ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ও অনাদায়ী ঋণ দ্রুত আদায় এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ নামে নতুন আইন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে আইনের খসড়ার ওপর অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে।
ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধ না করলে বিশেষায়িত কোম্পানি বন্ধক রাখা সম্পদ দখল করে বিক্রি করার ক্ষমতা পাবে এমন বিধান রাখা হচ্ছে আইনে।
একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ কিনে নেওয়া, পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনা, সিকিউরিটাইজেশন এবং ঋণগ্রহীতার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগও রাখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন আটকে থাকা খেলাপি ঋণ ও দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ দ্রুত উদ্ধারের লক্ষ্যেই এ আইন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আইনটি কার্যকর হলে খেলাপি ঋণ ও দীর্ঘদিন আটকে থাকা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি বিশেষায়িত কাঠামো তৈরি হবে। এর আওতায় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে খেলাপি সম্পদ কিনে নিয়ে তা পুনর্গঠন, দখল, বিক্রি, সিকিউরিটাইজেশন এবং প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ পাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান।
তবে শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করলেই দেশের খেলাপি ঋণের পুরো সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবীদরা। তাদের মতে, খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে জামানতের মূল্য প্রকৃত মূল্যের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করলেও প্রকৃত অর্থ উদ্ধারে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে।
ডিএএমইউ হবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জনা গেছে, আইনের আওতায় ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ (ডিএএমইউ) নামে পৃথক ও স্বতন্ত্র একটি সংস্থা করা হবে। সংস্থাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হলেও আইনে দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করবে। এর প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায়। প্রয়োজন হলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক কার্যালয়ও স্থাপন করা যাবে।
ডিএএমইউর প্রধান দায়িত্ব হবে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ডিএএমসি) এবং লোন সার্ভিসার কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স দেওয়া, তদারকি, পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণ করা। লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল এবং প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে সংস্থাটির।
ডিস্ট্রেসড সম্পদের নিবন্ধন, শ্রেণিবিন্যাস, অধিগ্রহণ, মূল্যায়ন ও তদারকি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ডিএএমসি ও যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয় এবং এ ধরনের সম্পদ নিয়ে কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার দায়িত্বও থাকবে ডিএএমইউর।
প্রয়োজনে ডিএএমইউ ডিএএমসি ও লোন সার্ভিসার কোম্পানির কাছ থেকে ব্যবসা, লেনদেন ও কার্যক্রমসংক্রান্ত বিবরণ, প্রতিবেদন ও তথ্য চাইতে পারবে। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর অডিট, পরিদর্শন ও তদন্তও করতে পারবে।
ডিএএমইউ একজন প্রধানের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। পদমর্যাদা ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমতুল্য বিবেচনা করা হবে। তার এককালীন সর্বোচ্চ তিন বছরের মেয়াদ থাকবে। ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স বা ডিস্ট্রেসি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে তিনি পদে বহাল থাকতে পারবেন না। খেলাপি সম্পদ উদ্ধারে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট এনফোর্সমেন্ট টাস্কফোর্স’ (ডিএইটি) গঠনের ক্ষমতাও ডিএএমইউকে দেওয়া হবে।
লাইসেন্স নিয়ে কাজ করবে বিশেষায়িত কোম্পানি
ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের জন্য কোম্পানিকে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে। ডিএএমইউ নির্ধারিত ন্যূনতম পরিমাণ পরিশোধিত মূলধন সম্পূর্ণ নগদে পরিশোধিত থাকতে হবে।
কোম্পানির পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, সম্পদ পুনরুদ্ধার বা আইনসংক্রান্ত পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাদের ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ডও পূরণ করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদে কমপক্ষে ২০ শতাংশ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন পরিচালক রাখতে হবে।
লাইসেন্স পাওয়ার পরও ডিএএমইউ প্রয়োজনে এর শর্ত পরিবর্তন, সংশোধন, স্থগিত বা বাতিল করতে পারবে। আইন, বিধিমালা বা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ, অবৈধ অর্থপাচার কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করা যাবে।
ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণ কিনবে ডিএএমসি
ডিএএমসি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মূল্য নির্ধারণের পর চুক্তির মাধ্যমে সরাসরি ডিস্ট্রেসড সম্পদ কিনে নিতে পারবে। তবে ক্রয়মূল্য সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ নগদ অর্থে পরিশোধ করতে হবে।
সম্পদ কেনার অর্থ জোগাড় করতে ডিএএমসি দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে পারবে। শেয়ার, বন্ড বা ডিবেঞ্চার ইস্যু করা যাবে। দেশি-বিদেশি যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, বিশেষ বিনিয়োগ কাঠামো বা সিকিউরিটি সার্টিফিকেট ইস্যুর মাধ্যমেও অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। অধিগ্রহণ করা সম্পদ সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমেও অর্থায়ন করা যাবে।
তবে এ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই ঋণ কিনবে। ফলে ১০ টাকার ঋণ যদি ৫ টাকায় কেনা হয়, তাহলে ওই ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত ও বাস্তব সম্পদ থাকতে হবে। কিন্তু জামানত না থাকা বা অতিমূল্যায়িত জামানত থাকলে বিদেশি বা বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এসব ঋণ কিনতে আগ্রহী নাও হতে পারেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে ঘোষিত ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ জামানতবিহীন অথবা অতিমূল্যায়িত জামানতের বিপরীতে রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জামানত চার-পাঁচ গুণ পর্যন্ত অতিমূল্যায়িত করা হয়েছে। আবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে কোনো জামানতই নেই। গত কয়েক বছরে জামানত ছাড়াই কাগজপত্রের ওপর শত শত, এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঋণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির আওতায় এনে সমাধান করা কঠিন। ফলে মোট খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ এই ব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতে পারে।
মুসলিম চৌধুরী বলেন, দেশে ঘোষিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩২ শতাংশ হলেও প্রকৃত চিত্র আরও বড় হতে পারে। পুনঃতফসিল করা ঋণকে অনেক সময় হিসাবের খাতায় ভালো দেখানো হলেও সেগুলো থেকে প্রকৃত অর্থে অর্থ ফেরত আসছে না। আদালতে মামলা ও রিট থাকা ঋণও রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি, এমনকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
ঋণ না দিলে সম্পদ দখল
খেলাপি সম্পদ পুনরুদ্ধারে ডিএএমসিকে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হবে। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনা করে বকেয়া নিষ্পত্তির পাশাপাশি বন্ধক রাখা সম্পদের দখল নেওয়া, লিজ বা বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধার এবং প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতার ব্যবসার ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব নেওয়া যাবে। এছাড়া কোনো কোম্পানির ঋণের অংশ ইকুইটি শেয়ারে রূপান্তর, তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার এবং অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
সাবেক বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মুসলিম চৌধুরীর মতে, শুধু আইনে সম্পদ দখলের ক্ষমতা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সম্পদ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
কমানো যাবে সুদ, মূলধনও
ঋণ নিষ্পত্তিতে ডিএএমসি ঋণের পরিমাণ, সুদ, মেয়াদ, কিস্তির সময়সূচি ও জামানতের শর্ত পরিবর্তন করতে পারবে। পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ঋণের মেয়াদ বাড়ানো, ঋণের একটি অংশ ইকুইটিতে রূপান্তর, সুদ কমানো বা মওকুফ এবং মূলধনের পরিমাণ কমানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সীমার বেশি মূলধন বা সুদ কমাতে ডিএএমইউর পূর্বানুমোদন লাগবে।
ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে তাকে ‘নো-ডিউস সার্টিফিকেট’ দেওয়া যাবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জামানত অবমুক্ত করার সুযোগ থাকবে। বিচারাধীন ঋণের ক্ষেত্রেও সমঝোতা আদালতে দাখিল করে ‘সম্মত ডিক্রি’ নেওয়া যাবে।
৬০ দিনের নোটিশ, তারপর বিক্রি
বন্ধক বা দায়বদ্ধ সম্পদ বিক্রির আগে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এরপর ওই বাজারমূল্যের ভিত্তিতে ডিএএমইউ নির্ধারিত পদ্ধতিতে রিজার্ভ মূল্য ঠিক হবে।
ঋণগ্রহীতাকে নোটিশ দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে পাওনা পরিশোধ অথবা নির্ধারিত রিজার্ভ মূল্য পরিশোধ করে সম্পদ ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে তা না হলে সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
কোটেশন গ্রহণ, জনসাধারণের কাছ থেকে টেন্ডার, প্রকাশ্য নিলাম অথবা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি করা যাবে। কোনো ক্ষেত্রেই নির্ধারিত রিজার্ভ মূল্যের চেয়ে কম দামে সম্পদ বিক্রি করা যাবে না। টেন্ডার বা নিলামের ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান রয়েছে। রিজার্ভ মূল্যের চেয়ে বেশি দর না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে নতুন রিজার্ভ মূল্য নির্ধারণ করে পুনরায় বিক্রি করা যাবে।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় দখল উদ্ধার
ঋণগ্রহীতা সম্পদের দখল ডিএএমসির কাছে হস্তান্তর না করলে প্রতিষ্ঠানটি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তা চাইতে পারবে। অনুরোধ পেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা মনোনীত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে সম্পদের দখল উদ্ধার করে ডিএএমসির কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন। প্রয়োজনে ডিএএমইউর কাছে এনফোর্সমেন্ট টাস্কফোর্সের সহায়তাও চাওয়া যাবে।
ট্রাস্টের সম্পদ থাকবে আলাদা
ডিএএমসি ডিস্ট্রেসি সম্পদ অধিগ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠন করতে পারবে। ট্রাস্টের সম্পদ ডিএএমসি বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পদ থেকে পৃথক থাকবে এবং তাদের পাওনাদারদের দাবির আওতার বাইরে থাকবে। অর্থাৎ সম্পদগুলো ‘ব্যাংকরাপ্সি রিমোট’ হিসেবে সুরক্ষিত থাকবে।
সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের দাবি খেলাপি ঋণ সম্পর্কিত সম্পদের ওপর প্রথম দায় বা ‘ফার্স্ট চার্জ’ এবং অগ্রাধিকারমূলক দাবি হিসেবে বিবেচিত হবে। কর, শুল্ক, ভ্যাট বা অন্যান্য সরকারি রাজস্ব দাবির ওপরও এ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে আদালতের চূড়ান্ত বাজেয়াপ্তের আদেশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
লোন সার্ভিসারদের জন্য আচরণবিধি
ডিএএমসি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাইলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত লোন সার্ভিসার কোম্পানি নিয়োগ করতে পারবে। এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও সমঝোতা, ঋণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, সম্পদ অনুসন্ধান এবং আইনি কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারবে।
তবে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ বা ব্যাংকিং ব্যবসা করতে পারবে না। জোরপূর্বক বা বেআইনি পদ্ধতিতে ঋণ আদায়ও নিষিদ্ধ থাকবে। গ্রাহক সুরক্ষা, তথ্যের গোপনীয়তা, ডেটা সুরক্ষা ও ন্যায্য ঋণ আদায় পদ্ধতি নিয়ে আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে।
খেলাপির সংশ্লিষ্টদের ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা
আইনে খেলাপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিএএমইউ, ডিএএমসি বা লোন সার্ভিসার কোম্পানির মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনায় অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়ায়ও তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিতে পারবেন না।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, যৌথ উদ্যোগ বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা, উদ্যোক্তা, প্রমোটার বা স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও কাজ করতে পারবেন না। বিধান লঙ্ঘন করে করা লেনদেন বা নিয়োগ শুরু থেকেই বাতিল বলে গণ্য হবে।
তৈরি হবে ডিস্ট্রেসি সম্পদের সেকেন্ডারি মার্কেট
ডিস্ট্রেসি সম্পদ এবং এ সংক্রান্ত সিকিউরিটি সার্টিফিকেট বা আর্থিক উপকরণ কেনাবেচার জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করে ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম ও সেকেন্ডারি মার্কেট গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রয়োজন মনে করলে ডিএএমইউ এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে পারবে।
সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড
লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে ডিএএমসি বা লোন সার্ভিসার কোম্পানিকে ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। লাইসেন্স নেওয়ার সময় মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে ২০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। অনুমোদন ছাড়া শাখা বা অফিস স্থাপন করলে ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়া বা লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর ডিস্ট্রেসি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ব্যবসা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে।
অন্যদিকে সম্পদ অধিগ্রহণ, হস্তান্তর বা বিক্রির ক্ষেত্রে জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা ইচ্ছাকৃত অবমূল্যায়নের সঙ্গে জড়িত হলে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড বা ২ কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব অপরাধ আমলযোগ্য, অমীমাংসনীয় ও অজামিনযোগ্য করার প্রস্তাব রয়েছে।
কর-ভ্যাটে ছাড়ের সুযোগ
ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম উৎসাহিত করতে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্পদ অধিগ্রহণ, ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তর, বিনিয়োগ, আয় বা মুনাফার ক্ষেত্রে কর, ভ্যাট, শুল্ক, স্ট্যাম্প শুল্ক ও নিবন্ধন ফি পুরোপুরি বা আংশিক মওকুফ বা কমাতে পারবে। পাশাপাশি বিনিয়োগে প্রণোদনা, কর অবকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ ও প্রত্যাবাসনের সুবিধা দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
ব্যাংক খাতে বড় সংস্কারের প্রয়োজন
সিএজি মুসলিম চৌধুরীর মতে, খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধানে শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন যথেষ্ট নয়। ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে ধাপে ধাপে ব্যাংক লিকুইডেশন, একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের পথে যেতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া এবং বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের জন্য আইনগত কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মলম লাগিয়ে লাগিয়ে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার। তা না হলে এক জায়গার সমস্যা সাময়িকভাবে ঢেকে অন্য জায়গায় নতুন সমস্যা তৈরি হবে।
মালিকের চেয়ে পেশাদার পরিচালকদের গুরুত্ব
ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে করপোরেট গভর্ন্যান্সে বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ব্যাংক পরিচালনায় মালিকপক্ষের অতিরিক্ত প্রভাব কমিয়ে পেশাদার ও স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা বাড়াতে হবে।
অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘ সময় ধরে একই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকে মালিকের অর্থের তুলনায় সাধারণ আমানতকারী ও জনগণের অর্থ অনেক বেশি থাকে। তাই কোনো ব্যাংককে ব্যক্তিগত ‘আমার ব্যাংক’ হিসেবে পরিচালনার সুযোগ থাকা উচিত নয়। jagonews