সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে গ্রেপ্তার ও নিপীড়নের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমিছিল ও বিক্ষোভ করছে আন্দোলনকারীরা। সকাল থেকে এসব কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও জনতা অংশ নেন। হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে মুস্তাক আহমদ নামে ২৬ বছর বয়সী এক যুবক নিহত হয়েছেন। ওদিকে খুলনায় ছাত্র-জনতার গণমিছিল চলাকালে সংঘর্ষে মো. সুমন নামের এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৫ পুলিশ সদস্য।
কোটা সংস্কারের আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় নিহতদের বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থী-জনতার সম্মিলিত উদ্যাগে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। শুক্রবার (২ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দ্রোহযাত্রার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ শহীদ মিনারে এসে জড়ো হন। সরেজমিনে দেখা গেছে, শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নিয়েছেন এ কর্মসূচিতে।
এসময় তারা স্লোগান দিতে থাকেন, আমার ভাই মরলো কেন, স্বৈরাচার জবাব চাই। লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই। সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙ্গে দাও, গুঁড়িয়ে দাও; দিয়েছি ত রক্ত আরও দেবো রক্ত, আমার ভাই মরল কেন শেখ হাসিনা জবাব দে, শেখ হাসিনা স্বৈরাচার, এই মুহূর্তে গদি ছাড় ইত্যাদি।
শিক্ষার্থী-জনতার এই বিক্ষোভে উপস্থিত রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক আসিফ নজরুলসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
এর আগে আড়াইটার দিকে প্রেস ক্লাব থেকে শহীদ মিনারের উদ্দেশ্য দ্রোহযাত্রা শুরু করে শিক্ষক-জনতা। দ্রোহযাত্রার সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে গণহত্যা, গুম, খুন ও হামলায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা ছাত্রঐক্যের ‘ছাত্র বিক্ষোভ’ কর্মসূচি চলছে। বিক্ষোভকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) যেতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এরপর শাহবাগে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনকারীরা বলেন, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছি, আমাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এখন আমরা শাহবাগে অবস্থান নিয়েছি।
এর আগে শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে ছাত্র ঐক্যের মিছিল শুরু হয়। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মিছিলটি সামনের দিকে এগোতে থাকে। এ সময় পুলিশ বাধা দিলেও শিক্ষার্থীরা সামনে এগিয়ে যায়। এসময় তারা কোটা আন্দোলনে নিহতদের হত্যার প্রতিবাদ ও সরকার পতনের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
উত্তরায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ ১
রাজধানীর উত্তরায় জমজম টাওয়ারের সামনে কোটা সংস্কারের আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় নিহতদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে।
শুক্রবার (২ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৪টায় উত্তরার ১১নং সেক্টর মাইলস্টোনের সামনে আন্দোলনকারীরা গণমিছিল বের করলে এ সংঘর্ষ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিক্ষার্থীদের গণমিছিলকে কেন্দ্র করে পুরো উত্তরা এলাকায় পুলিশের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ছিল। মিছিলের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশকে ফাঁকা গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে দেখা যায়।
এ ঘটনায় উত্তরা ১১নং সেক্টরের ১নং রোডে অবস্থিত ভুবন লন্ড্রি হাউজের মালিক দুলাল হাওলাদার গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে। তাকে উত্তরার ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কে কেন্দ্র করে আজ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় কর্মসূচি রয়েছে। বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে জমায়েত হয়েছে বৃষ্টি উপেক্ষা করে।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ।
খুলনায় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। শুক্রবার (২ আগস্ট) বিকেলে নগরীর জিরো পয়েন্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওযার এক পর্যায়ে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়।
এরপর বেলা সোয়া ৩টার দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ও জিরো পয়েন্ট এলাকায় মিছিল নিয়ে যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকেল সোয়া ৪ টা পর্যন্ত সড়কে শিক্ষার্থী এবং পুলিশ মুখোমুখি অবস্থান করছিল।
হবিগঞ্জে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। শুক্রবার (২ আগস্ট) দুপুরে জুমার নামাজ শেষে হবিগঞ্জ শহরে এ ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষ চলাকালে আন্দোলনকারীরা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের এমপির বাসভবনের সামনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এছাড়াও পুড়িয়ে দেয়া হয় অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল।
জানা যায়, জুমার নামাজের পর কোর্ট মসজিদ প্রাঙ্গণে কানায় কানায় পূর্ণ হয় শিক্ষার্থীরা। এ সময় স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে চারপাশ। এক পর্যায়ে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি জানায়। এরপর থেকে উত্তপ্ত হয়ে উঠে পরিবেশ। শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। এক পর্যায়ে পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তিন শতাধিক রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে সংঘর্ষ চলছে।
বৃষ্টি উপক্ষো করে চট্টগ্রামের রাজপথে নেমে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিলে’ অংশ নেন হাজারো শিক্ষার্থী। বৃষ্টিতে ভিজে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে তারা মুখরিত করে তুলে রাজপথ।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। যাত্রাপথে যেখানেই পুলিশ সদস্যদের চোখে পড়েছে সেখানেই শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেন। মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে নগরীর ওয়াসা মোড়ে পুলিশের একটি সাঁজোয়া যান দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। সাঁজোয়া যান লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন। সেখানে থাকা একটি ট্রাফিক পুলিশের একটি বক্স ভাঙচুরের পাশাপাশি দামপাড়া পুলিশ লাইনের গেট লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল ছুঁড়ে মারেন তারা। এছাড়া টাইগারপাস মোড় ও বহদ্দারহাট মোড়ে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বেশ কিছু সংখ্যক পুলিশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে আন্দোলনকারীদের পেছনে থাকলেও কোনো প্রকার বাধা দেয়নি তারা। আন্দরকিল্লা থেকে বহদ্দারহাট মোড়ের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। এ হিসেবে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে যান।
আজ জুমার নামাজের পর আন্দকিল্লা মোড়ে প্রথমে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। আগে থেকেই বেশকিছু সংখ্যক পুলিশ সদস্য আন্দরকিল্লা মোড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন। এরপর সেখান থেকে রাইফেলস ক্লাব, নিউমার্কেট, ফলমন্ডি, স্টেশন রোড, বিআরটিসি, পলোগ্রাউন্ড মাঠ হয়ে টাইগারপাস মোড়ে গিয়ে কিছু সময় সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন। এখান থেকে কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী দেওয়ানহাটের দিকে চলে গেলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী লালখান বাজার হয়ে বহদ্দারহাটের দিকে যেতে থাকেন। পথিমধ্যে ওয়াসা মোড়ে পুলিশের একটি সাঁজোয়া যান দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং সেটি লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারেন এবং ট্রাফিক পুলিশের একটি বক্সও ইটপাটকেল ছুঁড়ে মেরে ভাঙচুর করেন তারা।
এ সময় ওয়াসা মোড়ে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী অবস্থান নিলে শিক্ষার্থীরা তাদের ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে বাগমনিরাম গলির ভেতরে ঢুকে পড়েন। সেখান থেকে জিইসি মোড়, ষোলশহর দুই নম্বর গেট এবং মুরাদপুর হয়ে বহদ্দারহাট মোড়ে গিয়ে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৫টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করার পর শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিয়ে মুরাদপুরের দিকে চলে যান।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মাসুদ আহমেদ সমকালকে বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় অতর্কিত পুলিশ বক্সে হামলা চালায়। তবে তখন সেখানে কোনো পুলিশ সদস্য ছিল না। এ বিষয়ে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এদিকে শিক্ষার্থীরা যেসব পথ দিয়ে মিছিল নিয়ে যান, সেসব পথে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। কয়েকটি পয়েন্টে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে শিক্ষার্থীদের যাত্রাপথকে নির্বিঘ্ন রাখেন। এতে যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তবে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম।
এর আগে গতাকল বৃহস্পতিবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, চট্টগ্রামের অন্যতম সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি ‘প্রার্থনা ও ছাত্র জনতার গণমিছিল’ এর ডাক দেন। এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, আইনজীবী, ডাক্তার, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, আলেম-ওলামা, শ্রমিক, অভিভাবকসহ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিকদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে তাতে হাজারো মানুষ অংশ নেন। মিছিলে অংশ নেন বিপুল সংখ্যক নারী শিক্ষার্থীও। এর মধ্যদিয়ে বড় ধরনের একটি শোডাউন করে দেখালেন শিক্ষার্থীরা। বিকেল সাড়ে ৩টায় টাইগারপাস মোড়ে দিনের কর্মসূচি শেষ করে যে যার গন্তব্যে চলে যান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র জনতার মিছিলে পুলিশ হামলা করেছে। আজ শুক্রবার বিকেলে সিলেটের আখালিয়া এলাকায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থী এবং জনতার মিছিলে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং রাবার বুলেট ছুড়ে হামলা করেছে বলে জানা যায়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, এই হামলায় অন্তত দেড়শো জন শিক্ষার্থী ও জনতা আহত হয়েছেন।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি ‘দোয়া ও প্রার্থনা’ শেষে ছাত্র জনতার মিছিল বের করেন শাবি শিক্ষার্থীরা৷ পরে মিছিল নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে যান। সেখানে ৮-১০ মিনিট বিক্ষোভ করে ছাত্র জনতার মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা শহরের দিকে যাত্রা করেন। পরে ৪টার দিকে মিছিল আখালিয়ায় মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে সামনে পৌঁছালে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ার শেল ছুড়ে। শিক্ষার্থীরা তখন পুলিশকে লক্ষ্য করে পিকেটিং করে থাকলে পুলিশ পিছু হটে এবং বিজিবি এলাকার সামনে থেকে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেলের গ্যাস এবং রাবার বুলেট ছুড়ে বলে শিক্ষার্থীরা জানান।
এদিকে বিকেল সাড়ে ৫টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মদিনা মার্কেট, কালীবাড়ি এবং আখালিয়া এলাকায় পুলিশি হামলা চলছিল।
পুলিশের এই হামলায় ছাত্র জনতার মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এতে অন্তত দেড়শ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে শিক্ষার্থীরা জানান। তবে তাৎক্ষণিক কারো নাম জানা যায়নি। তবে ঘটনাস্থল এবং মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়া ছাত্র জনতার মধ্যে থেকে প্রায় ছয়জনকে পুলিশ আটক করেছে বলে জানা গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শাবি শাখার সমন্বয়ক আসাদুল্লাহ আল গালিব সমকালকে বলেন, ‘ন্যাক্কারজনকভাবে এবং বর্বর কায়দায় আমাদের মিছিলে পুলিশ হামলা চালিয়ে। এই হামলায় দেড় থেকে দুইশ’ জনের মতো ছাত্র জনতা আহত হয়েছেন। আমাদের যে মেয়েগুলো ছিলো মিছিলে আমরা তাদের খোঁজ পাচ্ছি না। ভয়ে আতঙ্কে কোন দিকে গেছে এটা এখনো জানতে পারিনি। তবে শিক্ষার্থীরা কোনো বাসায় আশ্রয় নিলে সেখানেও পুলিশ গিয়ে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে আজ।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ৯ দফা দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ১ নম্বর গেটের সামনে গ্রাফিতি অঙ্কন, গায়েবানা জানাজা ও বিক্ষোভ হয়েছে। এতে অংশ নেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিসহ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, গ্রিন ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার সকালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দেওয়ালে ‘একমাত্র সান্ত্বনা শহীদের মর্যাদা’, ‘স্টপ ডিক্টেটরশিপ’, ‘আগামী ফাগুনে আমরা হবো লাখোগুণ’ ইত্যাদি লেখেন শিক্ষার্থীরা। এরপর জুমার নামাজের বিরতিতে যান তারা। জুমার পর বিক্ষোভ করতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এতে সংহতি জানান অন্তত ৩০ জন শিক্ষক।
পরে শিক্ষার্থীরা চলমান আন্দোলনে নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনায় গায়েবানা জানাজা পড়েন। এতে অংশ নেন আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী-শিক্ষক। গায়েবানা জানাজা শেষে তারা মিছিল নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা প্রদক্ষিণ করে আবার নর্থ সাউথের ১ নম্বর গেটে আসেন। সেখানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে আজকের কর্মসূচি শেষ হয়। সমাবেশে হাসিবুল হাসান শান্তসহ শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন। শিক্ষকরা সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
ফেনীতে সড়ক অবরোধ করে গণমিছিল
ফেনীতে বৃষ্টিতে ভিজে শিক্ষার্থী-জনতাকে হত্যার প্রতিবাদ ও ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নে সড়ক অবরোধ করে গণমিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর শহরের জহিরিয়া মসজিদের সামনে থেকে এ গণমিছিল শুরু হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের ‘আমার ভাই মরলো কেন, প্রশাসন জবাব চাই,’ ‘তুমি নও আমি নই, রাজাকার রাজাকার’, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’,‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রাষ্ট্র কারোর বাপের না’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন তারা। প্রায় ৩০ মিনিট সেখানে অবস্থান করে মোনাজাত করা হয়। পরে আবারও মিছিল নিয়ে শহীদ শহিদুল্লাহ কায়সার সড়কে যান শিক্ষার্থীরা।
চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের গণমিছিলে সর্বস্তরের মানুষ
চট্টগ্রামে জুমার নামাজ শেষে গণমিছিল কর্মসূচি পালন করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। শুক্রবার নগরীর আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের সামনে থেকে পূর্বনির্ধারিত এ গণমিছিল শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে অনুষ্ঠিত এ গণমিছিলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার লোকজন অংশ নেন। মিছিলটি আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ থেকে শুরু হয়ে নগরীর নিউমার্কেট মোড়ে গিয়ে সমাপ্ত হয়। বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য আশরাফ উদ্দিন বলেন, আমাদের ৯ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন কর্মসূচি চলমান থাকবে।
লক্ষ্মীপুরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা, আহত ১৫
লক্ষ্মীপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মিছিলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় মানবজমিন পত্রিকার সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে শহরের চকবাজার এলাকায় গণমিছিল শুরু হলে এই হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। প্রকাশ্যেই অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করছে যুবলীগের এক কর্মী। ওই ব্যক্তি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একেএম সালাউদ্দিন টিপুর গাড়ি চালক সুমন বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে শহরের চকবাজার জামে মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনকারীরা। নামাজ শেষ হতে না হতেই সাবেক জেলা যুবলীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম সালাউদ্দিন টিপুর নেতৃত্বে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় মসজিদে আসা মুসল্লিসহ ছাত্র আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয়। পরে কলেজ রোড এলাকায় আন্দোলনকারীরা বৃষ্টি উপেক্ষা করে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে মিছিল নিয়ে উত্তর তেমহুনীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তারা। এক পর্যায়ে মিছিলের পিছন দিক থেকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের বাসার দিকে ইটপটাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা মিছিলকারীদের ওপর হামলা চালায়। এতে মানবজমিন পত্রিকার প্রতিনিধি মো.ইউসুফ ও ছাত্র আন্দোলনকারীসহ কমপক্ষে ১৫জন আহত হয়।
ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে শিক্ষার্থীদের গণমিছিল
কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের হত্যার বিচার ও মামলা প্রত্যাহারসহ ৯ দফা দাবিতে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে গণমিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ বাদ জুমা পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ‘আমার ভাই মরলো কেন, প্রশাসন জবাব দে’, ‘আপোষ না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’, ‘স্বৈরাচারির গতিতে, আগুন লাগাও এক সাথে’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা। শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ শেষে হবিগঞ্জ শহরে এই ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা আজ গণমিছিল কর্মসূচি দিয়েছেন। বাদ জুমা হবিগঞ্জ শহরের কোর্ট মসজিদ চত্বর ও খোয়াই নদীর তীরে নূরুল হেরা জামে মসজিদের সামনে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এ সময় সাইফুর রহমান টাউন হলের সামনে অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দুপুর আড়াইটার দিকে নূরুল হেরা জামে মসজিদের সামনে থেকে মিছিল বের হলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়।
এ খবর ছড়িয়ে পড়লে কোর্ট মসজিদের সামনে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীরা তাদের ধাওয়া দেন। তখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চলে যান। পরে শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু জাহিরের বাসার সামনে থাকা কয়েকটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করেন।