ডি এম আব্দুল হাকিম, পীরগঞ্জ (রংপুর): রংপুরের পীরগঞ্জে সম্ভাবনাময় ও অতি লাভজনক ফসল হিসেবে কাজুবাদাম চাষের যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তা এখন শুধুই হতাশায় রূপ নিয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের দিনমজুর বাসিন্দাদের ভাগ্য বদলানোর কথা বলে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, পরিচর্যার অতিরিক্ত খরচ ও ফলন না আসায় তা এখন উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও উদ্বুদ্ধকরণে উপজেলার কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় কাজুবাদামের বাগান তৈরি করা হয়। এর অংশ হিসেবে উপজেলার বগের বাড়ী আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় আশ্রয়ণবাসীর ভাগ্য বদলাতে প্রায় ৫ বছর আগে ৫০০টি কাজুবাদামের চারা রোপণ করা হয়েছিল।
বর্তমানে গাছগুলো বেশ বড় হলেও অধিকাংশ গাছেই কাঙ্ক্ষিত ফল দেখা মেলেনি। উপরন্তু বেশ কিছু গাছের পাতা শুকিয়ে মরতে বসেছে। দিনমজুর আশ্রয়ণবাসীরা জানান, চারা রোপণের পর থেকে উচ্চ মূল্যে সার, কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ ও আগাছা নিধনে তাদের প্রচুর অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ৫ বছরেও কোনো ফল না পাওয়ায় তাদের চরম আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BMDA) ২০২২-২৩ অর্থ বছরে এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুকুর খনন, কাজুবাদাম ও অন্যান্য ফলজ বাগান তৈরি, সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাতকুয়া স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় অর্ধকোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় করে। তবে বিশাল অংকের এই সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও স্থানীয় বরেন্দ্র ও কৃষি বিভাগের কার্যকর তদারকির অভাবে ফল মেলেনি কোনো।
শুধু আশ্রয়ণ প্রকল্পই নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতেও দেখা গেছে একই চিত্র। উপজেলার বড় ভগবানপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, কৃষি বিভাগের বিনামূল্যে দেওয়া চারা এনে প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে কাজুবাদাম চাষ করেছিলেন তিনি। টানা ৫ বছর পরিচর্যা, সার-ওষুধ ও সেচ বাবদ বড় অঙ্কের টাকা ঢালার পরও গাছে কাজুবাদাম আসেনি। শেষ পর্যন্ত লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে বাধ্য হয়ে বাগান ধ্বংস করে অন্য ফসল চাষের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
একইভাবে হতাশা প্রকাশ করে আশ্রয়ণ প্রকল্পের চাষি তবারক, দুদু ও তারেক বলেন, “পাচ বছর ধরে অনেক আশা নিয়ে বাগান পাহারা ও পরিচর্যা করেছি। সব পরিশ্রম আর টাকাপয়সা জলে গেল। আমাদের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন এখন শুধুই স্বপ্নই থেকে গেল।”
প্রকল্পের ব্যর্থতা ও ফল না আসার বিষয়ে ২০২২-২৩ অর্থ বছরের প্রকল্প কর্মকর্তা ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জামিলুর রহমান বলেন, “কাজুবাদাম চাষের জন্য ওই এলাকার মাটি খুব সম্ভবত মানানসই (সুট) ছিল না।”
অন্যদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, “আমি নতুন যোগদান করেছি। ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজুবাদাম চাষ ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমার জানা নেই; বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিতে হবে।”
সঠিক মৃত্তিকা পরীক্ষা ও গবেষণা ছাড়া এমন লাভজনক ফসলের স্বপ্ন দেখিয়ে অসচ্ছল কৃষক ও আশ্রয়ণবাসীকে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত এ বিষয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বিকল্প পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।
আশ্রয়ণ প্রকল্প হলো- বাংলাদেশের একটি সরকারি উন্নয়ন উদ্যোগ, যা ভূমিহীন, গৃহহীন ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে। ১৯৯৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ছিন্নমূল পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে সেমিপাকা ঘর ও জমি প্রদান করা।