সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:০৯ পূর্বাহ্ন




ভগ্নদশায় বড় কাটরা ও ছোট কাটরা

ঢাকায় মুঘল আমলের চিহ্ন বিলুপ্তির পথে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ ১০:২৯ am

বড় কাটরা ও ছোট কাটরা হলো পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত মুঘল আমলের দুটি বিখ্যাত স্থাপনা। যা মূলত মুসাফিরখানা ও সরাইখানা হিসাবে ব্যবহৃত হতো। উভয় স্থাপত্য মুঘল ঐতিহ্য বহন করলেও আকারে ভিন্ন এবং কালের বিবর্তনে এখন ভগ্নপ্রায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে পরিচিত। মুঘল আমলে ঢাকায় নির্মাণ হয়েছে প্রচুর ‘কাটরা’। কাটরা ফার্সি শব্দ। এর অর্থ অতিথিশালা বা মেহমানখানা। তবে উল্লেখযোগ্য কাটরা ছিল সদরঘাটের মায়া কাটরা, মৌলভীবাজারের মুকিম কাটরা, নাজিমউদ্দিন রোড এলাকার নবাব কাটরা এবং কাওরান বাজারের একটি কাটরা। ঢাকায় মুঘল ও নবাবি আমলে নির্মিত প্রাসাদ ও কাটরাগুলোর মধ্যে বর্তমানে শুধু বড় কাটরা ও ছোট কাটরারই নামেমাত্র অস্তিত্ব রয়েছে। সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার সময়ে নির্মিত হয়েছে বড় কাটরা ও সুবেদার শায়েস্তা খাঁর সময়ে ছোট কাটরা।

বড় কাটরা নিয়ে দুটি শিলালিপি পাওয়া গেছে, যেগুলো ফার্সি ভাষায় লিখিত। একটি ১০৫৩ হিজরিতে (১৬৪৩-৪৪ খ্রি.) এবং অন্যটি লিখিত ১০৫৫ হিজরিতে (১৬৪৫-৪৬ খ্রি.)। এর মধ্যে এশিয়ার ক্যারাভান সরাইয়ের ঐতিহ্য অনুসরণে নির্মিত বড় কাটরা দারুণভাবে সুরক্ষিত এবং মুঘল রাজকীয় স্থাপত্য রীতির সব বৈশিষ্ট্য এতে বিদ্যমান। বড় কাটরায় আছে সুউচ্চ রাজকীয় প্রবেশদ্বার। তিনতলা বিশিষ্ট এ প্রবেশপথ মনোরম ও সুদৃঢ়। বড় কাটরা নির্মাণের পর সুবেদার হয়ে ঢাকায় এসে শায়েস্তা খাঁ ছোট কাটরার নির্মাণকাজ শুরু করেন। ধারণা করা হয়, বড় কাটরা নির্মাণের প্রায় দেড় বছর পর ছোট কাটরার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। বড় কাটরা ও ছোট কাটরার পরিকল্পায় তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। তবে ছোট কাটরা অপেক্ষাকৃত ছোট। নকশা বড় কাটরার মতোই। বড় কাটরার ১৮০ মিটার পূর্ব দিকে চকবাজারের সোয়ারীঘাট এলাকায় নির্মিত হয় ছোট কাটরা।

১৬৪৪ সালের একটি শিলালিপিতে পাওয়া যায়, পথিকদের জন্য সরাইখানা হিসাবে নির্মাণ করা হয়েছিল বড় কাটরা। এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হয় আরও ২২টি দোকান। মুঘল আমলে এটি নায়েবে নাজিমদের বাসস্থান ও কার্যালয় হিসাবে ব্যবহৃত হতো।

কাটরা দুটির অবস্থা বর্তমানে শোচনীয়। দুপাশে এবং আদি কাঠামোর ওপর নতুন ভবন নির্মাণ করে হেরিটেজ ভবন ঢেকে দেওয়ায় ছোট কাটরার অবস্থা আরও খারাপ। বর্তমানে ছোট কাটরার দক্ষিণ গেট ও উত্তর গেট শুধু দৃশ্যমান। ছোট কাটরার পাশে বিবি চম্পার স্মৃতিসৌধটি দোকানপাট এমনভাবে ঘিরে আছে, হয়তো আগামীতে ভবনের অন্য কোনো অংশ আর দেখা যাবে না।

বড় কাটরা ও ছোট কাটরার মালিকানা নিয়েও রয়েছে মতবিরোধ। গবেষকদের মতে, ভবন দুটি প্রতিষ্ঠার সময় ওয়াকফ করা হয়েছিল। অবস্থানরতরা এ জায়গা অবৈধভাবে দখল করে আছে। স্থানীয় যারা বড় কাটরা ও ছোট কাটরায় অবস্থান করছেন তারাই মালিকানা দাবি করছেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকাবিষয়ক গবেষক, ঢাকা ফোরামের সভাপতি মনতাজ উদ্দিন বলেন, ‘বড় কাটরা ও ছোট কাটরার ব্যক্তিমালিকানার দাবি ভিত্তিহীন। এগুলো নির্মাণের সময় ওয়াকফ করে দেওয়া হয়েছিল। তাই আইন অনুযায়ী এ সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা কোনোভাবেই কেউ দাবি করতে পারে না। বড় কাটরার উত্তর গেটের শিলালিপিতে বিষয়টির উল্লেখ আছে। বড় কাটরা ও ছোট কাটরা সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ। এ সম্পত্তির মালিক সরকার। কিন্তু বাস্তবে ব্যক্তিমালিকানার মতোই চলছে কাটরাগুলো। নিচতালায় দোকান, ওপরে রয়েছে গুদাম এবং শ্রমিকদের বসবাস।

স্থানীয়রা বলছেন, বড় কাটরা ও ছোট কাটরা স্থাপনাকে ঘিরে তৈরি হতে পারে একটি ‘হেরিটেজ বলয়’। কাটরা দুটি প্রত্নতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় ইতিহাসের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বড় কাটরা ও ছোট কাটরাকে সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছি।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD