মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১২ পূর্বাহ্ন




বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ’র বার্ষিক সভা শুরু

জ্বালানি খাতে সহায়তা চায় বাংলাদেশ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:০২ am
imf আইএমএফ International Monetary Fund আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল
file pic

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চসুদ এবং ঋণের বোঝা-সব মিলিয়ে নতুন অনিশ্চয়তায় পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। সবকিছু মিলে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানে পরিবর্তনের শঙ্কা। এমন বাস্তবতায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো, বিনিয়োগ বাড়ানো ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কৌশল নির্ধারণে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা।

সোমবার শুরু হওয়া এ সম্মেলন চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। বিশ্বের ১৯১টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব এবং আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১৫ হাজারেরও বেশি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি সভায় অংশ নিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি, বাণিজ্য উত্তেজনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবিলায় কার্যকর নীতি প্রণয়নই এই বার্ষিক সভার মূল লক্ষ্য।

এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত রূপাান্তর ও কাঠামোগত সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেছে ঢাকা। বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ।

ব্যাংককে শুরু হওয়া বার্ষিক সভার শুরুতে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়েও কাজ এগোচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় সামলাতে বাংলাদেশের আর্থিক সুরক্ষা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, সহযোগিতা শুধু বিদ্যমান তহবিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায়ও কাজে লাগাতে হবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে নিজেদের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরবে। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, কর আদায় বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিল্পায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো, কর অব্যাহতি ও অনিয়ম কমানো এবং রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ। সংস্কারের দায়িত্ব ও মালিকানা সরকারের হাতে থাকলে তা বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার সুযোগ বাড়বে। এছাড়া বন্ধ কলকারখানা চালু, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপদেষ্টা।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহণব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। তেল ও ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহণ, শিল্প উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে। একই সঙ্গে সারের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ক্ষেত্রে এতে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট জ্বালানি ও মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সংকটকালীন সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিভিন্ন উৎস মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানান তিনি। তবে এটি বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত কোনো অর্থ নয়; সম্ভাব্য বৈশ্বিক সহায়তার পরিসর। এছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালে এসব দেশের বৈদেশিক ঋণদাতাদের প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সুদ বাবদ। ফলে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে।

৪৫০-৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা : সাইডলাইন বৈঠকে আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি নতুন ঋণ সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে বিস্তারিত ও চূড়ান্ত পর্যায়ের দরকষাকষি করছে বাংলাদেশ। ইতোপূর্বে বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঋণ প্রস্তাব আইএমএফ দপ্তরে পাঠানো হয়। ঢাকা ও আইএমএফের মধ্যকার চলমান আলোচনায় আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হলে আগামী ডিসেম্বরেই দ্বিপক্ষীয় ঋণ চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে। নতুন এই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারকে প্রধান শর্ত হিসাবে সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার ও রাজস্বনীতি পৃথকীকরণ, ব্যাংকিং খাতের তদারকি বৃদ্ধি ও খেলাপি ঋণ হ্রাস, করছাড় প্রক্রিয়া যৌক্তিককরণ এবং বিভিন্ন জরুরি খাতে প্রদেয় সরকারি ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে নীতিগত সম্মতি প্রকাশ করেছে।

এআইয়ের প্রভাবে বদলাবে শ্রমবাজার : বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় আলোচ্য বিষয় এআইয়ের দ্রুত বিস্তার। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সোমবার ব্যাংককে বলেছেন, এআইয়ের কারণে বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরির কাজের ধরন বদলে যেতে পারে, কাজের মান কমতে পারে অথবা কিছু পদ বিলুপ্ত হতে পারে। উন্নত অর্থনীতিতে এর প্রভাব ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এসব চাকরির সবই বিলুপ্ত হবে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশ ধরে রাখতে সহায়তা করছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি শ্রমবাজার, শিক্ষা ও করব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নজর : উন্নয়ন অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোও সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য। অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় অর্থায়নের জন্য সরকারি সম্পদের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজি কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন রাশেদ আল তিতুমীর। থাইল্যান্ডের সঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফল সংরক্ষণ, হালাল খাদ্যপণ্য এবং চট্টগ্রাম ও রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD