রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:৫২ অপরাহ্ন




জামায়াতের ৪১ দফা ইশতেহার: অর্থনীতিকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার আকাঙ্ক্ষা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ৯:২৬ pm
Bangladesh Jamaat-e-Islami বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী
file pic

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৪১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। ইশতেহারে দলটি ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে এবং মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে উন্নীত করার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেছে। এজন্য প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, আইসিটি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে জামায়াতে ইসলামী।

‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়তে নির্বাচনী ইশ‌তেহারে ১০ প্রতিশ্রু‌তি দি‌য়ে‌ছে জামায়া‌তে ইসলামী। এর ম‌ধ্যে পাঁচ‌টি ‘হ্যাঁ’ এবং পাঁচ‌টি ‘না’ র‌য়ে‌ছে। ‘হ্যাঁ’-এর ম‌ধ্যে র‌য়ে‌ছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। ‘না’-এর মধ্যে আছে- দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।

ইশ‌তেহা‌রে মোট ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। এর ম‌ধ্যে র‌য়ে‌ছে নারীর জন্য নিরাপদ কর্মস্থল, ম‌ন্ত্রিসভায় উল্লেখ‌যোগ্য সংখ্যক নারী সদস্য অন্তর্ভূ‌ক্তি। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান এই ইশতেহার তুলে ধরেন।

জামায়াতের ইশতেহারে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিশ্বের ৩৫তম অর্থনীতি থেকে ২০তম অর্থনীতিতে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। তবে ঠিক কতদিনের মধ্যে তারা এটি বাস্তবায়ন করতে চান, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি।

বিভিন্ন নির্বাচনি জনসভায় জামায়াত আমির নারীদের কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টা নির্ধারণ বাকি ৩ ঘণ্টার মজুরি বা বেতন সরকারের পক্ষ থেকে পরিশোধ করার কথা বলেছেন। তবে ইশতেহারে এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।

শুধু বলা হয়েছে, নারীদের সম্মান রক্ষা করে নিরাপদে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। মায়েদের সম্মতি সাপেক্ষে মাতৃত্বকালীন কর্মঘণ্টা কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করা হবে।

আগামী ৫ বছরের মধ্যে আধুনিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং আমদানি পণ্যের ওপর নির্ভরতা ৩০ শতাংশ কমানোর কথা বলেছে জামায়াত।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগসহ মোট ব্যয় জিডিপির ২০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেছে দলটি।

জামায়াত বলেছে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রা সহজ করতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা ও করপোরেট কর হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হবে।

হঠাৎ কর্মহীন হওেয়া শ্রমিকদের জন্য ভাতা কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো, ইসলামী ধারার ব্যাংক ও বিমাখাতের বিকাশে সহায়তার কথা বলেছে দলটি।

বেকারত্ব দূর করতে দেশের ভেতরে ও বাইরে ৭ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা করেছে জামায়াত। একইসঙ্গে বিদেশ যাওয়ার খরচ কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছে দলটি।

নির্বাচনি ইশতেহারে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে, সেগুলো হলো–

১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’- এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।

২. বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।

৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেয়া।

৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।

৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্রে বিনির্মাণ।

৬. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন।

৭. প্রযুক্তি,ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূলো আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।

৮. ব‍্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খ্যাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।

৯. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।

১০. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার মানবাধিকার নিশ্চিত করা

১১. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহিদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।

১২. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।

১৩. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়া।

১৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধবপরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি।

১৫. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা।

১৬. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

১৭. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয় বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।

১৮. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান (Universal Healthcare System) এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

১৯. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।

২০. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা।

২১. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।

২২. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জনা স্বল্পমূলো আবাসন নিশ্চিত করা।

২৩. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা।

২৪. সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২৫. সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

২৬. সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD