রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন




টাকা তুলতে পারছেন পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬ ৬:১৬ pm
United Islami Bank BB islami bank সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
file pic

নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে স্বাভাবিক লেনদেন করতে পারছেন একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের (সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক) গ্রাহকরা। জমানো টাকা তুলতে পারছেন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাংকগুলোর শাখায় খোঁজ নিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।

পাঁচটি ব্যাংকের অনেক শাখায় এরইমধ্যে সাইনবোর্ড পাল্টে নতুন গঠিত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে ব্যানার টানানো হয়েছে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো– এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা জানান, আজ থেকে স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকরা টাকা জমা দেওয়ার পাশাপাশি আমানত বিমার আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারছেন।

এদিকে দীর্ঘদিন পরে অর্থ উত্তোলন করতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করছেন আমানতকারীরা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের রাজধানীর ধানমন্ডি শাখায় টাকা তুলতে আসা গ্রাহক আসিফ রহমান বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর টাকা তুলতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এই টাকাটা আমার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।

আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় স্কিম চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব সাধারণ গ্রাহকের হিসাবে আমানত দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আছে, তাদের অর্থ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। ‘আমানত সুরক্ষা আইন’-এর আওতায় এই অর্থ যেকোনো সময় একবারে পুরোটা তোলা যাবে।

আর যাদের হিসাবে দুই লাখ টাকার বেশি রয়েছে, তারা প্রতি তিন মাস অন্তর সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা করে দুই বছর পর্যন্ত তুলতে পারবেন।

তবে ৬০ বছরের বেশি বয়সী গ্রাহক অথবা ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত আমানতকারীদের জন্য স্কিমে মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। তারা তাদের চিকিৎসার প্রয়োজনে নির্ধারিত সীমা বা সীমার বাইরে গিয়েও আমানতের অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।

এর আগে, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় পাঁচটি ব্যাংকের সব ধরনের চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতসহ তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা এবং আগের সব চুক্তি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের টাকা পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে। এছাড়া গ্রাহক ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত উত্তোলন করতে পারবেন। যারা এখনই আমানত তুলবেন না, তারা বাজারভিত্তিক মুনাফা পাবেন এবং প্রয়োজনে আমানতের বিপরীতে ঋণ নিতে পারবেন। এছাড়া গ্রাহক আমানতের টাকা তুলতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পাঁচটি ব্যাংকের সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় চলে গেছে। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে স্থায়ী আমানতের টাকা তোলা যাবে না। তবে আমানতকারীরা তাদের বর্তমান জমা করা অর্থের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবেন। আর নতুন করে জমা দেওয়া আমানতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে।

এ ছাড়া পাঁচটি ব্যাংকে কর্মরত যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে যুক্ত হবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনে চাকরির শর্তাবলি নতুন করে নির্ধারণ করতে পারবে। তবে কেউ যদি লিখিতভাবে চাকরি না করার ইচ্ছা জানান, তাহলে তিনি ইস্তফা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

ব্যাংক রেজল্যুশন–২০২৫ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, রেজল্যুশন স্কিম কার্যকর হওয়ার দিন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্তৃপক্ষ নতুন করে ভিন্ন নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হস্তান্তর হওয়া ব্যাংকগুলোর নামে থাকা সব ব্যাংকিং কাগজপত্র বৈধ থাকবে। অর্থাৎ আগের ব্যাংকের নামে ছাপানো বা ব্যবহৃত চেকবই, ডিপোজিট স্লিপ, টাকা উত্তোলনের স্লিপ, ভাউচার, ফরম, রসিদ, আবেদনপত্রসহ সব ধরনের ব্যাংকিং দলিল এখন হস্তান্তরগ্রহীতা ব্যাংকের অনুমোদিত ও বৈধ দলিল হিসেবে গণ্য হবে।

সহজ কথায়, গ্রাহকদের নতুন কোনো কাগজপত্র নিতে বা বদলাতে আপাতত কোনো সমস্যা হবে না; আগের ব্যাংকের কাগজপত্র দিয়েই স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালানো যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, নতুন ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকদের জমা টাকা পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে এবং আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে লেনদেন চলবে। এই রেজল্যুশন প্রক্রিয়া ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ।

নতুন ব্যাংকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন জোরদার করা হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরবে এবং পুরো আর্থিক খাত আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে।

বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানীর স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধনে রূপান্তর করা হবে। তবে, শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, জয়েন্ট ভেঞ্চার, বহুজাতিক কোম্পানি ও বিদেশি দূতাবাস এ বিধানের আওতায় পড়বে না।

গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে ডজনখানেক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ তুলে নেয়। এসব অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির চাপেই ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে গভীর সংকটে পড়ে। এরমধ্যে গভীর সংকটে পড়ে শরিয়াহ ভিত্তিক এই ইসলামী ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে আর্থিক ক্ষতি দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছরের বেশি সময় ধরে এসব ব্যাংকে তারল্য সহায়তা দিলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।

ফলে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫ অনুযায়ী গত ৫ নভেম্বর এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। পরে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে।

সারা দেশে এসব ব্যাংকের ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। একীভূত হওয়ার পর একই এলাকার একাধিক শাখা মিলে একটি বা দুটি করা হবে। ব্যাংকগুলোর পরিচালন খরচ কমাতে এরই মধ্যে কর্মীদের বেতন–ভাতা ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD