বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন




নিত্যপণ্যের দাম একের পর এক বাড়ছে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:২৫ pm
বন্দর আমদানি বাণিজ্য import trade trade Export Promotion Bureau EPB Export Market বাণিজ্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি export shop food ভোজ্যতেল চিনি আটা vegetable Vegetables mudi dokan bazar মুদি বাজার নিত্য পণ্য দোকান mudi dokan bazar মুদি বাজার নিত্য পণ্য দোকান romzan ডলার রোজা রমজান পণ্য ভোগ্যপণ্যের আমদানি এলসি ভোগ্যপণ্য খালাস স্থলবন্দর বাজার
file pic

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে মাস দেড়েক ধরে ক্রেতাকে ভোগাচ্ছিল আটা-ময়দা। গত সপ্তাহে আরেক দফায় কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে পণ্য দুটির দাম। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এতে নতুন করে চাল, ডিমসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দর বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবে পণ্য পরিবহন ব্যয় প্রতি কেজিতে পয়সার হিসাবে বাড়লেও খুচরা বাজারে দাম বাড়ছে টাকার অঙ্কে।

ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এর মধ্যে একের পর এক নিত্যপণ্যের দর বাড়তে থাকায় কম আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নতুন করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে গরিব মানুষের টিকে থাকতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ থেকে উত্তরণে বাজারে সরকারের কড়া নজরদারি প্রয়োজন।

আটা-ময়দা কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে
বুধবার রাজধানীর নাখালপাড়া, মহাখালী, কলমিলতা কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। সপ্তাহখানেক আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা। সেই হিসাবে আটা-ময়দা কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে।

তবে খোলা আটা ও ময়দার দর কিছুটা কম। পণ্য দুটি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ ও ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে। পাঁচ-ছয় দিনের ব্যবধানে খোলা আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে পাঁচ টাকা করে।

আটা-ময়দার দাম বাড়ার বিষয়ে মহাখালী কাঁচাবাজারের কে বি স্টোরের স্বত্বাধিকারী বিকাশ বণিক বলেন, এক-দেড় মাস আগে আটা-ময়দার দাম বেড়েছিল। এখন আরেক দফা বাড়ল। নতুন করে দুই কেজির যে প্যাকেটজাত আটা ও ময়দা দিয়েছে কোম্পানিগুলো, সেগুলোর খুচরা ‍মূল্য লেখা রয়েছে ১৪০ এবং ১৬০ টাকা। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামান্য লাভ হয়। তাই গায়ের দরে বিক্রি করি।’

সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, এক মাসে প্যাকেটজাত আটার ৪ ও ময়দার ১৭ শতাংশ দর বেড়েছে।

চালের দাম বাড়ার ইঙ্গিত
আটা-ময়দার এমন উচ্চমূল্যের মধ্যেই নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে চালের বাজারে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর ট্রাক ভাড়া বাড়ার ফলে মাসখানেক ধরে স্থির থাকা চালের বাজারেও নড়চড় শুরু হয়েছে। দাম বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

‘আজ ১৫ টন চাল এনেছি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। দুই দিন আগেও ট্রাক ভাড়া দিছি ১৭ হাজার টাকা। আজ চার হাজার টাকা বেশি দিলাম। এটা আসলেই অনেক বেশি।’ গতকাল পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি এভাবেই জানালেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের বিক্রয়কর্মী মহিউদ্দিন।

তাঁর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি কেজি চালের জন্য তাঁকে আগের তুলনায় পরিবহন ভাড়া ২৭ পয়সা বেশি গুনতে হচ্ছে।

মহিউদ্দিন বলেন, ‘গাড়ি ভাড়া যেহেতু বেড়েছে, চালের দর না বাড়িয়ে উপায় নেই।’

কত বাড়তে পারে– জানতে চাইলে মহিউদ্দিনের পাশের দোকানদার মুক্তা রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. শাহজাহান বলেন, ৫০ পয়সা বাড়ার কথা। কিন্তু এখন তো আর পয়সার হিসাব নেই। হয়তো এক টাকা বাড়তে পারে। তবে এই দর এখনই বাড়বে না বলে জানান উভয় ব্যবসায়ী। তাদের ভাষ্য, এখনও আগের কেনা চাল রয়ে গেছে। নতুন করে যেসব চাল আসছে; দুই-এক দিন পর সেগুলো বিক্রি শুরু হলে তখন দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট থেকে চাল এনে মহাখালী কাঁচাবাজারে বিক্রি করে ইয়াসিন ট্রেডার্স। দোকানটির বিক্রয়কর্মী বলেন, কৃষি মার্কেট থেকে আগে ছোট পিকআপে দেড় হাজার টাকার মতো ভাড়া ছিল। এখন ২০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। বাড়তি এই ভাড়া চালের দামেই যুক্ত হবে। ফলে দাম কিছুটা হলেও বাড়াতে হবে। তাঁর মতে, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে মিলারদেরও চাল ভাঙানোর খরচ বাড়বে। কয়েক দিনের মধ্যে তারাও হয়তো দাম বাড়াতে পারে। ফলে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই চাল বিক্রেতা।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভোক্তা অধিকার সংস্থা কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংস্থাটির সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, সরকারের নজরদারি না থাকায় ব্যবসায়ীরা মনগড়া দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর বাড়তি বোঝা চাপাচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে কেজিতে পরিবহন খরচ হয়তো ১৫ থেকে ২৫ পয়সা বাড়তে পারে। কিন্তু এই অজুহাতে ব্যবসায়ীরা বাড়তি সুযোগ নেবে।

জ্বালানি তেলের দাম ধাপে ধাপে বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ানো হলো। এর নেতিবাচক প্রভাব পরিবহন থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে পড়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে একে ব্যবহার করে ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়াতে না পারে তার জন্য বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে সরকারকে।

প্রভাব পড়তে পারে চিড়া-মুড়িতে
কারওয়ান বাজারে পাইকারি দরে চিড়া-মুড়ি-খই ও গুড় বিক্রি করেন মনির হোসেন। গতকাল তিনি বরিশাল থেকে তিন হাজার ২০০ কেজি হাতে ভাজা মুড়ি এনেছেন। মনির হোসেন বলেন, নিয়মিত ১৬ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে এসেছি। অনেক দর কষাকষির পর গতকাল তিন হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিয়ে মুড়ি আনতে হয়েছে।

বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি মুড়ি মানভেদে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মনির হোসেন জানান, অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে কেজিপ্রতি তাঁকে প্রায় এক টাকা বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে। ফলে পাইকারি দরে বিক্রি করার সময় এই টাকা যোগ করেই তাঁকে বেচতে হবে। তিনি বলেন, খুচরা বাজারে এই এক টাকা হয়তো দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। শুধু চাল আর মুড়ি নয়, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের পরিবহন ভাড়া বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে এবং এর চূড়ান্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ঘাড়ে।

ভোজ্যতেল
চলতি মাসের শুরুতে বোতল ভোজ্যতেলের দর লিটারে পাঁচ টাকা বেড়েছিল। এর পরও বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকা পাঁচ লিটার বোতলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। মহাখালী কে বি স্টোরের বিকাশ বণিক বলেন, ভোজ্যতেল কোম্পানির ডিলাররা আকারে-ইঙ্গিত জানালেন, তেলের দর আরও বাড়ানোর জন্য তারা সরকারকে চিঠি দিয়েছেন। এ জন্য তারা তেল কম দিচ্ছেন।

ডিমের হালি ৫৫ টাকা
দুই মাস ধরে ডিমের বাজারও চড়া। এখন দাম আরও চড়েছে। পশ্চিম নাখালপাড়ার মা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম জানান, ভ্যানগাড়িতে তাঁর দোকানে যিনি প্রতিদিন ডিম দিচ্ছেন, তাঁকে পাইকাররা বলে দিয়েছেন– ট্রাক ভাড়া বাড়ার কারণে ডিমের দর কিছুটা বাড়তে পারে। গতকাল তিনি প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির বাদামি রঙের ডিম বিক্রি করেছেন ১৬০ টাকা দরে। তবে কেউ এক হালি (চারটি) কিনলে সে ক্ষেত্রে দাম রাখছেন ৫৫ টাকা।

প্যাকেটজাত তরল দুধ ও ফলের দাম বেড়েছে
সম্প্রতি সব কোম্পানির প্যাকেটজাত তরল দুধ লিটারে ১০ টাকা বেড়েছে। দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে আমদানি করা সব ধরনের ফলও। প্রতি কেজি মালটা ও কমলা ৪২০ থেকে ৪৫০ এবং আপেল ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লাল আঙুরের জন্য কেজিতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে পণ্যের দাম বাড়বে এবং তা মেনে নিতে হবে– বিষয়টা এমন নয়। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির জন্য কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া কত হওয়া উচিত; বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কত হতে পারে– বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন থেকে এ বিষয়ে দ্রুত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা উচিত।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কমিশনের বলা দরকার– জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে গ্রাম থেকে ঢাকায় সবজি নিয়ে আসতে পাঁচ বা ১০ পয়সা বাড়তি খরচ হবে। এর ভিত্তিতে বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলো বাজার তদারক করলে সুফল মিলবে। কারণ তথ্য-উপাত্ত হাতে থাকলে ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার-সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে বাজারে পণ্যমূল্যে সামান্য যে পরিমাণ প্রভাব পড়ার কথা, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে প্রভাব বেশি পড়ছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে আমরা ব্যবসায়ীদের সেই সুযোগ দেব না। কারণ পরিবহন ভাড়া কেজিতে ২৫ পয়সা বাড়বে; সেই অজুহাতে দাম দ্বিগুণ বাড়াবে– এই অতি মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হবে না।’

জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন বাজার তদারক করছি। পরিবহন ভাড়া কত বাড়ছে আর পণ্যমূল্য কত বাড়ছে, সেটি পর্যবেক্ষণ করছি। বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। নজরদারি আরও কঠোর হবে।’ সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD