শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫১ অপরাহ্ন




কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে অশান্ত মোহাম্মদপুর

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫৩ am
file pic

রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে দুই বছর ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে মোহাম্মদপুর। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজির ঘটনা যেন থামানোই যাচ্ছে না। কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত বিভিন্ন চক্র এসব অপরাধের বড় অংশের সঙ্গে জড়িত। দিনে বা রাতে তাদের বেপরোয়া অস্ত্রের মহড়ায় অশান্ত হয়ে রয়েছে মোহাম্মদপুর-আদাবর। দুই বছরে এই গ্যাংগুলোর আধিপত্য বিস্তারসহ নানা বিরোধে অন্তত ৯ জনের প্রাণ গেছে। আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত।

সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরসংলগ্ন ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে ফরহাদ হোসেন নামে এক যুবককে কুপিয়ে ও গুলি ছুড়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, ফরহাদ ছিলেন মোহাম্মদপুরকেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং পাটালী গ্রুপের সদস্য। হত্যায় জড়িতরাও আরেকটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে জানা গেছে।

এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার ঘোষণা দেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। মোহাম্মদপুরের বছিলায় নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব থাকবে না। কিশোর গ্যাং বলে কোনো শব্দ থাকবে না।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় এলাকার চিত্র। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি– কোথাও দলবদ্ধ তরুণদের আড্ডা, কোথাও প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের মহড়া। আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এক গ্রুপের সঙ্গে আরেক গ্রুপের সংঘাত নিত্যদিনের ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান-গ্রেপ্তার চলছে; আবার এর সমান্তরালেই চলছে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট। এতে জনমনে আতঙ্ক কাটছে না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানেই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন মোহাম্মদপুর ছিল সবচেয়ে ভীতিকর অবস্থায়। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলালেও মোহাম্মদপুর-আদাবর-বছিলা এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখনও বেপরোয়া। এখানে অর্ধশত কিশোর গ্যাং রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে রয়েছে অ্যালেক্স ইমন, আরমান-শাহরুখ, কবজি কাটা আনোয়ার, গাঙচিল, লও ঠেলা, লাড়া দে, লাল বাহিনী, বিরিয়ানি সুমন, আকাশ গ্রুপ, দে ধাক্কা, কিলার আরমান, টুন্ডা বাবু, বোমা গ্রুপ, গিটঠা গ্রুপ, কসাই গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, সাব্বির গ্রুপ, কাইল্যা বাদল, চেতালেই ভেজাল, টক্কর লও, লেভেল হাই, আমি আলমগীর, স্টার বন্ড, ভাইব্বা ল কিং, ঘুটা দে, মাওড়া গ্রুপ, জেব্রা আকতার ও রক্তচোষা জনি গ্রুপ।

দুই বছরে ১২ হাজার গ্রেপ্তার
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, মোহাম্মদপুর-আদাবর থানা এলাকা থেকে প্রতি মাসেই গড়ে কিশোর গ্যাংয়ের ৫০০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই হিসাবে দুই বছরে প্রায় ১২ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে কেউ কেউ জামিনে অপরাধে জড়ানোয় একাধিকবার গ্রেপ্তারের ঘটনাও আছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, শুধু গ্রেপ্তার নয়; কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে পুলিশ। বিভিন্ন এলাকায় কিশোর-তরুণদের কর্মকাণ্ড সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সন্দেহজনক কিছু ঘটলে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা হয়েছে। বছিলা এলাকায় রিকশার গ্যারেজ ঘিরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আছে। তাই নিয়মিত গ্যারেজগুলোয় অভিযান চালানো হচ্ছে। বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ থেকে অটোরিকশায় চার্জ দেওয়া হয়– এমন গ্যারেজ বন্ধ এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি বছিলার বিভিন্ন গলির বাড়িগুলো থেকে তাদের পরিবারের সন্তানদের তথ্য নেওয়া হচ্ছে। যাদের ব্যাপারে সন্দেহ হচ্ছে, তাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। জেনেভা ক্যাম্প অপরাধীদের একটি বড় আস্তানা। এ জন্য ক্যাম্পের গুরুত্বপূর্ণ সাতটি প্রবেশপথে পুলিশের চেকপোস্ট রাখা হয়েছে। এর ফলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। এপ্রিল মাসে অ্যালেক্স ইমন ও লম্বু আসাদুল হত্যার পর পাঁচ মাসে আর কোনো খুন হয়নি।

দুই বছরে ৯ খুন
২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরে দেখা যায় ভয়াবহতার একটি চিত্র। সেদিন রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় অ্যালেক্স ইমন গ্রুপের হামলায় নাসির বিশ্বাস ও মুন্না হাওলাদার নিহত হন। নিহত দুজনও অপরাধে জড়িত ছিলেন বলে জানায় পুলিশ। এরপর ১ অক্টোবর রাতে নবোদয় হাউজিং এলাকায় খুন হন একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মী বিল্লাল গাজী। তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে কবজি কাটা গ্রুপ।

২০২৫ সালেও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। ১৬ জুলাই চাঁদ উদ্যানে খুন হন আল-আমিন ওরফে পাতা আল-আমিন। র‌্যাব জানায়, কিশোর গ্যাং নেতা মোশারফের ভাইকে একটি মামলায় গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করার প্রতিশোধ হিসেবে আল-আমিনকে হত্যা করা হয়। এর ১০ দিন পর ২৬ জুলাই রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে ফজলে রাব্বী সুমনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মাদক-সংক্রান্ত বিরোধে কিশোর গ্যাং পিচ্চি মুন্না গ্রুপ এ ঘটনা ঘটায়। একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর আদাবরের বালুর মাঠ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুন হন মোহাম্মদ রিপন ওরফে নিপু। বেলচা মনির গ্রুপের সদস্যরা এ ঘটনা ঘটায়। আর নিপু ছিলেন রাজু গ্রুপের সদস্য।

চলতি বছরের ১২ এপ্রিল রায়েরবাজারে দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে নিহত হন অ্যালেক্স গ্রুপের হোতা ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমন। প্রতিদ্বন্দ্বী কিশোর গ্যাং আরমান-শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা এ ঘটনা ঘটায়। এর তিন দিন পর ১৫ এপ্রিল রায়েরবাজারের সাদেক খান ইটখোলা এলাকায় চার্লি গ্রুপের সদস্যদের হাতে নিহত হন একই গ্রুপের আসাদুল ওরফে লম্বু আসাদুল। এই সহিংসতার সর্বশেষ বিস্তার দেখা গেছে ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জে। সেদিন আরশিনগর এলাকায় ফরহাদ হোসেনকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আরমান-শাহরুখ গ্রুপের নাম এসেছে। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD