রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৩ পূর্বাহ্ন




৪০ বছরে ১ শতাংশেরও কম জনশক্তি রপ্তানি বোয়েসেলের

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ২২ জুলাই, ২০২৩ ৯:১১ pm
labour জনশক্তি প্রবাসী MANPOWER EXPORTS migrant workers wage worker মাইেগ্রন অভিবাসী শ্রমিক মাইেগ্রন অভিবাসী শ্রমিক রেমিট্যান্স রেমিটেন্স মজুর ডলার রির্জাভ migrant workers worker মাইেগ্রন অভিবাসী শ্রমিক
file pic

বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, স্বল্প ব্যয় ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি নতুন কর্মবাজার খোঁজার লক্ষ্য নিয়ে সরকারের জনশক্তি রপ্তানিকারক কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) গড়ে তোলা হয়। তবে গত ৪০ বছরে সে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ দীর্ঘ সময়ে ১ শতাংশেরও কম জনশক্তি রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে বোয়েসেল, যা বিদেশে রপ্তানি করা মোট জনশক্তির তুলনায় খুবই সামান্য। এর পাশাপাশি বেসরকারি এজেন্সিগুলোর মধ্যে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও বোয়েসেল সফল হতে পারেনি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢেলে সাজানোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

১৯৮৪ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ কোটি ৫১ লাখ ১০ হাজার ৬৫২ জন কর্মী বিদেশ পাঠিয়েছে সরকার। এ সময়কালে বোয়েসেলের অধীনে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩১২ জন। শতকরা হিসাবে যার পরিমাণ শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বোয়েসেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র দেখা যায়।

বোয়েসেলের দেয়া তথ্যমতে, ১৯৮৪ সালে মাত্র ৪২ জন কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে বোয়েসেল। পরবর্তী বছরে তা হাজার ছাড়ায়। ১৯৮৬ সালে ২ হাজার কর্মী পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি। এর পরের ২২ বছরে অর্থাৎ ২০০৮ সাল পর্যন্ত শ্রমিক রপ্তানিতে কখনো হাজারের ঘর ছুঁতে পারেনি বোয়েসেল। এর মধ্যে ২০০২ সালে সর্বনিম্ন ১৪৭ জন এবং ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ৭৯৬ জন কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালে দুই হাজার কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে আবারো হাজারের অংকে পৌঁছে প্রতিষ্ঠানটি। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৫ জন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সালে ১ হাজার ৮৫৮, ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালে ১ হাজার ৯৬৪, ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে ১ হাজার ৪৯৭, ২০০৬ থেকে ২০১০ সালে ৫ হাজার ৮৬০, ২০১১ থেকে ২০১৫ সালে ৩৬ হাজার ৩৮৪ এবং ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সময়কালে ৯০ হাজার ৬৬৪ জন লোকবল পাঠায় বোয়েসেল। সর্বসাকল্যে গত চার দশকে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩১২ জনকে বিদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি। যা এ সময়ে অন্যান্য এজেন্সির মাধ্যমে পাঠানো মোট জনশক্তির তুলনায় একেবারেই সামান্য।

বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মোট জনশক্তি রফতানি হয় ৫ লাখ ৫০ হাজার ৭৪২ জন। একইভাবে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ৯ লাখ ৫৩ হাজার ৬৫৭, ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালে ১১ লাখ ১ হাজার ৩২৬, ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে ১১ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৬, ২০০৬ থেকে ২০১০ সালে ২৯ লাখ ৫৫ হাজার ১৬০ জন পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০১১ থেকে ২০১৫ সময়কালে ২৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭৮, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ৫৭ লাখ ৮৮ হাজার ৯২৩ জন বিদেশে পাঠানো হয়।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বোয়েসেলের দুই কর্মকর্তা জানান, বোয়েসেল কর্মী প্রেরণ করতে বেশকিছু পদক্ষেপ অনুসরণ করে থাকে। সবসময়ই দক্ষ ও যোগ্য কর্মী পাঠানোর চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে দক্ষ কর্মী সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির জনবল রফতানি তুলনামূলকভাবে অন্যান্য এজেন্সির চেয়ে কম।

পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে তাদের দাবি, বোয়েসেলের জনবল সংকট রয়েছে। জেলায় জেলায় অফিস হওয়ার কথা থাকলেও তা এত বছরেও করা হয়নি। কর্মসংস্থান ও নতুন বাজার খোঁজার জন্য একটি টিমকে বিদেশে রাখা উচিত, সেটি না করতে পারার কারণে কোম্পানিটি আশানুরূপ সফল হতে পারছে না। বোয়েসেলের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই বলেও দাবি করেছেন তারা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রতিষ্ঠানটি ভালো করছে বলেও দাবি করেছেন এ কর্মকর্তারা।

তবে এমন পরিস্থিতির জন্য বোয়েসেলকেই দায়ী করছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার। তিনি বলেন, ‘বোয়েসেল কর্মী প্রেরণে ভালো করবে কীভাবে? কর্মী প্রেরণের জন্য বাজার খুঁজতে হয়, বিদেশ যেতে হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারা তা করতে পারে না। তারা শুধু সরকারিভাবে বা বিভিন্ন দূতাবাসের মাধ্যমে যেসব নতুন চাকরি আসে সেখানেই রিক্রুট করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বোয়েসেল একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠনাটিকে ব্যবসা করতে হবে। ব্যবসা করতে গেলে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, মার্কেটিং করতে হয়। তারা কোনো প্রতিযোগিতায় নেই, মার্কেটিংয়ে নেই। বিভিন্ন দূতাবাস, সরকারিভাবে যেসব নিয়োগ হয় আর কিছু কোম্পনি আছে যারা বোয়েসেলকে পছন্দ করে তাদের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠান কাজ করে। এটি না হলে চার দশকে ৫০ হাজারও বিদেশে নিতে পারত কিনা সন্দেহ আছে।’

তবে রফতানিকারক এ কোম্পানির পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে বেশকিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘বোয়েসেলকে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য মন্ত্রণালয় এবং বিএমইটির পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা কোম্পানিটি পায়নি। বাইরে গিয়ে ভিসা খোঁজা, ভালো ভিসা আনার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দও নেই তাদের। এসব না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কেবল জিটুজি পদ্ধতিতে শ্রমিক রফতানি করছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বোয়েসেলের সম্ভাবনা আছে। তবে তাদের কার্যপরিধি বাড়ানোর জন্য যে ধরনের অবকাঠামো, লোকবল ও উৎস প্রয়োজন, সে ধরনের অবকাঠামো দিয়ে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে না। যদিও এটা কম লোক পাঠাচ্ছে, তার পরও যারা এর মাধ্যমে যাচ্ছে তাদের হয়রানি কম, বিভিন্ন রকমের হেনস্তার শিকার হওয়ার পরিমাণ অনেক কম। আমরা চাই, বোয়েসেল থাকুক, এগিয়ে যাক। এটার দক্ষতা, ঢেলে সাজানো, বাজেট বরাদ্দ ও কর্মদক্ষতাসম্পন্ন মানুষ এখানে প্রয়োজন। সেটি করা গেলে বোয়েসেল ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।’

বোয়েসেলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন, মানবসম্পদ ও অর্থ) নূর আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী প্রেরণে বোয়েসেলের কার্যক্রম সব মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। বিদ্যমান অন্যান্য এজেন্সির সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে এটি সরকারি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের সব নিয়ম বা বিধি পালন করে আমাদের কর্মী পাঠানোর সংখ্যা সন্তোষজনক। যা একক এজেন্সিভিত্তিক সংখ্যাতাত্ত্বিক মূল্যায়নে প্রতীয়মান হয়।’

তিনি বলেন, ‘বোয়েসেল কারো সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে নিরাপদ ও দক্ষ কর্মী প্রেরণের মাধ্যমে নৈতিক অভিবাসন নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে সেবার দৃষ্টিভঙ্গি বেশি কাজ করে। নৈতিক নিরাপদ ও দক্ষ কর্মী বিদেশে প্রেরণে এটি এখন রোল মডেলের ভূমিকা পালন করছে।’

নূর আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ইউরোপের শ্রমবাজারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্র প্রসারিত করছেন। বিদেশে অধিক হারে কর্মী প্রেরণের পাশাপাশি গুণগত অভিবাসন নিশ্চিত করছেন।’ [বণিক বার্তা]




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD