শ্রাবণের টানা বর্ষণ ও অনেক জেলায় জলাবদ্ধতার অজুহাতে অস্থির রাজধানীর কাঁচাবাজার। সরবরাহ ঘাটতির দোহাই দিয়ে গত দুই সপ্তাহে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দু-তিনটি ছাড়া বাজারের প্রায় সব সবজির কেজি এখন ‘সেঞ্চুরি’ হাঁকিয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উস্কে দিয়েছে কাঁচামরিচের ঝাল। মান ও বাজারভেদে প্রতি কেজির দাম ঠেকেছে ৩৪০ থেকে ৪০০ টাকায়। বেড়েছে ডিমের দামও। গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁও, মগবাজার, কারওয়ান বাজার এবং আরও কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে দরদামে আগুনের আঁচ টের পাওয়া গেল।
বাজারের এমন পরিস্থিতিতে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ‘কয়েকদিনের লাগাতার টানা বৃষ্টিতে ক্ষেত ও আড়তে কাঁচামাল পচে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় সবজি তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে ঢাকায় সরবরাহ কমেছে।’ মেঘ কেটে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এবং নতুন মৌসুমি সবজি বাজারে এলে দামের এই উল্লম্ফন কেটে যাবে বলেও আশ্বাস দিচ্ছেন বিক্রেতারা। যদিও ক্রেতাদের অভিযোগ হচ্ছে, তদারকি জোরদার না করলে এভাবে এমন অজুহাতে সাধারণ মানুষের পকেট কাটতেই থাকবে অসাধু চক্র।
কোথায় কেমন দাম
গতকাল ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গোল বেগুন ছিল ১২০ থেকে ১৪০ টাকা; আর লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা। করলা, বরবটি ও কাঁকরোল ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া কচুর লতির কেজি বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। ধুন্দুল, ঝিঙ্গে, চিচিঙ্গা, পটোল ও ঢ্যাঁড়শের কেজি কিনতে ক্রেতাকে খরচ করতে হয়েছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। আকারভেদে প্রতিটি লাউয়ের দাম হাঁকা হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা।
বর্ষার বাজারে একটু স্বস্তি দিচ্ছে কেবল পেঁপে; প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় কেনা যাচ্ছে। পেঁপে ছাড়া অন্য সবজি সপ্তাহ দুয়েক আগেও ২০ থেকে ৪০ টাকা কমে কেনা গেছে। এলাকাভিত্তিক বাজারগুলোর তুলনায় কারওয়ান বাজারে এখনও কিছু কমে সবজি কিনতে পারছেন ক্রেতারা।
সবচেয়ে বেশি দাম চড়েছে কাঁচামরিচের। ২৫০ গ্রাম কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে। তবে কারওয়ান বাজার থেকে একসঙ্গে এক কেজি কিনলে খরচ হবে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সপ্তাহদুয়েক আগেও মরিচের কেজি ছিল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা।
ডিম-মুরগির বাজারে গিয়ে দেখা গেল, গত সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা বেড়ে ফার্মের সাদা রঙের প্রতি ডজন ডিম ১২০ থেকে ১৩০ এবং বাদামি রঙের ডিম ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা ও সোনালি জাতের মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মুদিপণ্যের বাজারে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ব্যবসায়ীদের বর্ষা অজুহাত
আগারগাঁও এলাকায় ভ্যানে সবজি বিক্রি করেন আরমান হোসেন। তিনি বলেন, কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে সবজি কেনেন তিনি। সেখানে পাল্লায় (৫ কেজি) ৫০-৬০ টাকা দাম বেড়েছে। ১৫-১৬ দিন ধরেই বাজার এমন চড়া। এ কারণে খুচরায় একটু বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁকে।
কাঁচামরিচের বাড়তি দাম নিয়ে কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষেতে সবজি গাছ মরে গেছে। মরিচ গাছের গোড়ায় পানি জমলে গাছ বাঁচে না। এ ছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে সবজির ট্রাক ঢাকায় আসতে পারছে না। আড়তেই সবজির সরবরাহ অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ফলে পাইকারিতে দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।’
যশোর-ঝিনাইদহ থেকে ট্রাকে করে এনে ঢাকায় পাইকারি দরে সবজি বেচেন আবদুর রহিম। গতকাল বিকেলে কারওয়ান বাজারে তিনি বলেন, ‘ট্রাকভাড়াও বেড়েছে। সেজন্য ব্যাপারীদের বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
কী কিনবেন ক্রেতা
এদিকে সবজির দাম ‘অস্বাভাবিক’ বেড়েছে বলে জানালেন ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। আগারগাঁও কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী হায়দার মঈনুল আহসান ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ‘পেঁপে ছাড়া ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নাই। আড়াইশ গ্রাম কাঁচামরিচের দাম ১০০ টাকা নিলেন দোকানদার। সরকারের তদারকি না থাকায় বৃষ্টির দোহাই দিয়ে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে।’
কারওয়ান বাজার থেকে ১২০ টাকা দরে এক কেজি বরবটি কিনেছেন রিকশাচালক হোসেন উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘মানুষ খাবে কী? সবকিছুর দামই তো বাড়তি।’ মাছ-মাংস কেনা বাদ দিয়েছেন বহু আগে জানিয়ে আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন সবজিও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।’ সমকাল