শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন




নারীর ড্রাইভিং: ইসলাম কি বলে?

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২১ pm
car গাড়ি রোড সড়ক মহাসড়ক যানজট রাস্তা বাস গাড়ি সড়ক road bus gridlock Study in India comp BMW X7 bmw bangladesh lead এক্সিকিটিভ মোটরস বিএমডব্লিউ এক্স সেভেন
file pic

আধুনিক নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো গতি ও যাতায়াত। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‘নারী চালক’ বা নারীদের গাড়ি চালানোর বিষয়টি বর্তমান সমাজে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও বহুল আলোচিত হয়ে উঠেছে। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে—ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের গাড়ি চালানো কি আদৌ বৈধ, নাকি নিষিদ্ধ?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ইসলাম একটি স্বভাবজাত, প্রগতিশীল ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা, যা যুগের প্রতিটি নতুন ও ইতিবাচক উদ্ভাবনকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দেয়। ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের একটি সুপরিচিত ও মৌলিক নীতি হলোÑইবাদত ছাড়া পার্থিব সব বিষয়ের মূল বিধানই হলো বৈধতা, যতক্ষণ না তা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোরআন বা সুন্নাহর কোনো সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কোথাও নারীদের বাহন চালাতে নিষেধ করা হয়নি। তাই আধুনিক যুগে গাড়ি চালানোকে শুধু যাতায়াতের একটি বৈধ মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করে ইসলাম।

ইতিহাসে দেখা যায়, যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে নারীদের স্বাধীনভাবে বাহন ব্যবহারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেই বিদ্যমান ছিল। সেই সোনালি সময়ে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল উট, ঘোড়া বা গাধা। সাহাবি নারীরা অত্যন্ত সাবলীলভাবে এসব বাহন ব্যবহার করে

নিজেদের প্রাত্যহিক কাজ সম্পন্ন করতেন। বুখারি ও মুসলিমের একটি বিখ্যাত হাদিসে রাসুল (সা.) কুরাইশ বংশীয় নারীদের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘উটের পিঠে আরোহণকারী নারীদের মধ্যে কুরাইশ নারীরাই শ্রেষ্ঠ; কারণ তারা সন্তানদের প্রতি সর্বাধিক স্নেহশীলা এবং স্বামীর সম্পদের রক্ষাকারিণী।’

হাদিসটি প্রমাণ করে, তৎকালীন আরবে নারীদের উট বা ঘোড়া চালানোর ব্যাপক প্রচলন ছিল এবং তা সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গরূপে স্বীকৃত ছিল। যুক্তির নিরিখে বিচার করলে, চৌদ্দ শ বছর আগে মরুভূমির বুকে উটের লাগাম ধরা আর বর্তমান যুগে পিচঢালা পথে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই; কারণ উভয়েরই মূল উদ্দেশ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিরাপদে যাতায়াত করা।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীদের গাড়ি চালানো শুধু কোনো শৌখিনতা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্মান ও জরুরি প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শরিয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদ’ হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং জীবনযাপনের কষ্ট লাঘব করা। ধরুন, গভীর রাতে পরিবারের কেউ হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন; তখন একজন নারী যদি নিজেই গাড়ি চালিয়ে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেন, তবে তার এই দক্ষতা একটি অমূল্য জীবন বাঁচাতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। তাছাড়া জনবহুল গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হওয়া কিংবা সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ চালকের সঙ্গে একাকী দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়ত-নিষিদ্ধ ‘খালওয়াত’ বা নির্জনবাসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর চেয়ে একজন পর্দানশিন নারীর জন্য নিজের গাড়ি নিজে চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো অনেক বেশি নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও সম্মানজনক। সুতরাং বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, নিজের গাড়ি নিজে চালানোর মাধ্যমে একজন নারী ইসলাম নির্দেশিত পর্দা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অধিকতর সুচারুরূপে রক্ষা করতে সক্ষম হন।

আমাদের সমাজে অনেক সময় আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও প্রথাকে ভুলবশত ধর্মীয় বিধান হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার ক্ষতিকর প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলেই নারীদের গাড়ি চালানো নিয়ে নানা ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের অন্যতম রক্ষণশীল মুসলিম দেশ সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর যে আইনি নিষেধাজ্ঞা ছিল, সাধারণ মানুষ সেটিকে ইসলামের বিধান বলেই মনে করতেন। অথচ তথ্য-উপাত্ত ঘাঁটলে দেখা যায়, সেটি ইসলামি শরিয়তের কোনো বিধান ছিল না; বরং তা ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মাত্র। ২০১৮ সালে দেশটিতে যখন সেই নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হলো এবং নারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া শুরু হলো, তখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি স্কলাররা এই সিদ্ধান্তকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইসলাম কখনোই নারীকে তার ন্যায্য, নিরাপদ ও যৌক্তিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না; বরং সংকীর্ণ প্রথার বেড়াজাল ভেঙে ইসলাম সর্বদাই নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকে।

ইসলামে যেকোনো অধিকার বা স্বাধীনতার সঙ্গে যেমন গভীর দায়িত্ববোধ জড়িয়ে থাকে, মনি নারীদের গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রেও কিছু শালীনতা ও নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। একজন মুসলিম নারী যখন গাড়ি চালাবেন, তখন তিনি অবশ্যই পোশাক ও চলাফেরায় ইসলাম নির্দেশিত শালীনতা বা হিজাবের বিধান বজায় রাখবেন এবং দেশের প্রচলিত ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে মেনে চলবেন। কারণ, রাষ্ট্রের আইন মেনে চলাও ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সুনাগরিকের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। ইসলামের চোখে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমাজের অবিচ্ছেদ্য চালিকাশক্তি এবং উভয়েরই নিজ নিজ পরিমণ্ডলে শালীনতা বজায় রেখে মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া একজন নারী শুধু নিজের প্রাত্যহিক জীবনকেই সহজ করছেন না; বরং তিনি একাধারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, আধুনিক ও প্রগতিশীল ইসলামি সমাজেরই উজ্জ্বল প্রতিনিধিত্ব করছেন।

লেখক : আমানুর রহমান, শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD