দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম জনজীবন। এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম কমবেশি বাড়েনি। এই তালিকা থেকে বাদ যায়নি যানবাহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট টায়ার-টিউবও। এতে যানবাহন পরিচালনায় বেগ পেতে হচ্ছে পরিবহন মালিকদের।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজেট ঘোষণার পর থেকে টায়ারপ্রতি গড়ে ২০০-৩০০ টাকা দাম বেড়েছে। কোনো টায়ারের দাম পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগে যে টায়ারের দাম ছিল সাত হাজার ৮০০ টাকা, এখন সে টায়ারের দাম হয়েছে আট হাজার ১০০ টাকা। তবে কোম্পানিভেদে দামের ভিন্নতা রয়েছে।
মোটরসাইকেলের টায়ারের দামও বেড়েছে। আগে যে টায়ারের দাম ছিল দুই হাজার ৫০০ টাকা, এখন তা দুই হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বাসের টায়ারের মূল্য। এক বছরের ব্যবধানে কয়েক হাজার টাকা দাম বেড়েছে। আগে যে টায়ারের দাম ছিল ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা, এখন সেটা বেড়ে ২২ হাজার টাকা থেকে ২৩ হাজার টাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। একইভাবে টিউবের দামও ৫০-১০০ টাকা করে বেড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের আর্মি মার্কেট এলাকার রবিন-হৃদয় সার্ভিস সেন্টারের মালিক রবিন। তিনি বলেন, ‘সব টায়ারের দামই বেড়েছে। পাশাপাশি টিউবের দামও বেড়েছে। দাম বাড়ার কারণে এখন আর তেমন আয় করা যায় না।’
ভাই ভাই সাইকেল স্টোরের মালিক তারা মিয়া বলেন, ‘সাইকেলের প্রতি টায়ারে প্রায় ১০০ টাকা করে দাম বেড়েছে। আগে যে টায়ারের দাম ছিল ৫০০ টাকা, এখন সেটা ৬০০ টাকা হয়েছে। টিউবের দামও বেড়েছে। আগে যে টিউব বিক্রি হতো ১৩০ টাকা, এখন সেটা ১৮০ টাকায় বিক্রি করতে হয়।’
বিগত ১০ বছর ধরে অটোরিকশা চালান মনির হোসেন। তিনি বলেন, ‘অটোরিকশা চালানো শুরু করার পর টায়ারের দাম অনেকবার দাম বেড়েছে। তবে গত এক বছরে বেশি দাম বেড়েছে। একবছর আগেও একটা টায়ার কিনতাম ১২০০ টাকায়, এখন সেটা ১৩০০ টাকায় কিনতে হয়। একইভাবে যে টিউব কিনতাম ১৮০ টাকায়, এখন সেটা ২২০ টাকায় কিনতে হয়।’
পেশায় একজন সিএনজি চালক ইসহাক মিয়া। তিনি বলেন, ‘আগে একটা টায়ার কিনতাম ২২০০ টাকায়, এখন সেটা ২৫০০ টাকায় কিনতে হয়। একইভাবে আগে যে টিউব কিনতাম ২৫০ টাকায়, এখন সেটা কিনতে হয় ৩০০ টাকায়।’
সব কোম্পানির টায়ারের দামই বেড়েছে বলে জানান শহরের চাষাঢ়া এলাকার রিয়া টায়ার অ্যান্ড ব্যাটারির মালিক মো. জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘প্রতি টায়ারে ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা দাম বেড়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির টায়ারের দাম আরও বেশি বেড়েছে। আর এই দাম বৃদ্ধির কারণে ক্রেতাদের নানারকম কথা শুনতে হয়। যারা টায়ার কিনতে আসে, তাদের কাছে দাম বললে নানারকম কথা বলে। তাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক হয়। ফলে এখন আর ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না।’
মেসার্স হোসেন টায়ারের মালিক মো. জহির রায়হান বলেন, ‘বাজেটের পর টায়ারের দাম প্রতি টায়ারে গড়ে ২০০-৩০০ টাকা বেড়েছে। আবার কোনো টায়ারে পাঁচ হাজার টাকাও বেড়েছে। আগে যে টায়ারের দাম ছিল সাত হাজার ৮০০ টাকা, এখন সে টায়ারের দাম হয়েছে আট হাজার ১০০ টাকা। একেক কোম্পানির দাম একেকরকম দাম বেড়েছে। এককইভাবে মোটরসাইকেলের টায়ারের দামও বেড়েছে। আগে যে টায়ারের দাম ছিল দুই হাজার ৫০০ টাকা, এখন সেটা দুই হাজার ৭০০ টাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘টিউবের দামও প্রায় ১০০ টাকা করে বেড়েছে। টায়ার আর টিউবের দাম বাড়ার কারণে বর্তমানে ব্যবসা বেশি ভালো যাচ্ছে না। ক্রেতাদের কাছে অনেক জবাবদিহি করতে হয়। কেন দাম বেড়েছে তারা জানতে চায়। তখন আমাদের কাছে আর কোনো জবাব থাকে না।’
মারিয়া টায়ার অ্যান্ড ব্যাটারির মালিক আবু সালেক জানান, ৭-৮ মাস আগে টায়ারের যে রেট ছিল, এখন বিভিন্ন সাইজের টায়ার দাম ৫০০ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। টায়ারের মধ্যে বেশি চলে ১৫ থেকে ১৪ সাইজ। সেটা ৬০০ টাকা থেকে ৮০০ কিংবা এক হাজার টাকাও হয়ে গেছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম চাইলে বলে বেশি দাম চাচ্ছি। এই অবস্থায় একটা টায়ারে ২০০ টাকা আয় করতেই কষ্ট হয়ে যায়। বেচাকেনা অবস্থা খুবই খারাপ। মালামালের দাম অনেক বেড়ে গেছে। টিউবের দাম ১৮০ টাকা থেকে ২১০ টাকা হয়েছে।’
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে চলাচলকারী আনন্দ পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ নম্পাদক নুরুল আমিন বলেন, ‘বাসের প্রতি চাকায় পাঁচ হাজার টাকা দাম বেড়েছে। আগে একটি টায়ারের দাম ছিল ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। এখন সেটা বেড়ে ২২ হাজার টাকা থেকে ২৩ হাজার টাজার টাকা হয়েছে। একইভাবে টিউবের দাম ১১০০ টাকা এখন সেটা ১৪০০ টাকা। সেই সঙ্গে একটি টায়ার-টিউব বেশিদিন যায় না। রাস্তা খারাপ থাকলে কয়েকদিন পরপরই টায়ার- টিউব পরিবর্তন করতে হয়।’
পরিবহন খাতের সবকিছুর দামই বেড়েছে বলে জানান জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সভাপতি রওশন আলী সরকার।
তিনি বলেন, ‘এক বছরের ব্যবধানে টায়ার ও টিউবের দামও বেড়েছে। বাসের চাকার দাম গত কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বেড়েছে। বর্তমানে পরিবহন ব্যবসায় সম্পূর্ণ লসের মধ্যে আছি। এই অবস্থায় ব্যবসা ধরে রাখাটাই চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে। ব্যবসা করতে গিয়ে বাসা থেকে খরচ নিয়ে আসতে হচ্ছে। পরিবহনের সঙ্গে যারা আছেন সবাই খারাপ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন।’
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলার সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বনিক বলেন, ‘নিয়মিত বাজার তদারকি কার্যক্রম চলমান। কেউ ন্যায্যমূল্যে পণ্য পেতে প্রতারিত হলে, আমাদের কাছে অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেবো। জাগো নিউজ