উচ্চমাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সঙ্গে নিজের একটি বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার পর তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে একটি বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন।
এর আগে প্রশ্নোত্তর পর্বে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে বিলের ওপর আলোচনার সময়ও তিনি বিষয়টি উত্থাপন করেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, সংসদ অধিবেশন চলাকালে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তাদের দাবি জানাচ্ছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানান।
জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যার পরীক্ষার দিন অনেক এলাকায় বৃষ্টি হয়েছিল। অভিযোগ এসেছে, অনেক পরীক্ষার্থী ভিজে কেন্দ্রে পৌঁছেছেন এবং অনেকে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা দিতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করেছি। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সেই পরীক্ষাগুলো পুনরায় নেওয়া হবে। তখন পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যার পরীক্ষাও আবার নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারব, ইনশা আল্লাহ।’
নিজের একটি মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছেন। সে ব্যাপারে বলতে চাই, আমি কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু বলতে চাইনি। যদি কেউ আহত হয়ে থাকে আমি সিম্পলি দুঃখ প্রকাশ করছি।’
পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার দু’টি প্রশ্নে ত্রুটির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, প্রশ্নপত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল। বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ওই দু’টি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশনের প্রক্রিয়া প্রায় দুই বছর আগে শুরু হয়। ফলে এবারের প্রশ্নপত্র আগের সরকারের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশন কমিটির মাধ্যমেই প্রস্তুত হয়েছে। তারপরও সরকার ভুল শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। স্থানীয় প্রশাসন-জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। কোনো এলাকায় দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা গ্রহণ সম্ভব না হলে স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারে।
তিনি বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, জেলা প্রশাসন এবং মাঠ প্রশাসনের মতামতের ভিত্তিতেই চলতি এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সারা দেশে প্রায় ২ হাজার ৭০০টি পরীক্ষা কেন্দ্রের মধ্যে কেবল কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার কারণে সাময়িক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থাপনায় সেখানে পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে।
এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে রুমিন ফারহানা বলেন, কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পরীক্ষা এক বা দুই দিন পেছানোর দাবি জানালেও তা করা হয়নি। তিনি জানতে চান, এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা পেছাতে কী ধরনের সমস্যা ছিল।
তিনি বলেন, সারা দেশে ৬৪টি জেলায় প্রায় ২ হাজার ৭০০টি কেন্দ্রে একযোগে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে পর্যায়ক্রমে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং পরে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগের দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এ সময় ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি), আট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট সবাই তখন জানিয়েছিলেন যে আবহাওয়ার উন্নতি হবে এবং পরীক্ষা গ্রহণে কোনো সমস্যা হবে না। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ড. এহছানুল হক মিলন বলেন, পরদিন সকালে দেখা যায় কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের মাঠে পানি জমে গেছে। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেয়র, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে কলেজের পাঁচতলা ভবনে নিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, একজন পরীক্ষার্থীর পোশাক ভিজে যাওয়ায় তাকে বাড়ি থেকে পোশাক এনে পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হয়। ওই কেন্দ্রে পরীক্ষা এক ঘণ্টা বিলম্বে শুরু করা হয় এবং পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ সময় নিশ্চিত করতে পরীক্ষার সময়ও এক ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
মন্ত্রী বলেন, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ ছাড়া দেশের অন্য কোথাও পরীক্ষা গ্রহণে কোনো ধরনের দুর্যোগজনিত সমস্যা হয়নি বলে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সম্পর্কে সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাদের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নেওয়া এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আন্দোলনরতদের সরিয়ে দেওয়া শুরু করে পুলিশ।
প্রথমে পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের লাঠিপেটা করে।
এর আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড় শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন। পরে সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি চত্বরের সামনে যান শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। পরে শিক্ষার্থীরা পলাশীর মোড় হয়ে ঢাকা বোর্ডের সামনে যান। ঢাকা বোর্ডে অবস্থান নিয়ে সেখান থেকে ফিরে আবারও সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে সংসদ ভবনের সামনে যায় শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনে সিটি কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, মুন্সী আব্দুর রউফ কলেজ, উদয়ন কলেজ, মাইলস্টোন কলেজ, কমার্স কলেজ, ঢাকা ওরিয়েন্টাল কলেজ, হামদর্দ পাবলিক কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
আন্দোলনকারী পরীক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলো হলো— বৈরী আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রাখা, ১৩ জুলাই প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি তাদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়ায় অনেক পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এছাড়া সম্পূর্ণ সিলেবাস শেষ না করেই পরীক্ষা নেওয়ায় অনেকেই প্রত্যাশিতভাবে পরীক্ষা দিতে পারেননি।