নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও টার্গেট কিলিং বন্ধে প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসাবে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা অর্ধশতাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে গানম্যান। এছাড়া রাজনৈতিক দলের আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকার ভিত্তিতেই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ‘গুটি কয়েক’ ব্যক্তিকে গানম্যান দিয়ে বা নির্ধারিত লোকদের নিরাপত্তা বাড়িয়ে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা নাশকতা বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সামনের দিনগুলোতে টার্গেট কিলিং বাড়ার আশঙ্কা করে তারা বলেছেন, দেশের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সবার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেন, নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কা ততই বাড়ছে। প্রার্থীদের নিরাপত্তার জন্য দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট নয়। কখনো যথেষ্ট থাকে না। আশঙ্কা থেকেই যায়। নিরাপত্তার ফাঁক গলেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঘটে যায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গানম্যান প্রার্থীদের কিছু নিরাপত্তা দেবে। শুধু গানম্যান দিয়েই টার্গেট কিলিং ঠেকানো যাবে না। গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। অগ্রিম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এলাকাভিত্তিক প্রতিপক্ষের পাশাপাশি পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির দিক থেকেও থ্রেট রয়েছে। বিদেশে পলাতক রাজনীতিবিদরা স্বাভাবিকভাবেই চাইবে টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে। অর্থনৈতিক কারণেও টার্গেট কিলিং হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টার্গেট কিলিং বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত যাদের গানম্যান দেওয়া হয়েছে বা নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপি নেতা মাসুদ অরুণ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) প্রধান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, ডেমরা-যাত্রাবাড়ী থেকে বিএনপির প্রার্থী তানভির আহমেদ রবিন, পাবনা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জাফির তুহিন, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম, বিএনপি নেতা আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব ইউনুস আহম্মেদ সেখ প্রমুখ।
জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের বাকি আর এক মাসেরও কম। আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, সে অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টার্গেট কিলিং হচ্ছে। আমরা আনন্দ-উৎসবমুখর একটি নির্বাচন চেয়েছিলাম। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে যায়নি। এ ক্ষেত্রে সরকারকে এককভাবে দোষারূপ করা ঠিক হবে না। তফসিল ঘোষণার পর মূল ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের। তারা যথযাথ পদক্ষেপ নিতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। গণমাধ্যম, সাধারণ জনগণ ও সামজিক নেতৃবৃন্দসহ সব স্টেক হোল্ডারকে সংযুক্ত করতে হবে।
ব্যক্তিবিশেষকে গানম্যান দিয়ে বা তাদের নিরাপত্তা জোরদার করে টার্গেট কিলিং বন্ধ করা সম্ভব কি-না জানতে চাইলে ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, যাদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, তাদের গানম্যান দেওয়া হচ্ছে। শুধু ওই কয়েকজনকে নিরাপত্তা দিলেই কি সারা দেশের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? এর মাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তিকে রক্ষা করা গেলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অথচ দেশের সবার সমভাবে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকেই নানা ধরনের হুমকির মুখে জুলাইযোদ্ধাসহ বেশকিছু রাজনীতিবিদ। দেশে আত্মগোপনে থাকা বা বিদেশে পলাতকরা প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের নেতাকর্মীদের উসকে দিচ্ছিলেন এ কাজে। জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে হত্যা করা হবে বলে গত কয়েক মাস ধরে বিদেশি নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত তাকে গত ১২ ডিসেম্বর গুলি করা হয়। দেশে-বিদেশে উন্নত চিকিৎসা দিয়েও হাদিকে বাঁচানো যায়নি।
পুলিশের আইজি বাহারুল আলম বলেন, যারা বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে (ভালনারেবল) রয়েছেন, তাদের একজন অস্ত্রধারী রক্ষী দিয়েছি। যারা কম ঝুঁকিতে আছেন, তাদের কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে-কিভাবে চলাফেরা করবেন, কোন সময় কখন কাকে কী জানাতে হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে সারা দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করছি। গোয়েন্দারা যাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, এবং যাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন, তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেই তালিকা বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরাপত্তা ছক প্রণয়ন করা হয়েছে।
(যুগান্তর)