মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০২:০২ অপরাহ্ন




প্রিপেইড মিটার রিচার্জ নিয়ে দুর্ভোগে ৫৫ লাখ গ্রাহক

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬ ১২:৩০ pm
DESCO Smart prepaid Meter স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্মার্ট মিটার-বিদ্যুৎ লোডশেডিং বিদ্যুৎ loadshedding energy crisis electricity power grid বিদ্যুত বিভ্রাট লোডশেডিং মেগাওয়াট বিদ্যুত power power বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ লোডশেডিং বিদ্যুৎ loadshedding energy crisis electricity power grid বিদ্যুত বিভ্রাট লোডশেডিং মেগাওয়াট বিদ্যুত power power
file pic

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ করা নিয়ে গ্রাহকরা ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েছেন। সবচেয়ে বড় জটিলতা দেখা দিয়েছে রিচার্জ করার সময় পাওয়া টোকেনের লম্বা সংখ্যা নিয়ে। মিটারে টাকা রিচার্জ করার সময় ২০ ডিজিটের বদলে ২০০ থেকে ৩০০ সংখ্যার টোকেন নম্বর আসছে। এত বড় সংখ্যা প্রবেশ করাতে গিয়ে বারবার ভুল হওয়ায় মিটার লক হয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ সংযোগ। সমস্যা সমাধানের জন্য ছুটতে হচ্ছে বিদ্যুৎ অফিসে। অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কোথাও কোথাও পুরো দিন বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

এর পাশাপাশি রিচার্জের পর আগের ব্যালান্স যোগ না হওয়া, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়া এবং সার্ভার জটিলতার অভিযোগও করছেন গ্রাহকরা।

বর্তমানে দেশে প্রায় পাঁচ কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এর মধ্যে প্রিপেইড মিটারের গ্রাহক প্রায় ৫৫ লাখ।

সারাদেশে ভোগান্তি
শহর থেকে গ্রামের প্রিপেইড মিটারের বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলেছেন জেলা প্রতিনিধিরা। তাদের কাছে প্রিপেইড মিটার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেছেন গ্রাহকরা।

লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, ডিজিটাল মিটার মানুষের সুবিধার জন্য চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এখন অসুবিধাই বেশি হচ্ছে। বিদ্যুতের বিল বাড়ছে, আবার মিটার চার্জও দিতে হচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে ২০০টির বেশি ডিজিট মিটারে চাপতে হয়। একবার ভুল হলে আবার শুরু থেকে দিতে হয়। অনেক সময় ভুল করতে করতে মিটার লক হয়ে যায়। তখন পুরোদিন বিদ্যুৎ ছাড়া থাকতে হয়।

একই শহরের ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেন জানান, মিটারে টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিকাশের মাধ্যমে রিচার্জ করতে গিয়ে সার্ভার সমস্যার মুখে পড়েন। পরে একটি বিকাশ এজেন্টের কাছেও একই সমস্যা হয়। শেষ পর্যন্ত পিডিবির গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে গিয়ে তিন ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে রিচার্জ করতে হয়েছে। এ সময় তার দোকানে বিদ্যুৎ ছিল না। ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
সিলেট নগরীর মিরের ময়দান, আড়পাড়া ও উপশহর এলাকার একাধিক গ্রাহক জানান, বিপুলসংখ্যক টোকেন নম্বর দেখে তারা প্রথমে হতবাক হয়ে যান। বারবার নম্বর চাপতে গিয়ে ভুল হচ্ছিল। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের পরামর্শে ২০ ডিজিট করে ভাগ করে নম্বর প্রবেশ করাতে হয়েছে।

জেল রোড এলাকার ফয়সল আহমদ বলেন, দীর্ঘ নম্বর দেখে তিনি প্রথম দিন রিচার্জই করেননি। পরে বিদ্যুৎ না থাকায় চেষ্টা করতে গিয়ে ভুল করেন। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকার পর অফিসের সহায়তায় সমস্যার সমাধান হয়।

রংপুরের আলুপট্টি এলাকার বাসিন্দা দোলন দাস বলেন, আগে বিকাশে টাকা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিচার্জ হয়ে যেত। এখন টোকেন নম্বর দিতে হচ্ছে। সেই নম্বর এত বড় যে ভুল হতে হতে মিটার লক হয়ে যাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ শহরের ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন জানান, তাঁর কাছে রিচার্জ করতে আসা প্রায় সব গ্রাহকই দীর্ঘ টোকেন নিয়ে অভিযোগ করছেন।

শেরপুর শহরের কলেজশিক্ষক মলয় চাকী বলেন, আমরা শিক্ষিত মানুষ হয়েও সমস্যায় পড়ছি। বয়স্ক ও নিরক্ষর মানুষের অবস্থা আরও খারাপ।

এ ছাড়া নরসিংদী, পিরোজপুর, মুন্সীগঞ্জ, রাজশাহী, রাঙামাটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজবাড়ী ও মাগুরার গ্রাহকের কাছ থেকেও রিচার্জের এই ভোগান্তির তথ্য পাওয়া গেছে।

অতিরিক্ত চার্জ
শুধু টোকেন জটিলতা নয়, বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়া নিয়েও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। লক্ষ্মীপুরের সমসেরাবাদ এলাকার সফিকুর রহমান বলেন, ৫০০ টাকা রিচার্জ করলেও বিভিন্ন চার্জ কেটে নেওয়ার পর ব্যবহারযোগ্য ব্যালান্স থাকে মাত্র ৩৫১ টাকা ১৯ পয়সা। মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ কেটে নেওয়া হয়।
কিশোরগঞ্জের হোটেল ম্যানেজার জাফর উল্লাহ জানান, তিন হাজার টাকার রিচার্জ করার পর ডিমান্ড চার্জ বাবদ প্রায় এক হাজার ৮০০ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। এতে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
ঢাকার শ্যাওড়াপাড়ার গ্রাহক রফিকুল ইসলাম বলেন, তিন মাস ধরে রিচার্জ করার পর ব্যালান্সের এসএমএস আসছে না। ফলে কত রিচার্জ হলো, কত টাকা কাটল তা জানতে পারছি না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রাহককে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট এবং নির্ধারিত কিছু চার্জ পরিশোধ করতে হয়। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, তারা কী কারণে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা অনেক সময় পান না।

কেন আসছে শত ডিজিটের কোড
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক ট্যারিফ বা মূল্যহার পরিবর্তনের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পর বিভিন্ন স্ল্যাবের তথ্য মিটারে হালনাগাদ করতে হয়। প্রতিটি স্ল্যাবের জন্য আলাদা ২০ ডিজিটের তথ্য পাঠানো হয়। সবগুলো একত্র হয়ে ২০০ বা এর বেশি ডিজিটের টোকেনে রূপ নেয়।

পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিন বলেন, এটি সাময়িক একটি বিষয়। নতুন তথ্য একবার মিটারে হালনাগাদ হয়ে গেলে পরবর্তী রিচার্জে আবার স্বাভাবিক টোকেন পাওয়া যাবে।
ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (আইসিটি) রবিউল ইসলামও একই ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, বিদ্যুতের দাম স্ল্যাবভিত্তিক পরিবর্তন হওয়ায় প্রতিটি স্ল্যাবের তথ্য মিটারে পাঠাতে হচ্ছে। এতে সাময়িক ভোগান্তি হচ্ছে, পরে ঠিক হয়ে যাবে।

ব্যালান্সের এমএমএস না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নেটওয়ার্কের কারণে অনেক সময় এসএমএস দেরিতে আসে বা মিসিং হয়। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সমস্যার সমাধান করে দেওয়া হবে। তবে বাড়তি বিল কাটার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, সরকার নির্ধারিত হারেই বিল রাখা হয়।

নেসকোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলছেন, ট্যারিফ পরিবর্তনের পর প্রথমবারের মতো এই দীর্ঘ টোকেন ব্যবহার করতে হচ্ছে। সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এটিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলেও বিশেষজ্ঞরা প্রিপেইড মিটারের সেবা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে।

তিনি বলেন, ডিজিটাল সেবার উদ্দেশ্য যদি হয় ঝামেলা কমানো, তা হলে রিচার্জ করতে গিয়ে কেন এত ভোগান্তি পোহাতে হবে? কেন একজন বয়স্ক মানুষকে ২০০ থেকে ২৪০ ডিজিটের টোকেন প্রবেশ করাতে হবে? কেন ভুল হলেই মিটার লক হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হবে? তাঁর মতে, সমস্যাটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এর সঙ্গে জড়িত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও।

[সংশ্লিষ্ট জেলা প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন] সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD