বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৮ অপরাহ্ন




মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে নিত্যপণ্যের দাম দ্বিগুণেরও বেশি: সিপিডি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬ ৬:০৭ pm
CPD logo CPD Centre for Policy Dialogue CPD সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি
file pic

কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য ভোক্তার টেবিলে পৌঁছাতে একাধিক ধাপ পার হওয়ার সময় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে দাম। মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় চাঁদাবাজির কারণে দেশের অন্তত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃষক পর্যায়ের তুলনায় কখনো কখনো দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে। গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ (সিপিডি) পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীতে নিত্যপণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে এ চিত্র তুলে ধরা হয়। সংলাপে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, একাধিক অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

সিপিডির গবেষণায় দেশের ৮১০টি বাজার ঘুরে ১০টি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সব পণ্যের ক্ষেত্রেই একই পর্যায়ে দাম বাড়ে না; বরং পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, চাল উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রক্রিয়ায় চালের গড় দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মধ্যে মিলার পর্যায়েই কেজিপ্রতি গড়ে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে।

ডালের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা সবচেয়ে বেশি মূল্য বাড়ান। একই চিত্র মরিচের বাজারেও দেখা গেছে। মরিচের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা গড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেন।

অন্যদিকে বেগুন ও আলুর বাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেন খুচরা বিক্রেতারা। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রান্তিক পাইকারদের পর্যায়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে এসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমিষ জাতীয় পণ্যের বাজারেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, মাছের দামের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি ঘটে শহরের আড়তদার পর্যায়ে। ডিম ও মুরগির বাজারে পাইকাররা বড় ভূমিকা রাখেন। আর গরুর মাংসের ক্ষেত্রে ব্যাপারীদের হাত ধরে কেজিপ্রতি গড়ে প্রায় ৭৫ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়।

সংলাপে সিপিডি’র সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফারুক আল কবীর গবেষণার বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন। পরে অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে কৃষক ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দাম গুনতে হয়।

গবেষণার পর্যবেক্ষণের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন পরিকল্পনায় এখনো তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ফলে কোনো বছর কোনো পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়, আবার কোনো বছর অতিরিক্ত উৎপাদন হয়। এতে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও স্বীকার করেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজি একটি বাস্তব সমস্যা। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

সংলাপে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের অস্বাভাবিক মুনাফা নিয়ন্ত্রণ, কৃষিপণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তথ্যভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়; বাজার কাঠামো, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং বাজারে আধিপত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি জানান, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে মানুষকে সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

ফখরুদ্দিন আল কবীর বলেন, এপ্রিল ২০২৩ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ২০২৪ সালে কিছুটা কমলেও বর্তমানে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) প্রায় ৫৯ শতাংশই খাদ্যপণ্যের ওপর নির্ভরশীল।

গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের খাদ্যে ব্যয়ের হার মাত্র ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা নিম্নআয়ের মানুষকেই বহন করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আজ যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার বাজার করতে পারছে, পরদিন একই অর্থে সমপরিমাণ পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মানুষকে জীবনযাত্রার মান ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে আপস করে চলতে হচ্ছে।

গবেষণায় ১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা মূলত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে।

চালের সরবরাহ ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়, উৎপাদক থেকে বেপারি, অটো রাইস মিলার, নগর আড়তদার হয়ে খুচরা বিক্রেতার কাছে চাল পৌঁছায়। এই শৃঙ্খলে মিলারদের পর্যায়েই মূল্য ব্যবধান বা পারসেন্টেজ স্প্রেড সবচেয়ে বেশি।

গবেষণায় আরও বলা হয়, সরবরাহ চেইন যত দীর্ঘ হয়, খামার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হারও তত বেশি হয়। তবে শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদেরই মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দায়ী করা যায় না। বাজারের প্রতিটি স্তর যদি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সেগুলো প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতে পারে।

গবেষণায় খামার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হার তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, সবুজ মরিচে ১১৬ শতাংশ, চালে ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, মুরগিতে ২২ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ এবং রুই মাছে ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।

খাদ্যবাজারে মূল্য অস্থিরতা কমাতে গবেষণায় কয়েকটি সুপারিশও করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- অপ্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী স্তর কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ করা, পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে সরাসরি সংযোগ বৃদ্ধি, খামার, পাইকারি ও খুচরা বাজারের মূল্য তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং আধুনিক গুদাম, কোল্ড চেইন ও পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এছাড়া কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডলসহ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেন।

সংলাপে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং গত চার বছর ধরে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। নিম্নআয়ের মানুষের ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যে চলে যায়। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে শুধু খাদ্য কেনাই কঠিন হয় না, একটি পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সঞ্চয়ের মতো প্রয়োজনীয় ব্যয়ও সংকুচিত হয়ে যায়।’’

অন্য পণ্য নিয়ে কী বলছে সিপিডি
সিপিডির একই গবেষণায় অন্যান্য পণ্য নিয়েও বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একইভাবে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে মসুর ডালে দাম বাড়ছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচে ১১৬ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ, মাছে ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগিতে দাম বাড়ছে ২২ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী যা বললেন
বাংলাদেশে কেন উচ্চ মূল্যস্ফীতি—এ বিষয়ে অনুষ্ঠানে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, কোভিডের সময় বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও পরে কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে কমছে না। বাংলাদেশে ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকার অন্যতন কারণ হলো এ দেশে লজিস্টিক খরচ বেশি। সারা বিশ্বে লজিস্টিক খরচের সাধারণ হিসাব হলো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের সমান, কিন্তু বাংলাদেশে তা ১৬ শতাংশ।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, দুই বছর ধরে এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু দুই বছর আগেও আলুচাষিরা টাকা (উৎপাদন খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয়) পাননি, এখনো পান না। কেন কৃষকেরা আবার আলু চাষ করছেন? তাঁরা এই বাজার নিয়ে প্রকৃত অর্থ পান না। তাঁর মতে, সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লজিস্টিক খরচ কমাতে হবে। আমদানি খরচও কমাতে হবে। তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ চাঁদাবাজি বন্ধের কথা বলেন, আমি বলি “আনঅ্যাকাউনটেন্ট” খরচ কমাতে হবে। আমরা উৎপাদনের শুরু থেকে বাজার পর্যন্ত আসা পর্যন্ত প্রতিটি স্তর চিহ্নিত করছি, কোথায় সমস্যা আছে।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD