সালতা ক্যাপিটেল লিমিটেড নামে একটি ব্রোকারেজ হাউজ জালিয়াতির মাধ্যমে ১৪ হাজার গ্রাহকের প্রায় শত কোটি টাকা মেরে দিয়েছে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে দুই ক্যাটাগরির গ্রাহকের টাকা ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে-এমন অভিযোগে কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (বিএসইসি)। টাকা মেরে দেওয়ার পর চট্টগ্রামের সব শাখা অফিস সালতা ক্যাপিটেল বন্ধ করে দিয়েছে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শহীদুল্লাহ শাহজাহান নিজেও ‘লাপাত্তা’ হয়ে গেছেন বলে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবস্থাপকরা কেউ ফোন বন্ধ রেখে, কেউ চাকরি ছেড়ে দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের চাপ সামাল দিলেও নির্বিকার এমডি ‘নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন’।
জানা গেছে, ২০১১-১২ সালের দিকে যাত্রা শুরু করে সালতা ক্যাপিটেল লিমিটেড। চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে শাখা অফিস খুলে জমিয়ে তুলে ব্যবসা। প্রথম প্রথম সুনাম অর্জন করলেও শেষের দিকে এসে গ্রাহকের টাকার দিকে বদনজর পড়ে কোম্পানির অসাধু মালিকদের। তারা নানা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করতে থাকেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ কোম্পানির গ্রাহক সংখ্যা ১৪ হাজারের মতো। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) থেকে ২৭ কোটি টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টে থাকা ৭২ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার গোপনে বিক্রি করে পুরো টাকা তুলে নিয়েছে। এতে রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে গেছেন গ্রাহকরা। আত্মসাতের ক্ষেত্রে তারা ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের একাধিক ভুয়া ভার্সন ব্যবহার করেছে। তারা স্টক এক্সচেঞ্জকে এক ধরনের ডেটা দেখাত, আর গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করতে সফটওয়্যারের অন্য একটি ভুয়া ভার্সন ব্যবহার করত। এর ফলে গ্রাহকরা তাদের বিও হিসাবে যে অর্থ ও শেয়ারের স্থিতি দেখতেন, তা ছিল কাল্পনিক। সূত্র জানায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মনিটরিং বিভাগের সালতা ক্যাপিটেলের টাকা সরানোর অভিযোগ তদন্ত করে। প্রাথমিক তদন্তে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা সরানোর ঘটনা ধরা পড়ে। তদন্তের এই রিপোর্ট বিএসইসিকে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে বিএসইসি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সালতা ক্যাপিটেলের লাইসেন্স স্থগিত করে।
সূত্রমতে, যারা শেয়ার ব্যবসা করেন তারা পছন্দের সিকিউরিটিজ কোম্পানি বা ব্রোকারেজ হাউজে অ্যাকাউন্ট খোলেন। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির অফিসে বসেই তারা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বেচা-কেনা করেন। বেচা-কেনায় লাভ-লোকসানের টাকা অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। আর যে ব্রোকারেজ হাউজে অ্যাকাউন্ট খোলা হয় সেই ব্রোকারেজ হাউজ শেয়ার বেচা-কেনা উভয়ক্ষেত্রেই একটি নির্দৃষ্ট অংকের কমিশন পায় গ্রাহকের কাছ থেকে। কমিশনের এই টাকা স্থানান্তরের সময় কেটে রাখা হয়।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ছাড়াও নগরীর চকবাজার, জিইসি মোড়, জুবিলী রোড ও আছদগঞ্জে সালতা ক্যাপিটেলের শাখা অফিস ছিল। গত কুরবানির আগে থেকে এই চারটি অফিসই গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগে শাখা অফিসে এসে গ্রাহকরা দেন-দরবার করতে পারলেও অফিস বন্ধ করে দেওয়ার কারণে তারা এখন সেটাও পারছে না। তবে শাখা ব্যবস্থাপকদেরকেই গ্রাহকরা প্রতিদিন ফোন করে বিরক্ত করছেন। তারা গ্রাহকদের চাপে অতিষ্ট থাকলেও নির্বিকার মালিকপক্ষ ঘুমাচ্ছেন ‘নাকে তেল’ দিয়ে।
সালতা ক্যাপিটেল লিমিটেডের জুবিলী রোড শাখার ব্যবস্থাপক ওমর শরীফ বলেন, ‘বিএসইসি আমাদের কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন করেনি, তাই লেনদেন বন্ধ রয়েছে। বাই-সেল (কেনা-বেচা) না থাকলে শাখা খোলা রেখে লাভ কী। তবে অনেক গ্রাহক আছেন যারা নিয়মিত অফিসে এসে ট্রেডিং করতেন, তারা আমাদের বিরক্ত করছেন।’ গ্রাহকদের চাপ ও ফোনের কারণে কোম্পানির চকবাজার শাখার ব্যবস্থাপক আবদুল হাদি অফিসিয়াল নম্বরটি নিজে আর ব্যবহার করছেন না। অন্য একটি নম্বর থেকে তিনি বলেন, ‘চকবাজারের শাখা অফিসটি জুনে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি নিজেও আর সালতা ক্যাপিটেলে নেই। টাকা কিভাবে কোথায় সরানো হয়েছে বা আদৌ সরানো হয়েছে কিনা তা আমার জানার কথা নয়। এগুলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন।’ আছদগঞ্জ শাখার ম্যানেজার মোকছেদুল আলমও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের আহাজারির কথা স্বীকার করেন। তাদের অফিসে প্রতিদিন অন্তত দেড়শ থেকে দুইশ গ্রাহক ট্রেডিং করতেন বলে জানান তিনি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে সালতা ক্যাপিটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম শহীদুল্লাহ শাহজাহা বলেন, ‘একটি ভুয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাদের কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন করেনি বিএসইসি। এ কারণে লেনদেন বন্ধ রয়েছে। শত কোটি টাকা সরানোর অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। শেয়ারবাজারে ধসসহ নানা কারণে গ্রাহকরা পুঁজি হারিয়েছেন। এখানে সালাতা ক্যাপিটেলের কোনো দায় নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘লাইসেন্স স্থগিত করার আগে যদি আমাদের সঙ্গে ডিএসইসি বা বিএসইসি কথা বলতো তাহলে আমরা হাতে-কলমে বুঝিয়ে দিতাম। তারাও বুঝিয়ে দিতে পারতো। যারা আমাদের কোম্পানির বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়েছেন, তারা লেখা-পড়া জানেন কিনা বা শেয়ার বাজার বোঝেন কিনা সেটি নিয়েও আমি সন্দিহান।’
(যুগান্তর)