প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তিনি বলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে তিনি কোনো ভুল করেননি। তবে তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে সরকারের কার্যক্রম যেন ম্লান না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি মন্ত্রিসভা থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আমি ইশরাক হোসেন, ঢাকা-৬ আসন থেকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য। গত ১২ তারিখ শপথ নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে আসছি।’
তিনি বলেন, গত দুই দিন ধরে একটি বিষয় নিয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ তুলে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। সেখানে তাঁকে বলেছি, আমি পদত্যাগ করতে চাই। আমার মাদকবিরোধী অভিযান চলমান থাকবে। আমার কারণে যেন সরকারের কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের দিন থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আমি তাঁকে বলেছি, পুরো সময় ঢাকা-৬ আসন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায়, পরবর্তী সময়ে আরও কোনো এলাকা যুক্ত হলে সেখানেও মাদক নির্মূল এবং জাতীয় জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি সদয় সম্মতি দিয়েছেন।’
পদত্যাগের নির্দেশের খবর নিয়ে বিতর্ক
এর আগে গত রোববার রাতে কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ওই খবরের পরিপ্রেক্ষিতে ইশরাক হোসেন জানিয়েছিলেন, তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরটি গুজব।
এরপর সোমবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার কথা জানান তিনি। পরে দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলন কক্ষে নেতাকর্মীদের ভিড়
এদিকে ইশরাক হোসেনের সংবাদ সম্মেলন চলাকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় থেকে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সেখানে প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী প্রবেশ করেন।
বিষয়টি নজরে আসার পর ইশরাক হোসেন মাইকে নেতাকর্মীদের সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাইরে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে অনেক নেতাকর্মী কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাইরে গিয়ে অবস্থান নেন।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন পুনর্ব্যক্ত করেন, মাদক নির্মূলসহ ঢাকা-৬ আসন ও আশপাশের এলাকার জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তিনি কাজ চালিয়ে যেতে চান। প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর এই কাজের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে বলে জানান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইশরাক হোসেন। সোমবার দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন বলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাসে তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।
আজ সকালে দেওয়া ওই পোস্টে ইশরাক লিখেছেন, ‘আজ দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হব, ইনশাআল্লাহ।’
আক্ষেপ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী লেখেন, ‘ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তারা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন।’
পদত্যাগ করলেও মাদকের বিরুদ্ধে থাকার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি, ‘এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে। দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করতে পারব। মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল!মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!’
এর আগে, রোববার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যদিও বিষয়টি নিয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে পরে বিষয়টিকে ‘গুজব’ বলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) নিজ সংসদীয় আসনের (ঢাকা-৬) আওতাধীন গেন্ডারিয়া থানার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের রেললাইনসংলগ্ন একটি বস্তিতে মাদকের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহে ৬ জনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ওই অভিযানে তার অস্ত্র প্রদর্শনের একটি ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যেই রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন— এমন খবর প্রচার করে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম। পরে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘শত শত ফোন আসছে, গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
(যুগান্তর)