রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:৪৭ অপরাহ্ন




থানার পাশেই ঘোরাঘুরি করতো ‘সিরিয়াল কিলার’ সম্রাট!

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ ১০:২৬ am
firearm firearms আগ্নেয়াস্ত্র firearm Pistol Shotgun Shot gun bandhuk বন্ধুক পিস্তল অস্ত্র বন্দুক রিভলবার হ্যান্ডগান রাইফেল শটগান
file pic

ভয়ংকর ভবঘুরে সম্রাট! ছদ্মবেশে থানার আশপাশেই ঘোরাঘুরি করে ৬ মাসে করেছে ছয় খুন। থানা থেকে ৩০ গজের মধ্যেই সাভার পৌরসভার পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারের অভ্যন্তরে চারপাশে হাইস্কুল, কলেজ, সেনা ক্যাম্প ও সাভার প্রেস ক্লাবের মাঝে অবস্থিত নিরাপদ স্থানে ৬টি হত্যাকাণ্ড নাড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষকে।

সর্বশেষ রোববার জোড়া খুন হওয়া লাশ উদ্ধার করার পর সিসিটিভি ফুটেজে অবশেষে ধরা পড়ল সম্রাট।

ভিডিওতে পিলে চমকানো দৃশ্য

সাভার প্রেস ক্লাব লাগোয়া পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট খুলতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন গলদঘর্ম; তখন সিসিটিভির ফুটেজে বের হয়ে এলো পিলে চমকানো দৃশ্য। একজন লাশ কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছেন। সেই লাশ বহনকারী কেউ নয়, থানার সামনে ঘোরাঘুরি করা পরিচিত ওই ছদ্মবেশী ভবঘুরে। তার কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটাও শ্বাসরুদ্ধকর। একই ঘটনাস্থল। আগুনে পোড়া দুজনের লাশ থেকে তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। চারপাশে দমবন্ধ করা উৎকট গন্ধ।

মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে একে একে পাঁচ খুন। স্তম্ভিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। সব খুনের ধরনও আবার অভিন্ন।

সর্বশেষ দুজনের পোড়া লাশ উদ্ধার ঘিরে যখন পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব, পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটের সদস্যরা রহস্যের জট খুলতে হিমশিম খাচ্ছেন তখন আগের হত্যাকাণ্ডের জেরে খুনি শনাক্তে বসানো সিসিটিভি ফুটেজ ও অনুসন্ধান চলে। এর এক দিন আগে এক গণমাধ্যম কর্মীর ধারণ করা ভিডিও বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাতেই বের হয়ে এলো আসল খুনির চেহারা। জট খুলল একে একে ছয় খুনের রহস্য। ধরা পড়ল ভবঘুরের ছদ্মবেশী সেই ব্যক্তি। পুলিশকে তারপর আর বেগ পেতে হয়নি।

জিজ্ঞাসাবাদে একে একে ছয় খুনের দায়ও স্বীকার করেছেন তিনি। এসব কথা জানান সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরমান আলি।

পুলিশ বলছে, ওই ভবঘুরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট। সে নিজেকে কখনো পরিচয় দিচ্ছে সাভারের ব্যাংক কলোনি বা লালটেক এলাকার বাসিন্দা বলে। আদতে তার আস্তানা ছিল পরিত্যক্ত ওই পৌর কমিউনিটি সেন্টার।

এলাকাবাসী বলছেন, সম্রাটকে সবাই ভবঘুরে হিসেবেই চিনত। কখনো রাস্তায়, কখনো কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে ঘোরাঘুরি করত সে। সাভার মডেল থানা থেকে কমিউনিটি সেন্টারের দূরত্ব বড়জোর ১শ গজ। তার পাশেই সাভার সরকারি কলেজ ও সেনা ক্যাম্প। ভয়ংকর নৃশংসতা আড়াল করে সেই সম্রাট যে ছদ্মবেশে রয়েছে, সাধারণ মানুষ তো বটেই তাকে ঘিরে কখনো সন্দেহও হয়নি পুলিশের। অথচ একের পর এক খুন করে পুলিশকে ধাঁধার মধ্যে ফেলেই পরিকল্পনা করে গেছে পরবর্তী নিশানার।

সিরিজ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল ওই কমিউনিটি সেন্টারে প্রবেশ করে গত শুক্রবার ভবঘুরে এক নারী ও তার সঙ্গে থাকা ছদ্মবেশী ভবঘুরে সম্রাটের ভিডিও ধারণ করেছিলেন দৈনিক মানবজমিনের প্রতিনিধি সোহেল রানা। ওই ভিডিওতে ভবঘুরে নারী নিজের নাম সোনিয়া ও বাড়ি শেরপুর বলে দাবি করেছিলেন। সেই সোনিয়াই ছিল তার শেষ নিশানা।

ভিডিওর কথোপকথনে শোনা যায়- সম্রাট নারীকে না চিনলেও নারী সম্রাটকে ভাই সম্বোধন করছিলেন। ঠিক দুই দিন পরেই নির্মম পরিণতির শিকার হতে হয় ওই নারীকে।

পুলিশ জানায়, ওই ভিডিওতে দেখানো নারীটি যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে তা নিশ্চিত। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে নিহত অপর ব্যক্তির।

কমিউনিটি সেন্টারের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাওয়া ব্যক্তির চলাফেরা, সময়, অবস্থান ও সাংবাদিকের ধারণ করা ভিডিওতে থাকা তার বক্তব্যে হত্যাকারী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান তদন্তকারীরা। তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় ভবঘুরের ছদ্মবেশী ব্যক্তিকে।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে একই জায়গায় রোববারের দুটি হত্যাকাণ্ড ছাড়াও একই স্থানে আগের তিনটিসহ ছয়টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে সম্রাট।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরমান আলি জানান,ওই ভবঘুরেকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সে নিঃসন্দেহে সিরিয়াল কিলার। তার নিশানাই ছিল ভবঘুরে ব্যক্তিরা। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখেছি, তার নিশানায় থাকা আরেক নারী ভবঘুরে স্থান পরিবর্তন করায় শিকারির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

এলাকাবাসীর ভাষ্য- সাম্প্রতিক সময়ে পরিত্যক্ত সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার হয়ে ওঠে এক আতঙ্কের ঠিকানা।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে প্রায় ৭ মাস আগে, যখন সাভার মডেল মসজিদের সামনে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একইভাবে গত বছরের ওই কমিউনিটি সেন্টার থেকে ২৯ আগস্ট রাতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের মরদেহ, ১১ অক্টোবর রাতে এক অজ্ঞাত নারীর অর্ধনগ্ন মরদেহ এবং ১৯ ডিসেম্বর দ্বিতীয়তলার টয়লেট থেকে এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

তবে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত মরদেহগুলোর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। এরপর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কমিনিউনিটি সেন্টারে ঘিরে বসানো হয় সিসিটিভি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিদিন যাকে দেখি রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে, চুপচাপ বসে থাকতে, কখনো বিড়বিড় করে কথা বলতে, সেই লোক যে একের পর এক মানুষ হত্যা করেছে এটা ভাবতেই ভয়ে আতঙ্কে গা শিউরে উঠছে।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, ছয়টি হত্যার ঘটনা অভিন্ন। নিহতদের সবাই ভবঘুরে শ্রেণির। নিঃসন্দেহে সম্রাট মানসিক ভারসাম্যহীন বা সাইকোপ্যাথিক কিলার। কেন একের পর এক নৃশংস এমন হত্যাকাণ্ড? এসব ঘটনার মোটিভ উদঘাটন করা জরুরি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ছয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায় স্বীকার করেছে। ১৬৪ ধারা জবানবন্দি গ্রহণে সোমবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ওসি ইমরান আলি জানান, আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সম্রাট তার জবানবন্দি দিচ্ছে। যদি জবানবন্দিতে সব হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করে তবে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হবে। তার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছেন কিনা জানতে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদনও করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে পরবর্তীতে তাকে রিমান্ডে আনা হবে।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD