এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়ানোর পরও ১২ কেজির তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিক্রি হচ্ছে ২২০০-২৭০০ টাকায়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা।
সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে ওই দামের তোয়াক্কা না করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছিল।
এর মধ্যেই অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। গতকাল দাম বাড়ানোর পর বেশি দামেই এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর বিভিন্ন দোকান ঘুরে এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রিতে বড় ধরনের অনিয়ম দেখা যায়।
মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামাল প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, আমদানি ব্যয় ও অন্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে। কিন্তু সরকারি দামে পরিবর্তন এলেও খুচরা বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
দাম বাড়ানোর পরও বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি মিলছে না। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে কোথাও কোথাও প্রায় ৯০০ টাকা বেশি দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ভোক্তাদের অভিযোগ, বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কম থাকা বা অনেক এলাকায় গ্যাস না থাকায় রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এ সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নিচ্ছেন। ফলে একদিকে সরকারি মূল্য বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এলপিজি।
বেশ কয়েকজন খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলেন। প্রত্যেক বিক্রেতাই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত বেশি চেয়েছেন।
হাতিরপুলের খুচরা ব্যবসায়ী রিপন বলেন, সিলিন্ডারসহ নিলে ৫২০০ টাকা পড়বে। সিলিন্ডার বাদে নিলে ২৭০০ টাকা। গ্যাস এমনিতেই কম পাচ্ছি। রেট বেশি এখন।
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী জাহিদ বলেন, সিলিন্ডার আছে আই গ্যাসের। অন্য গ্যাস হবে না। ২২০০ টাকা দাম পড়বে। নিলে নিতে পারেন। না নিলে নাই।
গাজীপুরের খুচরা ব্যবসায়ী টুটুল বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার নেই। আগামীকাল বিকেলে যোগাযোগ করেন। গ্যাসপাইলে তারপর নিতে পারবেন।
মোহাম্মদপুরের খুচরা ব্যবসায়ী কামাল বলেন, গ্যাসের সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। মালের রেট বেশি। বেশি দাম দিয়ে আমাদের কিনতে হয়। সরকারি রেটে বিক্রি করা সম্ভব নয়।
অতিরিক্ত দামের কারণে আক্ষেপ জানিয়ে রুকাইয়া ইসলাম নামে একজন ক্রেতা বলেন, বাসায় নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও দোকানে গিয়ে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না। মাসের সংসার খরচের ওপর অতিরিক্ত এই ব্যয় বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
জনগণের ওপর বারবার বোঝা চাপানো হচ্ছে। সরকারি দামের বেশি যে নেওয়া হচ্ছে, জনগণের পক্ষে সরকার কি ব্যবস্থা নিচ্ছে! কোনো ব্যবস্থাই দৃশ্যমান নয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো, বিল বেশি উঠছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। এখন সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। দিনশেষে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।-ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান
মিরপুরের ক্রেতা শামীম সোলায়মান বলেন, সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অপেক্ষা করছিলাম দাম নির্ধারণের পরে কিনবো। আজ সিলিন্ডার কিনতে এসে দেখি সেই ৮০০ টাকা বেশি চাচ্ছে। এর দায় কে নেবে। নামমাত্র লোক দেখানো অভিযান চালানো ছাড়া সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। আমরা নিঃশেষ হচ্ছি।’
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলপিজির বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু দাম নির্ধারণ করলেই হবে না, নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে কি না তা নিয়মিত তদারক করতে হবে। বিশেষ করে আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহব্যবস্থা এবং মূল্য তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। তা না হলে বিইআরসি নির্ধারিত দাম কাগজে-কলমে থাকলেও এর সুফল ভোক্তারা পাবেন না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘অতিরিক্ত দাম নিয়ে ভোক্তার পকেট কাটা হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে, সরকার নীরব-নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। এভাবে চলতে চলতে জন-অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।’
ক্যাব সভাপতি বলেন, ‘জনগণের ওপর বারবার বোঝা চাপানো হচ্ছে। সরকারি দামের বেশি যে নেওয়া হচ্ছে, জনগণের পক্ষে সরকার কি ব্যবস্থা নিচ্ছে! কোনো ব্যবস্থাই দৃশ্যমান নয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো, বিল বেশি উঠছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। এখন সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। দিনশেষে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
বাংলাদেশে এলপিজি খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘এলপিজি আমদানি কমেনি। খুচরা বিক্রেতারা হয়তো এই সমস্যাটা করছে। কোনো অপারেটর যদি বেশি দামে বিক্রি করে আর তার যদি প্রমাণ থাকে তাহলে সেই অপারেটরের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।’
সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়ে ১২ এলপিজি আমদানিকারককে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত শনিবার (৩ অক্টোবর) ইস্যু করা চিঠিতে একদিন পরেই (৪ অক্টোবর) হিসাব জমা দিতে বলা হয়। চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রাপ্ত আমদানির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বিইআরসি সূত্র বলছে, চিঠি দেওয়ার পর কয়েকটি কোম্পানি তথ্য পাঠিয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
এ বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং বিইআরসি কর্মকর্তাকে একাধিকবার কল দিলেও কেউ সাড়া দেননি।
চলতি বছর যেভাবে বেড়েছে দাম
চলতি বছরের ১০ মাসে দেশের বাজারে বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম চারবার কমে বেড়েছে পাঁচবার। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সর্বনিম্ন ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। সর্বোচ্চ ওঠে ১ হাজার ৯৪০ টাকা পর্যন্ত।
১০ মাসে সর্বনিম্ন ও দামের সর্বোচ্চ ব্যবধান ছিল ৬৩৪ টাকা। জানুয়ারির তুলনায় অক্টোবরে দাম বাড়তি ৫৩১ টাকা বা প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র দেখা যায়।
বিইআরসির তথ্য বলছে, বছরের শুরুর মাস জানুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা ৫০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা হয়। মার্চে কিছুটা কমে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এরপর এপ্রিল থেকে বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়। ওই মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭২৮ টাকা।
মে মাসে দাম আরও ২১২ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা হয়, যা চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নির্ধারিত দাম। অর্থাৎ, জানুয়ারির তুলনায় মে মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম বেড়েছিল ৬৩৪ টাকা বা প্রায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে মে মাসের পর থেকে টানা কয়েক মাসে দাম কমতে থাকে। জুনে ৫৫ টাকা কমে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৮৫ টাকা। জুলাইয়ে বড় ধরনের পতন হয়ে দাম ৩৫৭ টাকা কমে ১ হাজার ৫২৮ টাকায় নেমে আসে। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এরপর অক্টোবর মাসে আবার এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলো। চলতি মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরের দাম ২৫২ টাকা বেশি এবং জুলাইয়ের সবশেষ বড় দরপতনের পর মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৩০৯ টাকা। জাগো নিউজ