যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি মনে করছে, চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থি হতে পারে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বিদায়ী প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা করা জরুরি। নতুন সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করা।
সিপিডির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বিদায়লগ্নে মার্কিন সরকারের সঙ্গে একটি বৈষম্যমূলক চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, নতুন প্রশাসনের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন করা। তারা আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আপনাদের সকলের খেয়াল থাকবে যখন শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল তখন আমাদেরকে, সাধারণ মানুষকে ধারণা দেয়া হল, শুধুমাত্র শুল্ক নিয়ে আলোচনা চলছে। আপনাদের নিশ্চয়ই খেয়াল আছে, শুধু শুল্ক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
“সেটা কি? এটা ৩৫ (পাল্টা শুল্ক শতাংশে) থেকে কীভাবে আমরা ২০-এ কমিয়ে আনতে পারব এবং তার জন্য কিছু কিছু ক্রয় চুক্তি করলেই নাকি আমাদের এটি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু যে চুক্তিটি আসলো-এটি দেখে আমরা হতভম্ব। আমরা স্তম্ভিত।” তিনি বলেন, গত সরকার যদি একটি কারণেও নিন্দনীয় হয়, তবে তা হবে এই চুক্তিটি। এটি কার্যকর হলে অর্থনীতি এবং ব্যবসা বাণিজ্যে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পদে পদে বাধার মুখে পড়বে বলেও আশঙ্কার কথা জানিয়েছে সিপিডি।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিতে অযৌক্তিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে। অন্য দেশের সঙ্গে নতুন চুক্তি করলে তা যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো এবং তাদের বিধিনিষেধ মানার বাধ্যবাধকতা থাকায় নীতি-স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
এছাড়া সরকার কেবল শুল্ক সংক্রান্ত বিষয় সামনে এনেছিল; অন্য বিষয়ে তিনিসহ সকলের অজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “শুধু ট্যারিফ পার্টটি নিয়ে আমি বলেছিলাম যে ট্যারিফ পার্টটি নিয়েও এটা ডব্লিউটিও (বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা) নীতিবিরোধী। এবং এটা কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য খুব… আপনারা বলছিলেন যে, হ্যাঁ চীন বা ভারতের সাথে আমাদের একটা বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে, আমাদের অসুবিধা কোথায়।
“কিন্তু আমি তখন এটাও বলেছিলাম যে চীন ভারতের এই বৈষম্যের জন্য এরা এখন তাদের পণ্য ইউরোপে পাঠাবে কম দামে। এই যে এখন দেখেন ইউরোপে আমি আমার পণ্য এক্সপোর্ট করতে পারছি না। কেননা কম দামি চাইনিজ পণ্য ওই মার্কেটগুলো দখল করে নিচ্ছে। এবং এটাও বলেছিলাম যে উচ্চমূল্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা কিনতে পারবে না, ওখানে মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়বে।”
তিনি বলেন, “আমি এখনো মনে করি যে বাণিজ্য নিয়ে দরকষাকষি ডব্লিউটিও ফ্রেমে হওয়া দরকার এবং ডব্লিউটিও-র মেইন গাইডলাইন, এখানে প্রিন্সিপাল ফলো করা দরকার।”
চুক্তিতে মার্কিন পণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা থাকলেও, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ এবং শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া কৌশলগত খনিজ ও জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগের সুযোগ এবং কিছু খাতে নীতিগত সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সিপিডির মতে, এতে প্রযুক্তি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের বিকল্প কমে যেতে পারে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে চুক্তি থেকে সরে আসার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
বিএনপি সরকার তাদের ১৮০ দিনের পথনকশায় কয়লা উত্তলোন করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার যে ইঙ্গিত দিয়েছে তা বাস্তবায়ন করলে জ্বালানি রূপান্তর ‘বড় প্রতিবন্ধকতা’ তৈরি করবে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি। এ ধরনের উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আরও পিছিয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম
মোয়াজ্জেম বলেন, “আমরা দেখতে পেয়েছি বিএনপির রোডম্যাপের ভিতরে নতুন করে দেশে কয়লা উত্তোলনের এক ধরনের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
সরকারের আগামী দিনে কী করা উচিৎ সে পরামর্শ দিয়ে অর্থনীতিবিদ বলেন, “আমরা মনে করি যে আগামী ১০০ দিনের জন্য যেটা হবে যে ডিমান্ড ক্যাপটি (বিদ্যুতের চাহিদা) নিশ্চিত করা, নো ইলেকট্রিসিটি নো পে-র ((বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বিপরীতে) যে উদ্যোগগুলো এটি ফিক্স করা।
সিপিডির তরফে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “আমরা ১৮০ দিনের পরে যে কাজগুলো মনে করি যে গ্রিডের আধুনিকায়নের জন্য স্ট্রেস টেস্ট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিস্টেম অপারেটর, জোনাল এনার্জি অডিট, রিসোর্স টু গ্রিড ডেটা হাব, নো নিউ কোল পাথওয়ে—এই ধরনের কাজগুলোতে সরকারের কাজ করা দরকার।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ ব্যবসায়ীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন করতে হয়। এজন্য দুর্নীতি ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে। দুর্নীতি রোধে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল, ব্যাংক ন্যায়পাল ও কর ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়া উচিত।