শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৪ অপরাহ্ন




ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ, তীব্র প্রতিক্রিয়া

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:৩৯ pm
বেকার exam jobs bd jobs bdjobs Career Circular chakrir khobor recruitment Candidate বেতন চাকরি খবর চাকুরি বাকরি চাকরিজীবী চাকুরে আবেদন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি চাকরী মৌখিক পরীক্ষা প্রার্থী ক্যারিয়ার বিজ্ঞাপন পদ জব সার্কুলার কোম্পানি চাকরি job BCS Examination Bangladesh Public Service Commission বিসিএস পরীক্ষা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন Bangladesh Public Service Commission psc বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন পিএসসি বিসিএস মৌখিক পরীক্ষা
file pic

সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষায় (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে নন-ক্যাডার পদে ১১ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব সচিব কমিটি অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি বিসিএস নবম গ্রেডের ক্যাডার পদগুলোয় নিয়োগের ক্ষেত্রেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া পদ্ধতিতে ফেরার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

চাকরির ভাইভা নম্বর বাড়ানোর এ উদ্যোগে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোয়। তারা সরকারের এ উদ্যোগকে ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশে ফের মেধার অবমূল্যায়ন, নগ্ন দলীয়করণ ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল দাবি করেন। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানান, সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ভাইভা নম্বর বাড়ানোর বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সূত্র জানায়, পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ক্যাডার পদগুলোয় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ভাইভার নম্বর ২০০ থাকায় অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি নির্লজ্জ দলীয়করণ হয়েছে। যার খেসারত এখন দেশ ও জাতিকে দিতে হচ্ছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার ওই পদ্ধতির পরিবর্তন করে ভাইভার নম্বর ১০০-তে নামিয়ে আনে। এতে প্রকৃত মেধাবী ও যোগ্যরা নিয়োগে প্রাধান্য পেয়ে আসছেন বলে মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি সরকার ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া পদ্ধতিতে ফিরতে চাইলে পিএসসি থেকে আপত্তি ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের পদত্যাগের ঘটনায় দেশব্যাপী নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়।

সচিব কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে তোলপাড়

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাগুলোর ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে (তৃতীয় শ্রেণি থেকে অধস্তন) সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ১৩ সদস্যের এ কমিটি প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা। নতুন বিধিমালায় গ্রেডভেদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে ভাইভা নম্বর।

প্রস্তাবিত বিধিমালায় ১১ থেকে ২০ গ্রেডের পদগুলোকে তিনটি স্তরে ভাগ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বর্তমানে এসব পদে ভাইভায় ১০ নম্বর থাকলেও নতুন প্রস্তাবে গ্রেডভেদে তা ২৫, ৪০ ও ৫০ নম্বর করার কথা বলা হয়েছে।

এর মধ্যে ১১ ও ১২তম গ্রেডের পদে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ছে ৪০০ শতাংশ। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ৫০ শতাংশ নম্বর প্রয়োজন হলেও নতুন বিধিমালায় তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় যথাক্রমে ৯০ ও ১০ নম্বর রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৪০ নম্বর রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় ৪০ এবং ভাইভায় ১০ নম্বর রয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় লিখিত ও মৌখিক—দুই পরীক্ষায় ২৫ নম্বর করে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে ১ থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয় পিএসসির মাধ্যমে। আর ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগ হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী। পিএসসির নিয়োগপ্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হলেও মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরগুলোর নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি পদের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর পদ প্রায় ১৩ লাখ ২৫ হাজার। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বিধিমালা কার্যকর হলে সিভিল প্রশাসনের প্রায় ৬৫ শতাংশ নিয়োগ এ পরিবর্তনের আওতায় আসবে।

নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া

ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, মৌখিক পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে বিষয়ভিত্তিক ও পরীক্ষকের মূল্যায়ননির্ভর হওয়ায় সেখানে পছন্দের প্রার্থীকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরগুলোর নিয়োগে আগে থেকেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকায় ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে এসব ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।

তাদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তিতে এখন যেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি ভবিষ্যতেও এর প্রভাব থাকতে পারে। সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়। এ সিদ্ধান্ত সুশাসনের পরিপন্থী।

ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন লাখ লাখ তরুণ রাষ্ট্রীয় চাকরির পরীক্ষায় শুধু চাকরি খুঁজছেন না; তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ন্যায্য চুক্তি খুঁজছেন। তাদের বলা হচ্ছে—পড়ো, প্রস্তুতি নাও, প্রতিযোগিতা করো। রাষ্ট্রের পাল্টা কথাটিও তাই পরিষ্কার হওয়া দরকার—‘তুমি লিখিত পরীক্ষায় তোমার মেধা প্রমাণ করো, আমরা তোমার মূল্যায়নের দরজা যতটা সম্ভব স্বচ্ছ রাখব।’

তিনি বলেন, ভাইভা থাকুক। ব্যক্তিত্ব যাচাই হোক। কিন্তু ভাইভা যেন লিখিত মেধার কবরখানা না হয়। রাষ্ট্রের চাকরি রাষ্ট্রের সম্পদ; সেটি কারো মামা-খালুর উত্তরাধিকার নয়, কোনো বোর্ডের ব্যক্তিগত রুচির পুরস্কারও নয়। বাংলাদেশের তরুণরা আসলে খুব বেশি কিছু চাইছেন না—তারা শুধু চান, তাদের ভাগ্যটা যেন পরীক্ষার খাতায় লেখা থাকে।

পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ঘিরে প্রশ্ন

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর তৎকালীন পিএসসির চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইনসহ ১২ সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব পেয়ে তিনি পিএসসিতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেন এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন। গত ১৮ আগস্ট হঠাৎ করেই তিনি পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর বিভিন্ন মহলে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর বিষয় নিয়ে কথা ওঠে। বিদায়ী চেয়ারম্যান মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো আবারও ২০০ নম্বর করতে রাজি না হওয়ায় তাকে এ পদ ছাড়তে হয়েছে বলেও গুঞ্জন ওঠে। এ বিষয়ে কথা বলতে অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার দেশ। তিনি বলেন, ‘আমি এখন আর পিএসসিতে নেই। কাজেই পিএসসির কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা সংগত নয়।’

বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় ২০০ নম্বরে ফেরত যাওয়ার মধ্যেই গত রোববার সচিব কমিটি ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সরকারি চাকরির জন্য মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ক্ষেত্রবিশেষে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ সমাবেশও হয়।

দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত দেখছে জামায়াত

ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘নির্লজ্জ দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত’ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থাকে দুর্বল করবে এবং রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করবে।

গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে গোলাম পরওয়ার সরকারি চাকরির লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের ভারসাম্য পরিবর্তন করে ভাইভার নম্বর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, অর্থের লেনদেন ও সুপারিশের সংস্কৃতি বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শতভাগ স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

উদ্বেগজনক বলছেন নাহিদ ইসলাম

সরকারি চাকরির ভাইভায় নম্বর বৃদ্ধির প্রস্তাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গত বুধবার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, যেখানে তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই নির্বাচনের আগে বলেছিলেন ভাইভার নম্বর ৫০-এ নামিয়ে আনা উচিত, সেখানে ক্ষমতায় এসে এমন বিপরীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের দ্বৈত নীতি ও সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকারকে হুঁশিয়ার করে নাহিদ বলেন, কোটা হাসিনাকে দিল্লি পাঠিয়েছে, ভাইভা আপনাদের কোথায় পাঠায় নিজেরাও টের পাবেন না। তিনি অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া হঠাৎ করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার নামে বিএনপি সরকার আরেকটি বাজে কাজ করতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। ১০ম গ্রেডের নিয়োগ পিএসসির কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজেদের কমিটি গঠন করে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন—পিএসসি কি পারছে না? পিএসসি কি কোথাও বলেছে, আমরা পারছি না। খালি চোখেই বোঝা যাচ্ছে, সরকার নিয়োগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। উদ্দেশ্য হতে পারে, পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ করা কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ করা। কিন্তু তারা কি চব্বিশ ভুলে গেছে? সরকারি চাকরির নিয়োগে বৈষম্য করার কারণেই কিন্তু এ দেশের ছাত্ররা আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল, যা থেকে কালজয়ী অভ্যুত্থান হয়েছে। ক্ষমতা আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা ভুলে গেলে সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই, তরুণরা কিন্তু জাগ্রত আছে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদসহ (ডাকসু) বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাবি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ডাকসু। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ডাকসু ভবনের সামনে নির্ভীক জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে সমাবেশে মিলিত হয়। বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা ‘ভাইভার নামে প্রহসন, চলবে না’, ‘নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্য, চলবে না’ এবং ‘মেধার ভিত্তিতে চাকরি চাই’ এমন নানা স্লোগান দেন।

ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, কথিত ভাইভা ও কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের আলোচনা মেধাভিত্তিক নিয়োগের জন্য বড় হুমকি। রাষ্ট্রের চাকরিতে নিয়োগ হবে কেবল মেধার ভিত্তিতে, কোনো ধরনের প্রভাব বা বিশেষ সুবিধার ভিত্তিতে নয়।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভাইভাকে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির হাতিয়ার বানানো হলে দেশের লাখো বেকার তরুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার দ্রুত এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসে আরো বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

একই ইস্যুতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে বের হওয়া মিছিলটি ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে আবার একই জায়গায় এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।

গত বুধবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদি চত্বর থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। দাবি আদায় না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বুধবার রাতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। রাত সাড়ে ৮টায় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সমাবেশ করা হয়। এছাড়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (নোবিপ্রবি) দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল হয়।

ভাইভা নম্বরের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর নিয়োগ পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্যই বিদ্যমান পরীক্ষার নম্বর বণ্টনে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেছেন, ‘ভাইভায় নম্বর বাড়ানার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কাউকে সুবিধা দিতে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।

বিসিএসেও ১০০ নম্বর বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। গত ২১ জুন জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষার প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে ভাইভার নম্বর ২০০-এর পরিবর্তে ১০০ বহাল রাখা হয়েছে। ৪৭তম বিসিএস থেকেই ১০০ নম্বরের এই নতুন নিয়মে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। এছাড়া বিশেষ বিসিএস হিসেবে পরিচিত ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসেও ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। ৫০তম বিসিএসসহ পরবর্তী সব বিসিএস পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা পদ্ধতি বহাল থাকবে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন, সরকারি চাকরির নতুন খসড়া বিধিমালায় ভাইভায় নতুন মার্কিং সরকারের কাছে বেটার মনে হয়েছে বলেই এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়োগের মানোন্নয়নের বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ভাইভা যেহেতু সাবজেক্টিভ, তাই সেখানে কারসাজি বা পছন্দের কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি—এ বিষয়ে দ্বিমত করছি না। তবে চাকরির জন্য শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। একজন প্রার্থীর অন্যান্য যোগ্যতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ না থাকে, সেটাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

পিএসসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মতিউর রহমান আমার দেশকে জানান, ৪৭তম বিসিএস থেকে ১০০ নম্বরের ভাইভা কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে ৫০তম বিসিএসেও একই নিয়মে ভাইভা হচ্ছে। তবে ২০০ নম্বরে ফেরার কোনো উদ্যোগের তথ্য আমার জানা নেই। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে আইনের পরিবর্তন করা লাগবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আমার দেশ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD