিপুষ্ট। তবে এই জোটের মধ্যে বিষ ফোঁড়া হচ্ছে কে হবেন ইন্ডিয়া জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী তা ঠিক না হওয়া। সময় হয়তো সবকিছুর উত্তর দিয়ে দিবে। তার উপরে এই জোটের শরিক ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেন ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হওয়াকে মোদি সরকারের চূড়ান্ত দমন নিপীড়নের অধ্যায় বলে মনে করছেন অনেকে। এই জোটকে তদন্ত সংস্থা ইডি সিবিআই আয়কর বিভাগ ইত্যাদি দিয়ে জব্দ করায় মোদি নিজেই বিরোধীদের আরো সুসংহত করতে সহযোগিতা করেছে বলে ধারণা ভারতীয় গণমাধ্যমের।

মোদির সমালোচনা থাকলেও মোদির বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। যার কারণে হলফ করে বলা যায় না মোদি জোটের এনডিএ জোটের আসন ৩৫০ থেকে একেবারে ২৫০ এর নিচে নেমে যাবে। আবার খুব জোয়ার বইছে এমনও না যে ৪০০ আসন পাবে। তবে লড়াইটা হবে সেয়ানে সেয়ানে, এটা সুনিশ্চিত। কোনো পক্ষ একে অপরকে ছেড়ে দেয়ার পক্ষপাতী না। ভারতের লোকসভার মোট আসন (৫৪৩+২) ৫৪৫, ৫৪৩টি আসন সাধারণ ভোটে নির্বাচিত এবং ২টি আসন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত সংসদ সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত। ৯৬ কোটি ৯০ লাখ ভারতীয় নাগরিকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এবারের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ তথা লোকসভা নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে।

কে আসতে চলেছে ক্ষমতায়? ভারতের প্রখ্যাত ভোট কুশলী যোগেন্দ্র যাদব ও প্রশান্ত কিশোর এই প্রশ্নের উত্তরে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। ভারতের ৫৪৩টি লোকসভা আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২৭২টি আসনে জেতা জরুরি। তবে যোগেন্দ্র মত দিয়েছেন, ২৭২ আসনের চেয়েও অনেক কম আসন পাবে এবার বিজেপি। এমনকি শরিকদের (এনডিএ) নিয়েও এবার সরকার গঠনে ব্যর্থ হতে পারে নরেন্দ্র মোদির দল। অন্যদিকে ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোর দাবী করেন কোন ক্রমেই ম্যাজিক ফিগার ২৭২ এর কমে আসবে না আবার ৩৭০ এর উপরে ও যাবে না। এনডিএ তথা বিজেপি জোট নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি আশা করছে, এবার ৪০০ আসনের বেশি পেয়ে তারা আবারও সরকার গঠন করবে। তবে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে বিজেপির এমন আশাকে দুরাশা বলছেন ভারতীয় সিফোলজিস্ট বা নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে এমন মত দিয়েছেন, দেখছেন নির্বাচনে ভোটারদের কম উপস্থিতি যা শাসকদলকে খানিকটা লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করবে।

নির্বাচন সমীক্ষা বলছে বিজেপি এবার পূর্ব ভারত থেকে দক্ষিণ ভারতে উল্লেখযোগ্য হারে আসন হারাবে। এ অঞ্চলে রয়েছে দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, বিহার, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটকের মতন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। অন্যদিকে বিজেপির মূল শক্তির উৎস উত্তর ভারতবর্ষ ও পশ্চিম ভারত বর্ষ। আসাম, উড়িষ্যা, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, অন্ধপ্রদেশ, ও কেরালায় বিজেপির ভোট বাড়ছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তারা। অন্ধ্র প্রদেশে চন্দ্রবাবু নায়ডুর সঙ্গে জোটে থাকার কারণেও আসন বাড়তে পারে বিজেপির । অন্যদিকে বিহারে ভোট কমার কারণ নীতিশের পল্টিবাজি রাজনীতি, উত্তর প্রদেশের আরএনডি, মহারাষ্ট্রে শিবসেনার দুই ভাগে একনাথ শিন্ডে ও উদ্ধব ঠাকরে পৃথক হয়ে যাওয়ার মূল কারণে এবার উত্তর প্রদেশে বিজেপির পক্ষে পরিস্থিতি অনুকূল নয় বলে মত দিয়েছেন অনেকে। বিজেপি বেশ কয়েকটি আসন হারাবে এই উত্তর প্রদেশে। এতদিন ধরে উত্তর প্রদেশ ও গুজরাটের ভোটে ভালো ফলাফলই সাফল্যের শিখরে পৌঁছিয়েছে বিজেপিকে। এবারও সেই উত্তর প্রদেশের উপর নির্ভর করছে বিজেপির ভাগ্য।

বিজেপি আর্থিকভাবেও শক্তিশালী দল। তারা নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থকে এই নির্বাচনে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বভারতীয় দল হিসেবে বিজেপির সাংগঠনিক ক্ষমতা যথেষ্ট সংহত। বলা যায়, ভারতে বিজেপি এখন পিকফর্মে রয়েছে। অর্থ-সংগঠন-নেতৃত্ব-রাজনীতি সবক্ষেত্রেই গোটা ভারতে বিজেপিকে রুখবার ক্ষমতা এককভাবে অন্যকোনো রাজনৈতিক দলের নেই। বিজেপিবিরোধী জোটবদ্ধতার আক্রমণকেও বিজেপি নানাভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। আঞ্চলিক স্বার্থ, অর্থ, পদলাভ ইত্যাদি বিবেচনায় এবারের নির্বাচনে ভারতব্যাপী বিজেপির জয়লাভ ঠেকানো সহজ নয়। তবুও, বিজেপিবিরোধী লড়াইয়ে রাহুল গান্ধী, এনসিপি প্রধান শারদ পাওয়ার, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ডিএমকে প্রধান এমকে স্ট্যালিন, সিপিএমের সীতারাম ইয়েচুরি ও পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনন্য ভূমিকা পালন করছে। যদিও তা মোদির মতন পোড় খাওয়া, ধুরন্ধর, কৌশলী ও লড়াকু সৈনিকের কাছে এসব কিছুই না।

আগের বারের নির্বাচনের ন্যায় এবারও মোদির ম্যাজিক প্রকাশ্যে এলো যেমন সপ্তম তথা শেষ দফার ভোটের প্রচার শেষ করেই কন্যাকুমারীর বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালের ‘ধ্যানমণ্ডপম’-এ প্রায় ১৫ ঘণ্টা ধ্যানে বসে কাটিয়েছেন মোদি। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের প্রচার শেষে গিয়েছিলেন কেদারনাথ এবং ২০১৪ সালে গিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের শিবাজির প্রতাপগড় দুর্গে। তবে কি এবারও এই ম্যাজিকে পার হতে চাইছেন ভোট বৈতরণী? সময় হয়তো এর যথার্থ জবাব দিয়ে দিবে। তবে যেই ক্ষমতায় আসুক
দক্ষিণ এশিয়ার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মনোযোগী হবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: প্রশান্ত কুমার শীল, শিক্ষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, (গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD