বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৯:৫৭ অপরাহ্ন




রিজার্ভ চুরি

ছয় দেশের ৭০ জন চিহ্নিত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আতিউরসহ ১০ কর্মকর্তা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬ ৫:০৫ pm
ঋণ চুরি টাকা পাচার Per capita income মাথাপিছু আয় Reserves Reserve রিজার্ভ remittance রেমিট্যান্স প্রবাসী আয় ডলার dollar Pagla Mosque পাগলা মসজিদ কোটি টাকা Pagla Mosque পাগলা মসজিদ কোটি টাকা taka taka money laundering illegal process money generated criminal drug trafficking terrorist funding illegally concealing illicit drug trafficking corruption embezzlement gambling converting legitimate source crime jurisdictions আমদানি ওভার ইনভয়েসিং রপ্তানি আন্ডার-ইনভয়েসিং আমদানি-রপ্তানি অবৈধ জাল অর্থ পাচার জিএফআই মানি লন্ডারিং আর্থিক খাত গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিএফআইইউ হুন্ডি অর্থ পাচার taka টাকা
file pic

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ছয় দেশের অন্তত ৭০ জনের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ কমপক্ষে ১০ জন কর্মকর্তা আছেন। বাকিরা বিদেশি নাগরিক।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় এ অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশিদের চিহ্নিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তারা বাংলাদেশেও একটি ছায়া তদন্ত করেছিল। সম্প্রতি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টের (এমএলএআর) মাধ্যমে দেশটি ৪০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি বলেছে, এ প্রতিবেদন তাদের তদন্তকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাধা দূর করতে সহায়তা করেছে। দেশের বাইরে সংঘটিত ঘটনা পরম্পরাকে বিচারযোগ্য করে তুলতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরি হলেও তা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ফেডারেল রিজার্ভ থেকে, যেখানে এই অর্থ সংরক্ষিত ছিল। এর আগে জাপান ও ফিলিপাইন এমএলএআরের মাধ্যমে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশকে দেয়।

সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় সিআইডি যাদের চিহ্নিত করেছে তাদের মধ্য ৪০ জন ফিলিপাইনের নাগরিক। বিদেশিদের মধ্যে বাকিরা উত্তর কোরিয়া, ফিলিপাইন, চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের নাগরিক। সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং, আইসিটি ও ফৌজদারি আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হবে। গভর্নর আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অন্তত দুটি অভিযোগ আনা হতে পারে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

সিআইডি কবে নাগাদ এ মামলায় অভিযোগপত্র দেবে, নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইতোমধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় পিছিয়েছে ৯৩ বার। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এ ঘটনায় মার্কিন আদালতে থাকা মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত ঢাকার মামলায় অভিযোগপত্র না দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়
সিআইডি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তত ৩০ নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এর মধ্যে তিন ধরনের কাজে যুক্ত ছিলেন; ড. আতিউরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন এমন ১০ কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

এক. রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) কেন সরাসরি সুইফ্ট সিস্টেমে সংযুক্ত করা হয়েছিল। কেন ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যারা এর দায়িত্বে ছিলেন সিআইডি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনবে।

দুই. বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের জন্য ব্যবহৃত সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (এসডব্লিউআইএফটি) সার্ভার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সিস্টেম। তারপরও তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান ওই সার্ভারের সঙ্গে আরটিজিএস সিস্টেম সংযুক্ত করার অনুমোদন কেন দিয়েছিলেন? এ সিদ্ধান্তকে অপরাধমূলক বলে চিহ্নিত করেছে সিআইডি। রিজার্ভ হ্যাক হওয়ার পর তা কিছু দিন গোপন করে রাখেন তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান।

তিন. ইমেইলের মাধ্যমে হ্যাকাররা মেলওয়্যার পাঠানোর পর তা যাচাই না করে যারা ডাউনলোড করেছিলেন তারাও অভিযুক্তের মধ্যে থাকছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিষয়টি জানাজানি হলে প্রযুক্তিগত কিছু ক্লু সরিয়ে ফেলেন।

এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে সিআইডি। অভিযুক্ত কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং, আইটি অপারেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগ, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ এবং ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিংস রুমের বলে জানা গেছে।

মার্কিন প্রতিবেদনে যা আছে
অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জড়িতরা কীভাবে কার সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে চারটি ক্যাসিনোর নাম বলা হয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে পুরো অর্থ নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা সরিয়ে নেয়। ক্যাসিনোগুলো হলো– ফিলরেম, ইস্টার্ন হওয়াই, মিডাস ও সোলাইয়ার। ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট হয়ে এ অর্থ এই ক্যাসিনোগুলোতে যায়।

মার্কিন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সাইবার গ্রুপ লেজারাস (এপিটি৩৮)। এই হ্যাকার গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন উত্তর কোরিয়ার নাগরিক পার্ক জিন ইউক।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, অপরাধের ক্ষেত্রে অনেক সময় এক দেশের গোয়েন্দা সংস্থা আরেক দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করে। তবে এমএলএআরে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য না এলে তা আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না। কয়েক বছরের অপেক্ষার পর বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রতিবেদনটি পেল। এই প্রতিবেদন বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এখন তদন্ত-দলিলের অংশ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করতে পারবে।

মামলার তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদনের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করেছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে এ প্রতিবেদনের কিছু ‘টেকনিক্যাল টার্ম’-এর ব্যাখ্যা বুঝতে বাইরের বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে জানতে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, ‘মামলাটির তদন্ত একেবারে শেষ পর্যায়ে।

অভিযোগপত্র দাখিলের মতো অবস্থায় আমরা রয়েছি। কারা কীভাবে জড়িত; বের করা গেছে। যেসব তথ্য-উপাত্ত চেয়ে দেশের বাইরে চিঠি পাঠানো হয়েছে, সেগুলো আমরা পেয়েছি।’

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৮১০ কোটি টাকা (তখনকার হিসাবে) চুরি হয়। সুইফ্ট পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে জানতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও হংকংয়ে এমএলএআর পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও হংকং এখনও সাড়া দেয়নি।

২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের আদালতে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) ও কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্রক্রিয়ায় ফিলিপাইন থেকে ১৪.৬৬ মিলিয়ন ডলার ফেরত এসেছে। আর শ্রীলঙ্কা থেকে এসেছে ২০ মিলিয়ন ডলার। বাকি অর্থ এখনও ফেরত আসেনি।

তবে ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। গত বছরের জানুয়ারিতে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নিতে চায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারা এর জন্য সিআইডিকে চিঠি দেয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তভার হস্তান্তরে রাজি হয়নি।

পর্যালোচনা কমিটি যা বলছে
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মার্চে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে একাধিক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর, তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন পরিচালক, রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ কমিটিতে ছিলেন। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সর্বশেষ ২৯ জানুয়ারি কমিটির বৈঠক হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা তদন্তকাজের অগ্রগতি এবং এ-সংক্রান্ত গৃহীত সরকারি অন্যান্য পদক্ষেপ পর্যালোচনা, এ ঘটনার দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে বলা হয়েছিল কমিটিকে। রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলার রায়ের পর সিআইডির অভিযোগপত্র দেওয়ার পক্ষে মত দেয় কমিটি।

পর্যালোচনা কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালনকারী অর্থ মস্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেদন মন্ত্রিসভায় জমা দেওয়া হয়েছে।’ প্রতিবেদনের ব্যাপারে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD