রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:২৮ অপরাহ্ন




অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬ ১১:১০ am
অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল ড্রাগ এমন এক ধরণের ওষুধ যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই ওষুধ মানুষ বা পশুর দেহে প্রয়োগ করলে এটি শরীরের ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে বা এর বংশবিস্তার রোধের মাধ্যমে রোগ নিরাময় করে। An antibiotic is a type of antimicrobial substance active against bacteria. It is the most important type of antibacterial agent for fighting bacterial infections, and antibiotic medications are widely used in the treatment and prevention of such infections. They may either kill or inhibit the growth of bacteria.
file pic

সম্প্রতি আই.ই.ডি.সি.আর-এর জরিপে অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা নিয়ে এক ভয়াবহ তথ্য দেখা গেছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি। আই.সি.ইউতে চিকিৎসাধীন ৪১ শতাংশ রোগীর অ্যান্টিবায়োটিকে কোনো কাজ করছে না, অন্য সব রোগের ক্ষেত্রে এ হার ৭ শতাংশ। কোনো রোগী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। বিস্তারিত লিখেছেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

অ্যান্টিবায়োটিক বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সমাদৃত এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে এর অবদান অবিস্মরণীয়। ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মানবজাতির জীবন রক্ষার প্রধান অস্ত্র হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কারণে, ওষুধের ক্ষমতা কোনো কোনো জীবাণু ধ্বংসের ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিবন্ধকতা। অনেক সময় দেখা যায়, জীবাণুগুলো একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে, তাকে বলে ‘মাল্টি ড্রাগ’ বা ‘পেনড্রাগ’ রেজিস্ট্যান্স, অনেক সময় একে বলা হয় ‘সুপারড্রাগ’, যা আরও ভয়ংকর।

সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে যে ফল পাওয়া সম্ভব ছিল, দেখা যায়, অধিক কার্যক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারেও সে ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে যে রোগ শুরুতেই ভালো করা যেত, ভুল ব্যবহারের কারণে তা আর সম্ভব হচ্ছে না, নতুন ওষুধ দরকার হচ্ছে, কখনো কখনো তাতেও কাজ হচ্ছে না।

* অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কারণ ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা প্রথমেই যে অনিয়মটা করি তা হলো, চিকিৎসকের পরামর্শ না নেওয়া। চিকিৎসকের চেয়ে ওষুধ বিক্রেতার ওপর বেশি নির্ভর করি। যদি কখনো বা বাধ্য হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেই, ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের দেওয়া বিধিনিষেধ অনেক সময় মানি কম। সময়মতো ওষুধ খাওয়া, খাওয়ার আগে, না পরে এসব আমরা খেয়াল রাখি না। অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রার ক্ষেত্রে আমরা পুরোপুরি উদাসীন থাকি। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো পূর্ণ মাত্রা কমপ্লিট না করে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া। প্রায় সময়ই দেখা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া দরকার ৭ থেকে ১০ দিন। কয়েকটা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে সুস্থবোধ করলে বা দুই-তিন দিন ওষুধ খেয়ে জ্বর ভালো হয়ে গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আর কী দরকার, এসব ভেবে নিজেরাই ওষুধ বন্ধ করে দেন। আবার অন্যদিকে কয়েক দিন অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে রোগ ভালো না হলে ‘ওষুধ কার্যকরী নয়’ ভেবে তা বন্ধ করে দেই এবং অন্য চিকিৎসকের কাছে নতুন ওষুধের প্রত্যাশায় যাই। এ ধরনের কার্যকলাপ খুবই ক্ষতিকর। এভাবে ওষুধের অপব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

মানুষ কোনো রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেই তার কাছের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেতে পারে। ফার্মেসির বিক্রেতারা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করে। যে কেউ চাইলেই ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারে, ডোজ মানছে না, নিয়ম মানছে না, যেমন ইচ্ছা হলো খাচ্ছে, যখন ইচ্ছা বন্ধ করছে। এসব আরও ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। আমাদের দেশে পাশ করা রেজিস্টার্ড ডাক্তার ছাড়াও অনেকেই প্রতিনিয়ত রোগীর চিকিৎসা করেন, বিশেষ করে গ্রামে-গঞ্জে এ সমস্যাটা অনেক বেশি এবং হাতুড়ে ডাক্তারের ছড়াছড়ি, এমনকি মাঝে মাঝে ভুয়া ডাক্তারের কথাও শোনা যায়। যাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা কম, তারা উপযুক্ত মাত্রা এবং মেয়াদ সম্পর্কে না জেনেই রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছে, এটাও একটা খারাপ দিক।

অনেক সময় আমরা নিজেরাই নিজেদের চিকিৎসা করি, কখনো আত্মীয়, কখনো বন্ধুর পরামর্শ নেই, কখনো চিকিৎসকের চেয়ে ওষুধ বিক্রেতার ওপর বেশি নির্ভর করি। ‘অমুক ওষুধে তমুক ভালো হয়েছিল, তাই আমিও ভালো হব’ এমন চিন্তাই আমাদের মধ্যে কাজ করে। এ প্রবণতাটাও অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের একটা খারাপ দিক। অধিকাংশ ফার্মেসি ডিগ্রিধারী বা উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট দিয়ে চালানো হয় না। মোটামুটি লেখাপড়া জানা অনেকেই ওষুধের দোকানে বিক্রেতা হিসাবে কিছুদিন কাজ করেই নিজেরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ফার্মাসিস্ট হিসাবে কাজ করছে। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাক্তার না থাকায় এ ধরনের বিক্রেতারাই রোগীকে ব্যবস্থাপত্র এবং অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছে। এক্ষেত্রে রোগীর বয়স ও ওজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় না। এমনকি খাবার আগে-পরে বা কতদিন খেতে হবে তারও নির্দেশনা থাকে না বা রোগীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা হয় না। ফলে রোগীর শারীরিক এবং আর্থিক উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি।

এমনও শোনা যায় অ্যান্টিবায়োটিক যেমন মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তেমনি কৃষি, মৎস্য, পশুপাখি ও মুরগির খাবারেও বৃদ্ধি বাড়াতে এবং রোগ ঠেকাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করা হয়, এতে প্রতিরোধী জীবাণু খাবার, পানি, মাটি ও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। সরাসরি না খেয়েও পরোক্ষভাবে এগুলো শরীরে প্রবেশ করে এবং এর মাধ্যমেও শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

* প্রতিরোধে করণীয়

আমাদের হাতে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সংক্রামক রোগ বেশি, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনও বেশি। তাই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে অবশ্যই সচেতনতা দরকার এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা রোধে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

* রোগীদের যা মেনে চলা উচিত

► রোগীদের সচেতন হতে হবে, তারা যেন যখন তখন ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো ওষুধ কিনে না খান। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে এবং অবশ্যই উপযুক্ত মাত্রা এবং মেয়াদ অনুযায়ী। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী মা এবং বয়স্কদের ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

► ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ওষুধ সেবন করতে হবে, যেমন-কতটুকু ওষুধ, কতক্ষণ পরপর, কত দিন, খাবার আগে না পরে ইত্যাদি। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তনের আগে ডাক্তারকে অবহিত করতে হবে, সুস্থবোধ করলেও কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। কোনো সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

* ডাক্তারের দায়িত্ব

অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভুল বা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক রোগীর ক্ষতি করতে পারে।

► সঠিক রোগ নির্ণয় ও রোগের ধরন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, ডোজ ও সময়কাল স্পষ্টভাবে প্রেসক্রিপশনে উল্লেখ করতে হবে। নেহায়েত প্রয়োজন বা জীবন রক্ষাকারী না হলে শক্তিশালী বা ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক পরিহার করতে হবে।

► অ্যান্টিবায়োটিক শুধু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে দিতে হবে, ভাইরাল যেমন-সর্দি, ফ্লু, ডেঙ্গু ইত্যাদি রোগে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত নয়।

► রোগীকে রোগ ও ওষুধ সম্পর্কে মোটামুটি কমবেশি জানানো উচিত। ওষুধের সম্ভব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানানো এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে, ওষুধ আপাতত বন্ধ করে দ্রুত ডাক্তারকে জানাতে হবে।

* ওষুধ বিক্রেতার কর্তব্য

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে ওষুধ বিক্রেতাকে অবশ্যই কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা উচিত। শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক এমনকি অন্য যে কোনো ওষুধ বিক্রি করাও উচিত নয়। সুন্দরভাবে প্যাকেটের ওপর প্রয়োজনীয় মাত্রা, কতবার, কীভাবে সেবন করতে হবে, খাওয়ার আগে বা পরে, তা রোগীকে বা রোগীর লোকজনকে বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট পরিমাণ লেখা থাকে, দ্বিতীয়বার একই প্রেসক্রিপশনে রোগী ওষুধ কিনতে চাইলে তা কোনোভাবেই দেওয়া ঠিক হবে না।

* সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব

ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধান করা উচিত। শিক্ষিত বা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট ছাড়া অন্য কেউ যেন ওষুধ বিক্রি না করে, তার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অননুমোদিত ওষুধপত্র বিক্রি বন্ধ করা উচিত। মাঝেমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যৌথভাবে বিভিন্ন ফার্মেসিতে নিয়মিত পরিদর্শন করা উচিত।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD