জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গণহত্যাসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় আগামী সোমবার ১৭ নভেম্বর ঘোষণা করা হবে।
বিচারপতি মো. গোলাম মোর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আজ বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এদিকে রায়ের তারিখ ঘোষণা ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
জুলাই গণহত্যাসহ মানবতারোধী এ মামলায় শেখ হাসিনা ও কামালের সঙ্গে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনও আসামি। ইতোমধ্যে মামুন অপরাধের দায় স্বীকার করে ‘রাজসাক্ষী’ হয়েছেন। গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর আদালত অবমাননার দায়ে চলতি বছর ২ জুলাই একই ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের সাজার আদেশ দেন।
গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৪০০ নিরিহ মানুষকে হত্যা ও ২৫০০০ মানুষের অঙ্গহানির উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসেবলিটিসহ মোট ৫টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার পতনের পর গত বছর ১৪ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রসিকিউশন বাদী হয়ে মামলা করে। এরপর গত বছর ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। গত ১ জুন প্রসিকিউশনের দেওয়া শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ তিন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
গত বছর ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার পর থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলাটি (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। গত বছরের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনই এ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রথম দিকে এ মামলায় শেখ হাসিনাই একমাত্র আসামি ছিলেন। চলতি বছরের ১৬ মার্চ এ মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করার আবেদন করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) এবং ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। একাধিকবার সময় বাড়ানোর পর চলতি বছরের ১২ মে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
গত ১২ অক্টোবর এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়। যুক্তিতর্ক শেষ হয় ২৩ অক্টোবর। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড চান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।
গত ১ জুন শেখ হাসিনাসহ এই তিন আসামির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এই তিন আসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। সেগুলো হলো গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান; হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ প্রদান; রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা; রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পোড়ানোর অভিযোগ। এই পাঁচ অভিযোগে তিন আসামির বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এ মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের দিন (১০ জুলাই) সাবেক আইজিপি মামুন গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন।