বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটের ক্ষেত্রে আদর্শগত রাজনীতির চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি বেশি লক্ষণীয়। জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সেই ধারাটাই বজায় রাখল বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের কেউ কেউ এই প্রক্রিয়াকে নির্বাচনি জোটের চেয়ে এনসিপির নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকার কৌশল হিসাবেই দেখছেন। আবার বিশ্লেষকদের কারও ধারণা, এনসিপির মধ্যে থাকা তাদের (জামায়াত) লোকজন পরিকল্পিতভাবে এই কাজটা করেছে। যার মধ্য দিয়ে তারা এনসিপিকে একরকম গিলে খাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করল। আবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি হিসাবে বিএনপি বা জামায়াত কেউই যদি এনসিপিকে জোটে না নিত, তাহলে ভিন্ন বার্তা যেত বলেও মনে করেন দু-একজন বিশ্লেষক। তাদের মতে, এনসিপিকে জোটে নেওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াত যে জুলাইকে ধারণ করে তার প্রমাণ দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দলের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনি সমঝোতা হয়েছে। রোববার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এ ঘোষণা দেন। তবে এ ঘোষণার আগেই জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দলটির বেশকিছু নেতা কড়া ভাষায় দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দেন। এছাড়া একাধিক নেতা দল ছাড়ার ঘোষণাও দেন। তাদের মধ্যে দলের মনোনয়ন পাওয়া কেউ কেউ স্বতন্ত্র নির্বাচন এবং কেউ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে দলের বড় একটা অংশ জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ততে স্বাগত জানায়।
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট নিয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, এটিকে নির্বাচনি জোট বলা হলেও আমি একে ‘পোস্ট ইলেকশন’ জোট হিসাবেই গুরুত্ব দিতে চাই। অর্থাৎ এই জোটের প্রধান গুরুত্ব হলো ‘পোস্ট ইলেকশন সিনারিওতে’। এই জোটের ভেতর দিয়ে এনসিপি নির্বাচনের পরবর্তী রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা করছে। অন্তত তারা বিরোধী দলে থাকার একটা ব্যাপার আছে। এনসিপির যে সাংগঠনিক চরিত্র, এখানে প্রথমত অনেক ধরনের আদর্শবাদী ছেলেরা যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু এতে ডানপন্থি চিন্তার তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই ছিল বেশি। ফলে জামায়াতের দিকে যাওয়াটা অনেকের কাছে বিস্ময়কর হলেও এটা অস্বাভাবিক নয়। দ্বিতীয়ত, এনসিপির জন্ম তো ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকারের কাছাকাছি থেকে এই দলটার জন্ম। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষমতাশালী থাকা, প্রভাবের ভেতর থাকা, প্রচারের মধ্যে থাকার একটা বিষয় আছে।
তিনি আরও বলেন, তারা চেয়েছে নির্বাচনেও যদি কয়েকটা আসন পাওয়া যায়। একদম স্বতন্ত্র নির্বাচন করলে যে সম্ভাবনাটা আরও কমে যেত। ফলে তারা একদিকে নির্বাচনের পরও রাজনীতিতেও প্রাসঙ্গিক থাকতে চেয়েছে। আবার যে কোনো মূল্যে আসনও পেতে চেয়েছে। কিন্তু আলটিমেটলি এতে এনসিপি রাজনীতির একটা বড় দেউলিয়াত্ব প্রকাশ হয়ে গেছে।
শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মুখ হিসাবে এনসিপির একটা ‘ফেস ভ্যালু’ আছে। ফলে জামায়াত তাদের ব্যবহার করবেই। কিন্তু এতে এনসিপির বড় ক্ষতি হয়ে গেল। এখানে দীর্ঘ মেয়াদে জামায়াতের লাভ আরেকটা আছে। বাংলাদেশে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে-এমন আরেকটা রাজনৈতিক দলের উত্থান শুরুতেই নষ্ট করে দেওয়া গেল। আমি বলছি না এনসিপির অনেক ভালো সম্ভাবনা আছে। কিন্তু যেটুকু সম্ভাবনা ছিল, সেটাও শেষ হয়ে গেল। জামায়াত ভবিষ্যতের জন্য আরও সেফ হয়ে গেল। আমি মনে করি, জামায়াতের পরিকল্পনায়, এনসিপির মধ্যে থাকা জামায়াতের লোকজন পরিকল্পিতভাবে এই কাজটা করল। এর মধ্য দিয়ে তারা এনসিপিকে একরকম গিলে খাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, আগে যারা তাদের (এনসিপি) জমায়াতের বি টিম, সি টিম বলত; সেই আলাপ আরও শক্ত হলো। বাংলাদেশ এখন আসলে আরও স্পষ্টভাবে দুই ভাগে ভাগ হয়ে আগামী নির্বাচনে যাচ্ছে। একটা ‘সেন্ট্রিস লিবারাল প্রো একাত্তর ফোর্স’। আরেকটা ‘সেন্ট্রাল রাইট টু রাইট অ্যান্ড এক্সট্রাফার রাইটদের গ্রুপ’। যারা একধরনের অ্যান্টি একাত্তর। কারণ, এনসিপির এখানে বসে এখন আর প্রো একাত্তরের কথা বলে লাভ হবে না। ফলে এটা একটা বড় রাজনৈতিক মেরুকরণ। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, আমরা যতটুকু জানি, এনসিপি হয়তো বিএনপির সঙ্গেও জোট করতে চেয়েছে। কিন্তু পারেনি। এর মানে হচ্ছে, ‘এনসিপি রিজেক্টেট ফ্রম বিএনপি’। কারণ, এখানে এনসিপির ক্ষমতা নেই বিএনপিকে রিজেক্ট করার। পাশাপাশি এনসিপি যদি জামায়াতের দিকে যায়, সেখানেও জমায়াতের ক্ষমতা আছে এনসিপিকে রিজেক্ট করার। কারণ, এনসিপি দলটা এখন কোনো দিকে যায়নি যে সে কাউকে রিজেক্ট করতে পারে। তাহলে এ দুই দল বা কেউই যদি এনসিপিকে না নেয়, তাহলে কী বার্তাটা যায়? তিনি আরও বলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এনসিপি জুলাই চেতনার পক্ষে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণভাবে জুলাইবিরোধী। এই দুইটা ব্যাপারে আমার মনে হয় বাংলাদেশের কারও সন্দেহ নেই। এখন এনসিপিকে যদি বিএনপি বা জামায়াত কেউই জোটে না নেয়, তাহলে আমি কী ধারণা নিতে পারি? তারা কি জুলাই চেতনা ধারণ করতে পারছে না? এনসিপিকে জোটে নেওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াত যে জুলাইকে ধারণ করে, তার প্রমাণ দিয়েছে বলেও মনে করি আমি। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোসিওলজির অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের পরিচালক ড. এম জসিম উদ্দিন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্ব সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করে জুলাইয়ের যে স্বপ্ন, গণতন্ত্র, সাম্য এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য একটি প্রেশার গ্রুপ হিসাবে কাজ করতে পারত। তবে তারা রাজনীতিতে ইতোমধ্যে অংশগ্রহণ করে ফেলেছে। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এনসিপির চাওয়াপাওয়ার সঙ্গে জামায়াতের দাবিদাওয়ার বেশি মিল পাওয়া যায় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, গণভোট, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন দাবিতে এনসিপি ও জামায়াতের চাওয়াপাওয়াটা তুলনামূলক একইরকম বা কাছাকাছি।
তিনি আরও বলেন, ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের লাভটা সবাই বুঝে নিতে চায়। বিএনপির তুলনায় জামায়াত যেহেতু এনসিপিকে অনেক বেশি আসন ছেড়ে দিচ্ছে, তাই তারা জামায়াতের সঙ্গে জোট করছে। তবে এনসিপির একটা অংশ বিএনপিতে যাওয়া বা স্বতন্ত্র নির্বাচন করার সম্ভাবনাও রয়েছে। আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটের ক্ষেত্রে আদর্শগত রাজনীতির চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি বেশি লক্ষণীয়। এনসিপি সেই ধারা অনুসরণ করছে বলে মনে হয়। তরুণদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি যে ধরনের জোটই করুক না কেন, তাদের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে হবে।
(যুগান্তর)