রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে, গলা ফাটিয়ে শত শত মানুষ স্লোগান দিচ্ছেন ‘তুমি কে আমি কে, ফিলিস্তিন ফিলিস্তিন’। চারপাশে শোভা পাচ্ছে লাল-সবুজ আর সাদা-কালো রঙের পতাকা। অনেকের হাতে রয়েছে ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’, ‘গাজা রক্তে রঞ্জিত, বিশ্ব কেন নীরব’- স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। চারদিকে শুধু মিছিলের গর্জন। এ যেন রাজধানীর বুকে নেমে এসেছে একখণ্ড ফিলিস্তিন।
শনিবার (১২ এপ্রিল) ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠেয় ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচির আগে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজার হাজার মানুষ। মানবাধিকার সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদের ‘ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘গাজা উই আর উইথ ইউ’, ‘স্টপ জেনোসাইড ইন গাজা’সহ বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড বহন করেন। পাশাপাশি তারা ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান।
সমাবেশে আসা মানুষ গাজায় ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসনকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ উল্লেখ করে তা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সমাবেশে উপস্থিত ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আবু মূসা বলেন, আজ আমরা গাজাবাসীর কণ্ঠস্বর। ফিলিস্তিনে প্রতিদিন শিশু মরছে, মা কাঁদছে। আমরা আর চুপ করে থাকতে পারি না। আর জাতিসংঘ ও মুসলিম বিশ্বের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ইসরায়েল আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এমন অবস্থা বাংলাদেশ সরকারকেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কূটনৈতিকভাবে জোরালো অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান এই শিক্ষার্থী।
আব্দুস সবুর নামের এক মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, গাজার প্রতিটি শিশু, নারী ও সাধারণ নাগরিক আজ নিরাপত্তাহীন। মানবতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এখনই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়।
এরইমধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ আশপাশের পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচি শুরু হওয়ার সময় নির্ধারিত রয়েছে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে প্রতিদিনই বাড়ছে ইসরাইলি হামলার তীব্রতা। এতে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এ অবস্থার প্রতিবাদে ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আজ ‘মার্চ ফর গাজা’ শিরোনামে জমায়েতের ডাক দিয়েছে ‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম।
মিছিলে মিছিলে প্রতিবাদী মানুষের গর্জন, লোকে লোকারণ্য চারদিক
মানুষের ঢল এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। লোকে লোকারণ্য আশপাশের সব এলাকা। একের পর এক মিছিল নিয়ে জড়ো হচ্ছেন মানুষ। তাদের স্লোগানে কম্পিত হচ্ছে পুরো এলাকা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মিছিলগুলো থেকে ভেসে আসছে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষের সম্মিলিত গর্জন।
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে আজ (শনিবার) ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হবে ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচি। বিকেল ৩টায় এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এখানে আসা প্রায় সবার হাতে রয়েছে দেশের পতাকা ও ফিলিস্তিনের পতাকা। সবার লক্ষ্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সেখানে গাজার নিরস্ত্র জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ, বিশ্বজনমত গঠন এবং মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হবে।
মূল অনুষ্ঠান বিকেলে হলেও সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রতিটি গেটে মানুষের ঢল নেমেছে। গাজায় চলমান বর্বরোচিত ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং মানবিক সহানুভূতি জাগ্রত করতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্যতিক্রমধর্মী এই গণজমায়েত। বিকেল ৩টা থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হবে এই ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটক সংলগ্ন রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। এরই মধ্যে চলছে কম্পিত হওয়া মিছিল আর স্লোগান।
মিছিলে অংশ নিয়েছেন ধানমন্ডি থেকে আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জুলফিকার আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমানে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের জীবনে মহাপ্রলয় নেমে এসেছে। ফিলিস্তিনের মুসলমানরা ইসরায়েলি বাহিনীর নির্যাতন, হামলা ও দখলদারিত্বের শিকার হয়ে আসছে। এই অবস্থায় আমরা মুসলিম হিসেবে কিছুই করতে পারছি না। আজ অন্তত সুযোগ এসেছে আমরা পাশে আছি- এটা জানান দেওয়ার। আর এটাই আমাদের প্রতিবাদ। মুসলমান হিসেবে তাদের প্রতি সমর্থন জানানো আমাদের কর্তব্য।
তিনি বলেন, এই একই কাজ আজ করতে এসেছেন লাখ লাখ মুসলিম। এখানে এমন অবস্থা, মানুষের এত ব্যাপক উপস্থিতি, পা ফেলার জায়গা পর্যন্ত নেই। লোকে লোকারণ্য আশপাশের সব এলাকা।
দোয়েল চত্বরের দিক থেকে টিএসসি হয়ে মিছিলের সঙ্গে আসা আরেকজন মোতাসিম বিল্লাহ বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কোনো কর্মসূচিতে মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে বাইরে এত মানুষের ঢল আগে কখনো দেখিনি। যতদূর দেখা যাচ্ছে দল বেঁধে আসছে মানুষ, যেন এক জনসমুদ্র। সবার কণ্ঠে স্লোগান আর ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। গাজায় চলমান বর্বরোচিত ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। মুসলিম হিসেবে অন্য মুসলিমদের পাশে যে আমরা আছি তা জানান দিতেই আজ আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে গোটা বিশ্বেই। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও ‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট বাংলাদেশ’ এর ব্যানারে আয়োজিত হচ্ছে ‘মার্চ ফর গাজা’।
এই কর্মসূচির লক্ষ্য গাজার নিরস্ত্র জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ, বিশ্বজনমত গঠন এবং মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে সোচ্চার হওয়া।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, এতে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারি থেকে শুরু করে তারকা খেলোয়াড়, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই আয়োজনে সরব সমর্থন জানিয়েছেন।
এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অবৈধ দখলদার ইসরাইলের চলমান গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ করবে বাংলাদেশ। প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট বাংলাদেশের উদ্যোগে আজ শনিবার বিকেল ৩টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অভিমুখে ‘মার্চ ফর গাজা’ অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমাবেশের মঞ্চ আগেই প্রস্তুত হয়েছে। শনিবার সকাল থেকেই লোকজন আসা শুরু হয়েছে। তাদের হাতে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের পতাকা।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, নিরীহ ফিলিস্তিনের মানুষের পাশে দাঁড়াতে ও বিশ্ববাসীকে সোচ্চার করার উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, সারা দেশ থেকে কয়েক লাখ মানুষ এ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেবে।
জানা গেছে, ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচিতে সামিল হচ্ছে বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলাম, হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।
এরই মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টেজ নির্মাণ, ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন এবং জেনারেটর বসানোর কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রতিবাদের আওয়াজ সবার কানে পৌঁছাতে উদ্যানজুড়ে লাগানো হয়েছে ২০০টি মাইক।
এদিকে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আলেম-ওলামা, ইসলামিক স্কলার ও সেলিব্রেটিরা স্বতন্ত্রভাবে ভিডিও বার্তা দিয়ে সর্বস্তরের মানুষকে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ এই কর্মসূচির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন এবং নিজেরা তাতে অংশ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
অংশগ্রহণকারীদের জন্য পাঁচ রুট নির্ধারণ
ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের জন্য পাঁচটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। দুপুর ২টায় ঢাকার পাঁচটি পয়েন্ট থেকে মার্চ শুরু করে বেলা ৩টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণজমায়েত হবে।
স্টার্টিং পয়েন্ট ১, বাংলামোটর। প্রবেশ পথ- সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের রমনা গেইট (শাহবাগ হয়ে)
স্টার্টিং পয়েন্ট ২, কাকরাইল মোড়। প্রবেশপথ- সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট গেইট (মৎস্য ভবন হয়ে)।
স্টার্টিং পয়েন্ট ৩, জিরো পয়েন্ট। প্রবেশ পথ- সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি গেইট (দোয়েল চত্বর হয়ে)।
স্টার্টিং পয়েন্ট ৪, বকশিবাজার মোড়। প্রবেশপথ- সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি গেইট (শহীদ মিনার হয়ে)।
স্টার্টিং পয়েন্ট ৫, নীলক্ষেত মোড়। প্রবেশ পথ- সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি গেইট (ভিসি চত্বর হয়ে)।
বিশেষ নির্দেশনাসমূহ
টিএসসি মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকবে। সব পরীক্ষার্থীদের জন্য সব রাস্তা বিশেষভাবে উন্মুক্ত থাকবে। পরীক্ষার্থীদেরকে পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়া এবং যে কোনো প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতা নেওয়ার অনুরোধ রইল।
অংশগ্রহণকারীদের জন্য দিকনির্দেশনা
১. অংশগ্রহণকারীরা নিজ দায়িত্বে ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন- পানি, ছাতা, মাস্ক সঙ্গে রাখবেন এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখবেন।
২. যে কোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।
৩. রাজনৈতিক প্রতীকবিহীন, সৃজনশীল ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করুন। শুধুমাত্র বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের পতাকা বহনের মাধ্যমে সংহতি প্রকাশ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে।
৪. দুষ্কৃতকারীদের অপতৎপরতা প্রতিহত করতে সক্রিয় থাকুন। প্রতিরোধ গঠনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা গ্রহণ করুন।
‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচি কিছুটা পরিবর্তন
‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। শনিবার শাহবাগ থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত এই ‘মার্চ’ হওয়ার কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শনিবার বেলা ৩টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণজমায়েত করা হবে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে যাত্রা করা হবে না।