অবৈধ পরিদর্শকের তদারকিতে চলছে দেশের আকাশপথ ব্যবস্থাপনা। পাইলটদের লাইসেন্স নবায়ন, চেক রাইড ও সনদ অনুমোদন সবই চলছে নিয়মবহির্ভূতভাবে। পরিদর্শকদের নেই যথাযথ লাইসেন্স কিংবা শারীরিক ফিটনেস। অনেকেই হারিয়েছেন ফ্লাইং কারেন্সি। একদিকে ভঙ্গ হচ্ছে আন্তর্জাতিক নীতিমালা। ঝুঁকির মুখে পড়েছে যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ক্যাটাগরি ওয়ান উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব অবৈধ এফওআই।অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এভিয়েশন সেফটি নয়, বিমান ইন্সপেকশনে এ চক্র বহাল থাকলে আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর ভবিষ্যৎকেও নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জানতে চাইলে বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত।’ তিনি এর বেশি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টরদের (এফওআই) অনেকের বৈধ লাইসেন্স নেই। লাইসেন্সবিহীন ও নন-কারেন্ট (নিয়মিত উড্ডয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন) এসব ইন্সপেক্টরের মাধ্যমেই পাইলটদের লাইসেন্স নবায়ন, চেক রাইড ও সার্টিফিকেশন সম্পন্ন হচ্ছে।
বর্তমানে বেবিচকে ফ্লাইট অপারেশন বিভাগে ১০ জন ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর (এফওআই) কর্মরত আছেন। তবে এদের মধ্যে অধিকাংশের বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং লাইসেন্সের বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বিশেষ পরিদর্শক ও জ্যেষ্ঠ এফওআই এনআইএম ফিরদাউস হোসাইনের বয়স ৭৫ বছর। তার হৃৎপিণ্ডে ব্লক রয়েছে এবং রিং প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ক্যাপ্টেন মনিরুল হক জোয়ার্দার (জ্যেষ্ঠ এফওআই)। যার বয়স ৬৬ বছর। বয়সজনিত কারণে তিনি ফ্লাইট পরিচালনার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তার লাইসেন্সের মেয়াদও উত্তীর্ণ হয়েছে। জানা গেছে, তারও হার্টে ব্লক রয়েছে।
ক্যাপ্টেন আজিজ আব্বাসী রফিক (জ্যেষ্ঠ এফওআই) বৈধ লাইসেন্স থাকলেও ৯ মাস ধরে ফ্লাইং কারেন্সি নেই। ক্যাপ্টেন রাফিউল হকের (জ্যেষ্ঠ এফওআই) বয়স ৮০ বছরের বেশি। তার সার্টিফিকেট বহু আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এ বছরই অসুস্থ হয়ে দুবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিনি। ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফরিদুজ্জামান (জ্যেষ্ঠ এফওআই), বয়স ৭৬ বছর। তার হার্টে রিং বসানো হয়েছে। ২০২৩ সালে ফ্লাইট পরিদর্শনে গিয়ে তিনি অবৈধভাবে বৈমানিকের আসনে বসেন। সে সময় এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি বিমান নামতে দেননি। পরে ওই যাত্রীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় মামলা হয়, যা এখনো চলমান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কোনো সরকারি আদেশ (জিও) ছাড়াই নীতিবহির্ভূতভাবে ইথিওপিয়া ও দুবাইতে ফ্লাইট পরিদর্শনে গিয়েছিলেন।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন আশরাফুল আজহার, যিনি ফ্লাইট অপারেশন ও ইন্সপেকশন বিভাগে কর্মরত। হার্ট অ্যাটাকের পরও তিনি ফ্লাইট ইন্সপেকশন ও চেক রাইড পরিচালনা করে যাচ্ছেন। অথচ তার কোনো কমার্শিয়াল ফ্লাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি লাইসেন্স ও ফ্লাইং কারেন্সি উভয়ই অবৈধ। প্রাপ্ত তথ্যমতে, তিনিও গত বছর বেআইনিভাবে সরকারি অনুমোদন ছাড়া বিদেশে ইন্সপেকশন করেছেন।
এ তালিকার একজন হলেন ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ মিয়া। বয়স ৭৬ বছর। তার লাইসেন্স ২০১৫ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেলেও ২০২৩ সালে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে এয়ারবাস ৩৩০ উড়োজাহাজের টাইপ রেটিং নেন। অথচ টাইপ রেটিং নেওয়ার পূর্বশর্ত হিসাবে সক্রিয় এয়ার ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (এটিপিএল) থাকা বাধ্যতামূলক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন আজিজ আব্বাসী রফিক বলেন, ‘আমার লাইসেন্স বৈধ রয়েছে। তবে আমার ফ্লাইং কারেন্সি নেই। এ বিষয়ে আমার এর বেশি মন্তব্য করার এখতিয়ার নেই।’ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন বলে তিনি ফোনের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।
লাইসেন্সবিহীন অন্য এফওআইদের সঙ্গেও একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে প্রশ্ন জানালেও কেউ কোনো উত্তর দেননি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘বর্তমান ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টদের অনেকের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এছাড়া নতুন করে নিয়োগ এখনো হয়নি। ইন্সপেক্টর ছাড়া সঠিক ফ্লাইট নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ এসব এফওআই দিয়ে কার্যক্রম চালানোও নীতিবহির্ভূত। নতুন যোগ্য পরিদর্শক নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দেশের এভিয়েশন নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর ভবিষ্যৎ হবে প্রশ্নবিদ্ধ।
এদিকে পাইলটদের দক্ষতা যাচাইয়ের মতো সংবেদনশীল দায়িত্বও পালন করছেন এই কর্মকর্তারা, যা আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) মৌলিক নিরাপত্তা বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
আইকাও-এর বিধিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এফওআইদের অবশ্যই বর্তমান লাইসেন্সধারী ও অপারেশনালি কারেন্ট থাকতে হবে। একজন এফওআই-কে অন্তত সেই স্তরের লাইসেন্স ও রেটিং থাকতে হবে, তিনি যেটির পরীক্ষা নিচ্ছেন। নীতিমালা অনুযায়ী, ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর (এফওআই) হতে হলে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। মূল্যায়নকারী পরিদর্শকের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স বা রেটিংয়ের সমতুল্য বা তার চেয়ে উচ্চতর বৈধ পাইলট লাইসেন্স থাকতে হবে। পাশাপাশি থাকতে হবে পর্যাপ্ত অপারেশনাল অভিজ্ঞতা। যেমন- এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (এটিপিএল) যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫,০০০ ঘণ্টা এয়ার ট্রান্সপোর্ট বিমানে ফ্লাইট অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। তাছাড়া বেসামরিক বা সামরিক এয়ার ট্রান্সপোর্টে বাস্তব পাইলট অভিজ্ঞতা এবং আগে সক্রিয় ব্যবস্থাপনা বা মনোনীত পরীক্ষক বা প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও থাকতে হয়।
বেবিচকের নিজস্ব অপারেশনস ইন্সপেক্টর নিয়োগ ও প্রশিক্ষণবিষয়ক সিভিল এভিয়েশন অর্ডার (সিপিডি ৬-১)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ সর্বদা টাইপ-রেটেড এবং সক্রিয় লাইসেন্সধারী ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর (এফওআই) রাখার চেষ্টা করবে।’ ২০২২ সালে এফওআই নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতেও তারা শুধু সক্রিয় লাইসেন্সধারীদের আবেদন আহ্বান করেছিল।
শুধু আইকাও নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টরদের (এফওআই) জন্য সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ করেছে। সিঙ্গাপুরে এফওআই হতে হলে অবশ্যই এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (এটিপিএল) থাকতে হবে। ফ্লাইট ইন্সট্রাক্টর রেটিং থাকলে তা বাড়তি যোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত হয়। ভারতে এফওআই হওয়ার শর্ত হিসাবে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল এভিয়েশন (ডিজিসিএ) কর্তৃক প্রদত্ত বৈধ এটিপিএল বাধ্যতামূলক। পাপুয়া নিউগিনিতে বৈধ এটিপিএল, কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) ও কমান্ড ইন্সট্রুমেন্ট রেটিং ছাড়া এফওআই হওয়া যায় না। তুরস্কে মাঝারি থেকে বড় আকারের আধুনিক বিমানে (যেমন বোয়িং বা এয়ারবাস) রেটিংসহ এটিপিএল থাকতে হয়, আর ওমানেও এফওআই হওয়ার জন্য বৈধ এটিপিএল অপরিহার্য।
কিন্তু বেবিচকে নিযুক্ত পরিদর্শকদের এসব ন্যূনতম যোগ্যতা অনুপস্থিত। কারও বৈধ এটিপিএল নেই, কেউ আবার বয়সসীমা অতিক্রম করায় লাইসেন্স হারিয়েছেন। তবুও তারাই ফ্লাইট নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে পরিদর্শন ও লাইসেন্স নবায়নের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে আন্তর্জাতিক নীতিমালা উপেক্ষা করে দেশের বিমান নিরাপত্তা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাইসেন্সবিহীন এফওআইদের দ্বারা পরিচালিত ইন্সপেকশন আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও) থেকে ‘সেফটি কনসার্ন’ জারির কারণ হতে পারে। ফলে অন্যান্য দেশের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লাইট পরিচালনাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করবে এবং সেই দেশে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লাইট অবতরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে।
বেবিচকের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘পাইলটদের চেক করতে গেলে পরিদর্শকদের বাস্তব অপারেশন বুঝতে হবে। ফ্লাইং কারেন্ট না থাকা মানে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। তাহলে এ রকম পরিদর্শকরা কি শুধু বই পড়ে পরীক্ষা নেবেন? এ রকম যদি হয় সেক্ষেত্রে বিষয়টি অবশ্যই যাত্রী নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’
২০১৪-১৫ সালে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) ও আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থা (আইকাও) পরিচালিত অডিটে এফওআইদের অনিয়ম ধরা পড়ে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘কয়েকজন ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর সক্রিয় লাইসেন্স হোল্ডার নন এবং তাদের পর্যাপ্ত অপারেশনাল অভিজ্ঞতা নেই, যা সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলো বর্তমানে নিউইয়র্কে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছে না। এর পেছনে মূল কারণ হিসাবে উঠে এসেছে বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি বিভাগের অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও প্রশাসনিক অনিয়ম। বেবিচকের জন্য চারটি শর্ত নির্ধারণ করেছে, যা পূরণ না করলে দেশের এয়ারলাইন্সগুলো ‘ক্যাটাগরি ওয়ান’ হিসাবে উন্নীত হতে পারবে না। ক্যাটাগরি ওয়ানে উন্নীত না হলে উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনাও করতে পারবে না দেশের বিমান সংস্থাগুলো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের এক সদস্য বলেন, ‘প্রবীণ পরিদর্শকদের আমরা মূলত অভিজ্ঞতার জন্যই ব্যবহার করছি। বয়স বেশি হলেও সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো ছাড়া আমাদের উপায় নেই। নতুন এফওআই নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়সাপেক্ষ, আবার কম বেতনের কারণে দক্ষ জনবলও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আপাতত কিছু সিনিয়র কর্মকর্তাকে রিফ্রেশার ট্রেনিং করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অনুমোদন পেলে দ্রুত নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।’
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিমান পরিদর্শক বলেন, মূলত এই অনিয়মের পেছনে কাজ করছে গোপন কমিশন বাণিজ্য। এ কারণে দক্ষ পরিদর্শক থাকা সত্ত্বেও তাদের নেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া এখানে স্বজনপ্রীতিও কাজ করছে। নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, ‘শুঁটকির বাজারে বিড়াল চৌকিদার।’ (যুগান্তর)