মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৫ অপরাহ্ন




১৪ বছরেও চালু হয়নি, এবার ভাঙা হবে বিআরটি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:০৬ pm
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপি উন্নয়ন প্রকল্প Development Project উন্নয়ন Annual Development Plan adp রোড সড়ক মহাসড়ক যানজট রাস্তা বাস গাড়ি সড়ক road bus gridlock Study in India comp
file pic

১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চালিয়েও চালু করা যায়নি দেশের প্রথম বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) সড়ক। এই সময়ে ব্যয়ের অঙ্কও কম নয়; ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি সড়ক প্রকল্পটির নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে এটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

একইসঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি’ বিলুপ্ত করে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা। তারা বলছেন এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কারও কারও বিশেষ স্বার্থ রয়েছে।

গত রোববার (১৮ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলির সই করা চিঠিতে পরবর্তী করণীয় জানানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বিআরটি করিডোরের স্টেশন, লেন বিভাজকসহ অন্যান্য অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে উভয় দিকে তিন লেন করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের ওভারপাসকে চার লেনে উন্নীত করার কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে।

দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ চললেও যাত্রী পরিবহনে বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আইনি জটিলতা নিরসন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে এসব অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চারটি বিকল্প বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এগুলো হলো— প্রকল্পের কাজ শেষ করা, ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস রুট চালু করা, সড়কটিকে এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা এবং বিআরটির অবকাঠামো অপসারণ করে সাধারণ মহাসড়ক করা। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ বিকল্পটি বেছে নিয়েছে সরকার।

তবে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসন করতে হবে। এ প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা (প্রজেক্ট ক্লোজার) করার কথা বলা হয়েছে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

১৪ বছরেও চালু হয়নি বাসসেবা

১২ বছর নির্মাণ সময়সীমা নির্ধারণ করে ২০১২ সালে শুরু হওয়া গাজীপুর-ঢাকা বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও চালু হয়নি বিআরটি বাসসেবা। ওই সময় প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজের ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছিল। এতে ব্যয় হয় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এরপর আর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ব্যস্ত এই অংশে বিআরটির জন্য নির্মিত নির্দিষ্ট লেন বর্তমানে সব ধরনের যানবাহনের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুতগতির বিশেষ বাসসেবা চালু, যা বাস্তবায়িত হয়নি। এ রুটে চলাচলের জন্য দুই দফা বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।

দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ চললেও যাত্রী পরিবহনে বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আইনি জটিলতা নিরসন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে এসব অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া বলেন, প্রকল্পের প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া উদ্বেগের বিষয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন বা পরিচালনায় কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত কিংবা পরিচালনাগত কোনো সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। পরিচালনাপদ্ধতিতে সমস্যা থাকলে তা পরিবর্তন করতে হবে। যান চলাচল ব্যবস্থাপনায় জটিলতা থাকলে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে তা নিরসন করা।

তিনি বলেন, ঢাকার মেট্রোরেল পরিচালনায় সরকার বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে প্রস্তুত থাকলেও গাজীপুরের বিআরটি চালুর ক্ষেত্রে অনীহা কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনীহার পেছনে কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহন ও অকার্যকর বাস ব্যবসার স্বার্থ রক্ষাকারীরা এর বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছেন কি না, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে জানান, সরকার বিআরটি প্রকল্প বাতিল, সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিলুপ্ত এবং পুরো অবকাঠামোকে ৩+৩ লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার মতে, ১৮ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি নিয়ে সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি বেছে নেওয়া হয়েছে। বৈঠক-পরবর্তী নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিদ্ধান্তটি না জানানোয় সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের একাংশের কিছু গোপন করার চেষ্টা নিয়ে জল্পনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত রয়েছে বলেও মনে করে বিআইপি।

বিবৃতিতে বিআইপি এ সিদ্ধান্তের দ্ব্যর্থহীন প্রতিবাদ জানিয়ে একে টেকসই, জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহনের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থাটির দাবি, এ সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী ও দেশ-বিদেশের নির্মাণ খাতের লবির স্বার্থের পক্ষে গেছে। একইসঙ্গে এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান (জিটিএমপি) এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) প্রস্তাবনার পরিপন্থি। গত ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজের কারণে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা এবং যাতায়াতের চাহিদার প্রতিও সিদ্ধান্তটি সুবিচার করেনি বলে মনে করে সংস্থাটি।

এ অবস্থায় বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, বিআরটি ও এমআরটি পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য সমন্বিত সংস্থা গঠন এবং ঢাকা শহরসহ দেশের অন্যান্য মহানগরের জন্য বিআরটির বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে বিআইপি। পাশাপাশি পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্পভিত্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে পরিকল্পনাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ এবং বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয়সাশ্রয়ী প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। নারী, স্বল্প দূরত্বের যাত্রী, শারীরিক প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও সীমিত সামর্থ্যের মানুষসহ অধিকসংখ্যক যাত্রীকে সেবা দিতে সক্ষম পরিবহন প্রকল্প গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের পরিবহন পরিকল্পনায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) নেতৃত্বদানকারী সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করার আহ্বান জানিয়েছে বিআইপি।

এ বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হককে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ঢাকা পোস্ট




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD