শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৮ অপরাহ্ন




গুদামে সার আছে, তবুও কৃষক পাচ্ছেন না

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০৯ pm
fertiliser Ministry of Land জমি জরিপ ভূমি মন্ত্রণালয়Urea ইউরিয়া সার Urea Fertilizer ইউরিয়া ফার্টিলাইজার সার fertiliser Urea Fertilizer ইউরিয়া ফার্টিলাইজার সার
file pic

সরকারের দাবি, গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। যা দিয়ে আগামী কয়েক মাস চাহিদা মেটানো সম্ভব। একই সঙ্গে আমদানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তারপরও প্রয়োজনের সময়ে সার পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। আবার কোথাও ডিলারের গুদামে সার না থাকার কথা বলা হলেও পরে সেই সার অন্যত্র বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠছে।

এ নিয়ে গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় ঘেরাও এবং সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন। কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়েছে, ডিলারের গুদামের দরজা ও বেড়া ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

গত ১০ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সারের দাবিতে অন্তত ১৫টি পৃথক কর্মসূচি পালন করেছেন কৃষকরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে অসন্তুষ্ট হয়ে সার উত্তোলন ও বিতরণে অসহযোগিতা করেছেন। আবার মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে, ডিলারদের একাংশের নিয়ন্ত্রণ, খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি এবং স্থানীয়ভাবে সার আটকে রাখার কারণে কৃষকের কাছে প্রয়োজনের সময় সার পৌঁছাচ্ছে না।

এক মাসে যত বিক্ষোভ
১০ আগস্ট লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে সরকার নির্ধারিত দামে পর্যাপ্ত সার না পাওয়ার অভিযোগে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করেন কয়েক হাজার কৃষক। ১২ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে সার সংকটের প্রতিবাদে রহনপুর ইউনিয়নের শত শত কৃষক উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেন এবং ইউএনওর কার্যালয় ঘেরাও করেন।

২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নে সার নিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও না পেয়ে কৃষকরা এক ডিলারের গুদামে ঢুকে সার নিয়ে যান। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ওই ডিলারের নামে ৩৪০ বস্তা সার উত্তোলন করা হয়েছিল; এর মধ্যে প্রায় ২০০ বস্তা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

৩০ আগস্ট দিনাজপুর প্রেস ক্লাবের সামনে সার নিয়ে সিন্ডিকেট দূর করা, প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ ও সংকট নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন হয়। ৩১ আগস্ট রংপুরের মিঠাপুকুরে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ, সংকটের স্থায়ী সমাধান ও হয়রানি বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন হয়। একই দিন রংপুর নগরীর খামার মোড়েও সার নিয়ে কর্মসূচি হয়।
২ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাট বাজারে সার না পাওয়ার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। ৫ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহের শৈলকুপার গাড়াগঞ্জে রাসায়নিক সার না পেয়ে গাছের গুঁড়ি ফেলে আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। পরদিন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারে প্রায় ২০০ কৃষক সার পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ডিলারের লোকজন সময়মতো না আসায় কয়েকজন কৃষক গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন।

৭ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। কুড়িগ্রামের রৌমারীর বন্দবেড় বাজারে সার নিতে ভোর থেকে অপেক্ষা করেন কৃষকরা। বিতরণে দেরি হওয়ায় গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন। ডিলারের দাবি, প্রায় ১৫০ বস্তা ইউরিয়া নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই দিন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকরা সড়ক অবরোধ করেন এবং এক পর্যায়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। ওই দিন রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজারে প্রায় ৩০০ কৃষক পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও খুচরা বাজারের কথিত সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন। লালমনিরহাটেও একই দিনে সার সরবরাহের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা।

কৃষকের হাতে নেই কেন
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১২ লাখ ২২ হাজার টন সার মজুত ছিল। এর মধ্যে ইউরিয়া চার লাখ ২৭ হাজার, ডিএপি তিন লাখ ৩২ হাজার, এমওপি এক লাখ ১৭ হাজার এবং টিএসপি তিন লাখ ৫২ হাজার টন। আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের সারের চাহিদা ও সম্ভাব্য সরবরাহের হিসাবও করেছে মন্ত্রণালয়। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার ধরনের সারের মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন। বিপরীতে সম্ভাব্য সরবরাহ ৫৩ লাখ ৭১ হাজার টন। অর্থাৎ, চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৪২ হাজার টন বেশি সার সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সময়ে ইউরিয়ার চাহিদা ১৭ লাখ ২২ হাজার টন, বিপরীতে সরবরাহের সম্ভাবনা ২০ লাখ সাত হাজার টন। ডিএপির চাহিদা ১১ লাখ ২৩ হাজার টনের বিপরীতে সরবরাহ ১৩ লাখ ৪৮ হাজার টন। এমওপির চাহিদা ছয় লাখ ৬৯ হাজার টনের বিপরীতে সরবরাহ ১০ লাখ ৮২ হাজার এবং টিএসপির চাহিদা পাঁচ লাখ ১৫ হাজার টনের বিপরীতে সরবরাহ ৯ লাখ ৩২ হাজার টন। বর্তমানে আমদানি করা প্রায় চার লাখ ৫৯ হাজার টন সার পরিবহনাধীন। আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে আমদানি ও বেসরকারি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে আরও ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার টন।
কৃষকরা বলছেন, সরকার সংকট নেই বলে জানালেও প্রয়োজনের সময় ডিলারের দোকানে সার পাওয়া যায় না।

সার বিতরণ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ডিলারদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। আগের ব্যবস্থায় একটি ইউনিয়নে একজন প্রধান ডিলারের মাধ্যমে সার বিতরণ হতো। সেই ডিলারের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা সার নিয়ে কৃষকের কাছে বিক্রি করতেন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, এই ব্যবস্থায় কোনো কোনো এলাকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ফলে একটি এলাকায় সার সরবরাহের ওপর অল্প কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।

বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলারদের মাধ্যমে সার বিতরণের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সম্পর্কিত ডিলারদের নিয়েও একটি আলাদা কাঠামো ছিল। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল।

বর্তমান সরকার সেই ব্যবস্থা পরিবর্তন করে নতুন ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ নীতিমালা করেছে। নতুন ব্যবস্থায় একটি ইউনিয়নে একাধিক ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতা রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে আগের একক নিয়ন্ত্রণ কমবে এবং কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে– এমনটাই সরকারের লক্ষ্য।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন দ্বন্দ্ব। পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ নতুন ব্যবস্থায় তাদের একচেটিয়া ব্যবসা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, নতুন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা বাজারে ঢোকার সুযোগ পাওয়ায় পুরোনোদের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে দেরি হওয়া এবং পুরোনো ডিলারদের একটি অংশের অসহযোগিতার কারণে কয়েকটি জেলায় বরাদ্দ করা সার পুরোপুরি উত্তোলন হয়নি। মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে জুলাই ও আগস্টে কয়েকটি জেলার ডিলারদের বরাদ্দের তুলনায় কম সার উত্তোলনের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে সূত্রটির দাবি।
এই বিষয়ে ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। চারজন জেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং আরও চারজনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করার কথাও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কুড়িগ্রাম অঞ্চলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সার ডিলার বলেছেন, প্রভাবশালী একটি মহল সার বিতরণ ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করছে। গুদামে সার আসার পর নির্দিষ্ট সংখ্যক বস্তা ওই মহলকে দিতে হয়। পরে তারা বেশি দামে সার বিক্রি করে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথও বলেছেন, গত বছরের তুলনায় এবার বেশি সার দেওয়া হলেও কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। তিনি জানান, নতুন বা যেসব খুচরা বিক্রেতা এখনও পুরোপুরি কার্যক্রমে আসেননি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদেরও কিছু পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে এবং অতিরিক্ত সার আনার চেষ্টা চলছে। এর পরও স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা থেকে যাচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান মনে করেন, গুদামে সার থাকা আর কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। সরকার যদি বলে মজুত আছে, তাহলে বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা কোথায়– তা চিহ্নিত করতে হবে। কারণ, সার বিতরণের প্রতিটি ধাপ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষক যদি ডিলারের গুদাম থেকে সার না পেয়ে পরে খোলাবাজারে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন, তাহলে শুধু জাতীয় মজুতের হিসাব দিয়ে সংকটের দায় এড়ানো যায় না।

২০৪ মোবাইল কোর্ট, উদ্ধার ১৭০০ বস্তা
সার নিয়ে চলমান পরিস্থিতি সামাল দিতে এরই মধ্যে অভিযান জোরদার করেছে সরকার। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনে সারাদেশে ২০৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৪ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। লুট হওয়া প্রায় এক হাজার ৭০০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। চারজনকে কারাদণ্ড এবং পাঁচজনের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৬৪ জেলায় একজন করে মনিটরিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণ ও উত্তরণের উপায় খতিয়ে দেখতে দুজন যুগ্ম সচিব ও দুজন উপসচিবের সমন্বয়ে চার সদস্যের তদারকি কমিটি করা হয়েছে। সব জেলায় কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও করা হয়েছে, যেখানে সারসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত আদান-প্রদান করা হচ্ছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, অনিয়মে অভিযুক্ত ডিলারদের তালিকা করা হচ্ছে এবং নীতিমালা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। সম্প্রতি সারের সংকট নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর পেছনে সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কিছু অসৎ ডিলারসহ একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে সরকার কৃষকদের চাহিদা নিরূপণ করে প্রতিটি জেলায় সার সরবরাহ করেছে এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যাপ্ত সার থাকবে। মজুত ও আমদানি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই; সমস্যা তৈরি করছে পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD