মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫০ অপরাহ্ন




সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি দেখছে বিশ্বব্যাংক

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৫:২৩ pm
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ World Bank WB বিশ্বব্যাংক বিশ্ব ব্যাংক wb International Monetary Fund আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল imf আইএমএফ আইএমএফ
file pic

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, কম রাজস্ব আদায় এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম গতি পেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ কমেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি হারিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। এর ফলে ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাও বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা। ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। এর ফলে সরকারের হাতে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি ২০২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে।

অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যেও। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত থেমে গেছে এবং বিশেষ করে নারীরা চাকরি হারিয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করছে। তবে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। ফলে সীমিত সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

এ ক্ষেত্রে সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যভিত্তিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে কর্মসূচিতে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও ভালো সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।

তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে বহিঃখাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এখন বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করা। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি করা না গেলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

অন্যদিকে একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে দক্ষতা, অবকাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ

বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২ এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়।

২০২৫–২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২ দশমিক ২ শতাংশে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।

প্রবৃদ্ধি কমার বড় কারণ বিনিয়োগের সংকোচন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫ এবং সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে নেমেছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যালোচনা, নতুন প্রকল্প অনুমোদনে সতর্কতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতায় উন্নয়ন ব্যয় কমেছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা কর্মী ছাঁটাই করেছে।

শিল্প ও কর্মসংস্থানে চাপ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতের এটি প্রথম সংকোচন।

গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা কর্মী ছাঁটাই করেছে।

বাংলাদেশ ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্যাসে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। এখন মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে। কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ও মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা হলেই বড় এলাকায় সরবরাহ কমে যায়।

অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো নারীদের অনেকে শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপ না থাকায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।

তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা এবং মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উঁচু পর্যায়ে রেখেছে। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। কম আয়ের শ্রমিকদের মজুরিও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। আগস্টে তাদের প্রকৃত মজুরি আবার ঋণাত্মক হয়ে যায়।
মূল্যস্ফীতি কমলেও চাপ বেশি

গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে গত অর্থবছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। গত আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা এবং মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উঁচু পর্যায়ে রেখেছে। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। কম আয়ের শ্রমিকদের মজুরিও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। আগস্টে তাদের প্রকৃত মজুরি আবার ঋণাত্মক হয়ে যায়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ, ভর্তুকি ও সুদসহ চলতি ব্যয়, প্রবাসী আয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনায় অর্থ সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু বেসরকারি ঋণ ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়েনি। ফলে অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি উৎপাদনের চেয়ে দামের ওপর বেশি চাপ তৈরি করতে পারে।

জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

দারিদ্র্য বেড়েছে

বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।

জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

ব্যাংক খাতে বড় ঝুঁকি

ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোয় এই হার ৫৮ দশমিক ৯ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।

ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। অথচ ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক হার ১০ শতাংশ।

প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম শিথিল করায় ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ প্রভিশন রাখতে হয়নি। এতে ব্যাংকের প্রকৃত দুর্বলতা পুরোপুরি প্রকাশ পাচ্ছে না।

দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা ২০২৬ সালের জুনে ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ছয়টি ইসলামি ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা শেষ হলেও অন্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর।

ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন ও আমানত সুরক্ষা আইন পাস করাকে ইতিবাচক বলেছে বিশ্বব্যাংক। তবে দুর্বল ব্যাংককে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ায় প্রকৃত লোকসান শনাক্ত ও সমাধানের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এভাবে সুদের ব্যবধান বেঁধে দিলে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। এতে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধন পুনর্গঠনের সক্ষমতাও কমতে পারে।

বেসরকারি ঋণ ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুলাই নীতি সুদ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। ছয় বছরের মধ্যে এটিই প্রথম নীতি সুদ হ্রাস।

তবে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।

গত ২৯ জুন ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা অর্থায়ন ছাড়া অন্য ঋণে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এভাবে সুদের ব্যবধান বেঁধে দিলে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। এতে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধন পুনর্গঠনের সক্ষমতাও কমতে পারে।

প্রবাসী আয়ে স্বস্তি, রপ্তানি ও বিনিয়োগে দুর্বলতা

২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে আমদানি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারেও বাংলাদেশের চাপ বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ১ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া থেকে দেশটির পোশাক আমদানি বেড়েছে।

নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা বাড়লেও নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।

অন্যদিকে বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতি ডলারের গড় আন্তব্যাংক দর ছিল ১২২ টাকা ১০ পয়সা। আগস্টে তা হয়েছে প্রায় ১২২ টাকা ৯০ পয়সা। টাকার মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিট ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।

রাজস্ব কম, বাড়ছে চলতি ব্যয়

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে কর-রাজস্ব প্রায় ৭ শতাংশ।

সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন ও অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে আছে। করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার কাজও কার্যকর হয়নি।

একই সময়ে সরকারের মোট ব্যয় জিডিপির ১১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। চলতি ব্যয় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও মূলধনি ব্যয় ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।

নতুন সরকারি বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে মূল বেতন ও ভাতা গড়ে প্রায় ১২০ শতাংশ এবং পেনশন প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।

সরকার বেশি ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণের সুযোগ কমতে পারে। ঋণের সুদ উঁচু থাকতে পারে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সরকারি অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যাংক থেকে

বাজেট–ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

সরকার বেশি ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণের সুযোগ কমতে পারে। ঋণের সুদ উঁচু থাকতে পারে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সরকারি ঋণও জিডিপির ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। সুদ পরিশোধের ব্যয় পৌঁছেছে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশে।

আগামী দুই বছরও প্রবৃদ্ধি দুর্বল

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। এটি গত ১০ বছরের গড় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।

আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। তবে এই কর্মসংস্থান দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে না।

জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। পরের অর্থবছরে তা সামান্য কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।

একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ১ শতাংশ থাকতে পারে। জ্বালানির দাম, সরবরাহের সমস্যা এবং সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি মূল্যস্ফীতিকে উঁচু পর্যায়ে রাখতে পারে।

সংস্কারের তিন অগ্রাধিকার

ব্যাংক খাতে সম্পদের মান পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে, তা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ব্যাংকের মালিক, বিনিয়োগকারী ও অন্য অংশীজনদের লোকসানের দায় বহন এবং নিয়ন্ত্রক ছাড় পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

জ্বালানি খাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়ানো, বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণ ও বিদ্যুৎ কেনায় স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে।

রাজস্ব বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা, সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয় করে কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অকার্যকর করছাড় পর্যায়ক্রমে কমানোর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD