জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া প্রকৃত যোদ্ধাদের তালিকা নতুন করে যাচাই-বাছাই করে প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আহত বা নিহত না হলেও গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া অনেকেই তালিকাভুক্তির আবেদন করার সুযোগ পাননি। তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় তালিকা চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। একই সঙ্গে অযোগ্য কেউ যাতে তালিকাভুক্ত হতে না পারেন এবং কোনো প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের সদস্য যাতে বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে জুলাইযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ, শহীদ ও আহতদের তালিকা প্রণয়নের নীতিমালা, আইন সংশোধন, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন ও আবাসনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত বা নিহত না হলেও অংশ নেওয়া অনেক প্রকৃত যোদ্ধা তালিকাভুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় পুনরায় আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অযোগ্য কাউকে গেজেটভুক্ত না করা এবং কোনো প্রকৃত যোদ্ধাকে বাদ না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ‘জুলাইযোদ্ধা’র সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে।
বৈঠকে কমিটির সভাপতি মো. মনিরুল হক চৌধুরী প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের পক্ষ থেকেও সঠিক তালিকা প্রণয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আহত বা নিহত না হলেও যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের অনেকেই তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করার সুযোগ বা তথ্য পাননি।
নতুন করে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সভাপতি বলেন, ‘কীভাবে সঠিক ও নির্ভুলভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিতে হবে। বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে জুলাইযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।’ তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের সঠিক ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং তালিকা প্রণয়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
গণঅভ্যুত্থানে আহতদের দেশে ও বিদেশে চিকিৎসাসেবা দেওয়াসহ শহীদ পরিবারের পুনর্বাসনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে সরকার। বিদেশে ১৫৪ জন যোদ্ধার চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদান ও সঞ্চয়পত্রসহ মোট ১,০৪৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্ল্যাট নির্মাণ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে দুটি পৃথক বড় প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও কমিটির সদস্য আহমেদ আযম খান বলেন, ‘জুলাইযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা আবেদন ও তালিকাভুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেই অবগত ছিলেন না। দেশব্যাপী ব্যাপক অনুরোধ আসায় মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে পুনরায় আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও তালিকাভুক্তির কার্যক্রম উন্মুক্ত করেছে।’
তিনি কমিটির সভাপতি ও অন্য সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের শনাক্ত করতে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে, যাতে কোনো অযোগ্য ব্যক্তি তালিকাভুক্ত হতে না পারেন। অতীতে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তিতে সংঘটিত অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। শুধু প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করা হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের জানান, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নতুন আবেদন গ্রহণ বন্ধের নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮৪৩টি শহীদ পরিবার ও ১৪ হাজার ৩৬৮ জন জুলাইযোদ্ধার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের আর্থিক সহায়তা ও মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আহত জুলাইযোদ্ধাদের দেশে-বিদেশে চিকিৎসা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও আবাসন কার্যক্রমও চলছে।
বৈঠকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিল এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্যভান্ডার নিয়মিতকরণের চ্যালেঞ্জগুলো আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান— দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে স্বতন্ত্র আলোচনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার স্বার্থে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮’ সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে এবং অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন নিশ্চিতে ৭,৭০০ কোটি টাকার একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের সহায়তা এবং পুনর্বাসনের জন্য ২৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।
জুলাইযোদ্ধা কারা, সংজ্ঞা নির্ধারণের দাবি
বৈঠকে কমিটির সদস্য মো. আবদুল হান্নান বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা এবং জুলাইযোদ্ধা কারা এবং তাদের তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে, তা সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। অতীতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মো. আবদুল হান্নান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী প্রকৃত ব্যক্তিদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হলে ‘জুলাইযোদ্ধা’র একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি শহীদ ও আহতদের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রকৃত ব্যক্তি বা পরিবার যেন বাদ না পড়ে, সে বিষয়েও যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে হবে।
কমিটির সদস্য রোকেয়া বেগম, যিনি একজন জুলাই শহিদের মা; জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত বিচার কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি গেজেটভুক্ত শহীদদের পাশাপাশি আরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শহীদের তথ্য যাচাই ও তালিকাভুক্তির বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের বর্তমান অবস্থা ও যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কেও জানতে চান তিনি। পাশাপাশি জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং অভিজ্ঞ গবেষক, কিউরেশন টিম ও স্মারক সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। সরকারি কর্মসূচিতে শহীদ পরিবার, আহত জুলাইযোদ্ধা ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
জবাবে মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়, এটি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। ফলে বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচ্যসূচিতে আসবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় ৩৮৭ কোটি টাকা
বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ১৫৪ জন যোদ্ধাকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও তুরস্কে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত ৩৮৭ কোটি ২২ লাখ ১১ হাজার ৯৩৩ টাকা ব্যয় হয়েছে।
এছাড়া, আহত জুলাইযোদ্ধাদের বিদেশে চিকিৎসা, শহীদ পরিবারের সঞ্চয়পত্র, জুলাইযোদ্ধাদের এককালীন অনুদান এবং শহীদ ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা বাবদ মোট ১ হাজার ৪৫ কোটি ৮২ লাখ ২০ হাজার ৩১২ টাকা ব্যয় হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের আবাসন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় শহীদ পরিবারের জন্য ৮০৪টি এবং জুলাইযোদ্ধাদের জন্য ১ হাজার ৫৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া, দৃষ্টিশক্তি হারানো ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাইযোদ্ধাদের দেশে ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের পিতামাতার জন্য বাসগৃহ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে আলোচনা
বৈঠকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) কার্যক্রম, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তি এবং অমুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিলের বিষয়েও আলোচনা হয়।
জামুকার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. ইমরান আহমেদ জানান, ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংস্থাটির ১০৩টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকাভুক্তকরণ, গেজেট নিয়মিতকরণ এবং অমুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক আবেদন, আপিল ও মামলা নিষ্পত্তির কাজ এখনও চলমান।
তিনি জানান, দীর্ঘ সময় পর দাখিল করা দলিলের সত্যতা যাচাই, ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা সাক্ষ্য, বিপুলসংখ্যক মামলা, স্বল্প জনবল, পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজের অভাব এবং আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ জনবলের সংকট জামুকার কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সুনির্দিষ্ট করতে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন, পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ তৈরি, সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বৈঠকে কমিটির সদস্য মো. ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে যথাযথ সম্মান ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ-কে উপহাস বা হালকাভাবে দেখার কোনো বিষয় নয়। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন আলোচনা পরিহার করা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান দুটি পৃথক ঐতিহাসিক ঘটনা। তাই উভয় বিষয় স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা উচিত। ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারের সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন ও যাচাই-বাছাইয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। ২০০৮ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে, ধরে নিতে হবে সেটিই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা।
মো. ফজলুর রহমান বলেন, বিগত সরকারের সময়ে ২০০৯ সাল থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত কারা কীভাবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্ত হয়েছেন, সেসব নথিপত্র দেখলেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার অবস্থা বোঝা যাবে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আইন সংশোধন
বৈঠকে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পত্তি ও শিল্পকারখানার ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়। ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সালাউদ্দিন আহাম্মদ জানান, ট্রাস্টের অধীন ৩৪টি সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সম্মানী ভাতা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষাবৃত্তি ও আর্থিক অনুদানের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনুমোদিত ১৪২টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ৯২ জন কর্মরত থাকায় জনবলসংকট রয়েছে। কয়েকটি সম্পত্তি-সংক্রান্ত মামলাও ট্রাস্টের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮ সংশোধনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সংশোধন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে আরও এক বা একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে আইনটি সংশোধন করা জরুরি বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে সভাপতি বর্তমান অগ্রগতি জানতে চান এবং আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট বিষয় ও অগ্রগতি পরবর্তী সভায় কমিটিকে অবহিত করার নির্দেশনা দেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় নিয়েও আলোচনা হয়। মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও রাষ্ট্র ও সরকারের বাইরে নয়। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শন করা হয়েছে। পরে জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে মন্ত্রণালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়। জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব রাখার বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জবাব না পাওয়ায় সচিবকে তাগিদপত্র দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব
বৈঠকে জানানো হয়, অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাসস্থান নির্মাণে ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি প্রকল্প এবং জুলাই শহীদ পরিবার, স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতাহীন ও গুরুতর আহত জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ২৫০ কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ের আরেকটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প দুটির প্রস্তাবিত মেয়াদ যথাক্রমে অক্টোবর ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত।
এছাড়া, মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের কৌশল নির্ধারণে গত ১২ আগস্ট বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। ওই মতবিনিময়ে প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে জামুকার বিদ্যমান বিধিবিধানসহ প্রযোজ্য নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট ৪ হাজার ২৩৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রিট মামলা ৩ হাজার ৩৩টি, আপিল মামলা ৩৬টি, রিভিউ মামলা ১৪টি, কনটেম্পট মামলা ৮৩টি এবং দেওয়ানি মামলা ১৫৫টি। এসব মামলার মধ্যে বেশকিছুতে সরকারের বিপক্ষে রায় হয়েছে। সরকারের স্বার্থের অনুকূলে মামলাগুলো নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ১০ জুন অ্যাটর্নি জেনারেল ও তার অধীন আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
বিস্তারিত আলোচনা শেষে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ১০টি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেগুলো হলো—
১. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী আহত ও শহীদদের তালিকা প্রণয়নের নীতিমালা এবং সর্বশেষ তালিকার অগ্রগতি পরবর্তী সভায় উপস্থাপন।
২. জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে অগ্রগতি জানানো।
৩. প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের কাউকে বাদ না দেওয়া এবং কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত না করা।
৪. প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা, শহীদ ও আহতদের সঠিক তালিকা প্রণয়নে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই।
৫. জুলাইযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন, আবাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন।
৬. বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮ সংশোধনের অগ্রগতি পরবর্তী সভায় উপস্থাপন।
৭. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা।
৮. মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণে তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা এবং যথাযথ যাচাই নিশ্চিত করা।
৯. পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সংস্থাভিত্তিক পৃথক আলোচনা করা।
১০. জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সমন্বিতভাবে কাজ করা।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে সভাপতি মো. মনিরুল হক চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন ও পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো বিরোধের বিষয় নয়; বরং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আমাদের সকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’ ঢাকা পোস্ট