শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০১:২৭ অপরাহ্ন




সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, বিপাকে গ্রাহকরা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬ ১১:১৯ am
বিদ্যুৎ loadshedding energy crisis electricity power grid বিদ্যুত বিভ্রাট লোডশেডিং মেগাওয়াট
file pic

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল কার্যালয় দুর্নীতি-অনিয়মের আতুঁড় ঘরে পরিণত হয়েছে। গ্রাহক হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। টাকা ছাড়া এখানে নড়ে না ফাইল। কার্যালয়টির এক উপ-মহাব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকদের একপ্রকার জিম্মি করে রেখেছে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত আয়ে এখানে ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ানও গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। আরও একাধিক কর্মকর্ত-কর্মচারী আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনেছেন।

এদিকে এই সিন্ডিকেটের অনিয়ম-দুর্নীতির ও গ্রাহক হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে লোহাড়াগাড়া উপজেলার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন খান দুর্নীতি দমন কমিশনে-(দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পাশাপাশি সিন্ডিকেটের বিভিন্ন স্থাপনার ছবিও দুদকে জমা দেওয়া হয়েছে। দুদক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

একাধিক ভুক্তভোগী জানান, পল্লী বিদ্যুতের লোহাগাড়ার জোনাল অফিসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে গ্রাহক হয়রানি। সমস্যায় পড়ে কোনো গ্রাহক জোনাল অফিসে গেলেই যেন কর্ম সাবার। এ অফিসে গেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে। তারা নানা সমস্যার কথা বলে প্রথমেই গ্রাহককে ভয় পাইয়ে দেন। এরপর প্রস্তাব দেন টাকার। টাকা না দিলে বিদ্যুৎ আইনের ফাঁক-ফোকর দেখিয়ে কখনো মামলা, কখনো সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কখনো জরিমানাসহ নানা ভয় দেখানো হয় আগতদের। নতুন সংযোগের আবেদন অফলাইন ও অনলাইনে নিয়ে গেলে সহজেই ফাইল রিসিভ করা হয় না। নানা অজুহাতে ঘোরানো হয় সম্ভাব্য গ্রাহককে। আবার নতুন সংযোগের জন্য অফলাইন ও অনলাইনে টাকা জমা নেওয়া হলেও নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে অফলাইন ও অনলাইন বিভিন্ন তালবাহানায় বলা হয় লাইন নির্মাণের তার, ট্রান্সফরমার, মিটার নেই ও সার্ভিস ড্রপ নেই। এমন অজুহাতে সিএমও (কনজুমার মিটার অর্ডার) হওয়া শত শত গ্রাহককে ঘুরানো হয় মাসের পর মাস। তবে দালালদের কাছে গেলে এবং চাহিদা মতো টাকা দেওয়ার জন্য রাজি হলে সব সমস্যা মুহূর্তে সমাধান হয়ে যায়। সংযোগ হয় বিদ্যুৎ গতিতে। অভিনব কৌশলে একজন গ্রাহকের নামে একাধিক মিটার নিয়ে তাই উচ্চ মূল্যে বাইরেও বিক্রি করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকায়।

লোহাগাড়া উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিসে নানা অনিয়মের অভিযোগে তদন্তে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। তদন্তও হয়। কিন্তু অনিয়মে জড়িত কোনো কর্মকর্তা ও দালাল চক্রের শাস্তি হয় না। টাকার কাছে সব অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা যেন ‘হাওয়ায়’ মিলিয়ে যায়।

সম্প্রতি একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেন চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জিএম প্রকৌশলী দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় সাতকানিয়া উপজেলা জোলান অফিসের ডিজিএম মো. মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় এজিএম (ইএন্ডসি) মো. আজহারুল ইসলাম আবিরকে।

লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিসের ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খান, জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান, ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান মো. সেলিম ও মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। তারা নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে পল্লী বিদ্যুতের টাকা লুটপাটে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ আছে। বাণিজ্যিক সংযোগ থেকেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নতুন সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি খাম্বা বাবদ নির্দ্দিষ্ট অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় এই চক্রটি। গুরুতর অভিযোগে মধ্যে রয়েছে- পদুয়া সাবস্টেশন সংলগ্ন ৩৩ কেভি সোর্স লাইন ঝুঁকিমুক্তকরণের অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ডিজাইন বর্হিভূত কাজ পরিচালনা।

লোহাগাড়া জোনাল অফিসের চুনতি এলাকায় গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর আমিনুর রহমান নামে একজন গ্রাহকের একই স্থাপনায় নিয়ম বর্হিভূতভাবে দুইটি বানিজ্যিক মিটার ১১ কেভিতে সংযোগ প্রদান করা হয়। একটি সংযোগের হিসাব নং-৭৫৯-৬০৭০, চুক্তিবদ্ধ লোড-৭৬ কিলোওয়াট। অন্যটির হিসাব নং-বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী ৮০ কিলোওয়াট পর্যন্ত লোডে সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে ট্রান্সফরমার অফিস কর্তৃক সরবরাহ করা হবে এবং ৮০ কিলোওয়াটের বেশি লোডের ক্ষেত্রে গ্রাহক কর্তৃক ট্রান্সফরমার সরবরাহের বিধান রয়েছে। এক্ষত্রে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে গ্রাহককে বিশেষ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে নীতিমালার ব্যত্যয় করে একই স্থাপনায় পরপর দুইটি বানিজ্যিক সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।

এতে গ্রাহককে বিনামূল্যে ৬টি ২৫ কেভি ট্রান্সফরমার অফিস হতে সরবরাহ করে এবং দুইটি এলটি মিটারিং করে গ্রাহককে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একই স্থাপনায় একটি সংযোগ সমীচীন ছিল এবং তা হলে গ্রাহক কর্তৃক ট্রান্সফরমার ক্রয় করতে হত এবং এইচটি মিটারিং হত। তা না হওয়ায় অফিস বা সরকার মোটা অংকের আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

একইভাবে লোহাগাড়া সদরের ট্যান্ডল পাড়া এলাকার মো. আনোয়ার হোসেন নামে এক গ্রাহকের ১২ কিলোওয়াটের লোডের একটি নির্মাণ সংযোগ আবেদনের বিপরীতে ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খানের নির্দেশে কোনো অনুমোদিত স্টেকিং শিট এবং কার্যাদেশ ছাড়াই মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অথচ গ্রাহকের আঙ্গিনায় একটি এক ফেজ নির্মাণ সংযোগ বিদ্যমান আছে।

লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের খালেকের দোকান এলাকায় মো. ফরিদুল আলম নামে অপর এক গ্রাহকের ৫০ কিলোওয়াটের লোডে একটি রাইচ মিলের আবেদনের বিপরীতে অনুমোদিত স্টেকিং শিট ও কার্যাদেশ ছাড়াই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে একই ঠিকাদার কর্তৃক পুশ পোলসহ এক স্প্যান লাইন নির্মাণ ও ২৫*৩ কেভিএ ট্রান্সফরমার স্থাপনসহ সার্ভিস ড্রপ প্রদান করে এবং উক্ত রাইচ মিলে সংযোগও প্রদান করা হয়। অনুমোদিত স্টেকিং শিট ও কার্যাদেশ ছাড়া ঠিকাদারকে স্টোর হতে মালামাল ইস্যুর কোনো সুযোগ নেই বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বলা হয়, মালামাল ইস্যু না করা সত্ত্বেও সেখানে কিভাবে লাইন নির্মাণ হল, মালামাল কোথা থেকে পেল তা যাচাই না করেই সংযোগ প্রদান উদ্দেশ্য প্রণোদিত। তাছাড়া জোনাল অফিস প্রদত্ত পেন্ডিং বহুতলা আবাসিক ও শিল্প সংযোগ তালিকা অনুযায়ী ২০২৪-২৫ সালের একাধিক শিল্প আবেদনের লাইন নির্মাণ অদ্যাবধি সম্পন্ন না হলেও তাকে বিদ্যুৎ গতিতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও অনলাইনে সংযোগের ক্ষেত্রে ডিজিএম আইডি থেকে অর্থের বিনিময়ে দালাল চক্রের কাজগুলো আগে করে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সাবেক জিএম দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী জানান, লোহাগাড় জোনাল অফিসের কিছু গুরুতর অনিয়মের ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত করিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল। অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে ছিলাম। এরপর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আমার জানা নেই।

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান সেলিম ও মোজাম্মেলের কী নেই! লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নানা অপকর্মের মূলহোতা এই ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান সেলিম। তার বাড়ি লোহাগাড়া উপজেলা পূর্ব কলাউজান এলাকায়।

শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কানুরাম বাজার থেকে সামনে বামে আদারচর সড়ক দিয়ে ঢুকলেই সেলিমের বিলাসবহুল বাড়ি। রাস্তার পাশে বিশাল আকারের বাণিজ্যিক সাইনবোর্ড। এক সঙ্গে দুইটি বাড়ির নির্মাণ কাজ চলছে। একটি বাণিজ্যিক ভবনের নাম দেওয়া হয়েছে সেলিমের পিতার নামে ‘আহমদ হোসেন টাওয়ার’। বিশাল বিলবোর্ডে লেখা রয়েছে দোকান, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফ্যামিলি বাসা ভাড়া দেওয়া হবে।’

আদারচর রাস্তার পশ্চিম পাশে সেলিমের আরও একটি আবাসিক ভবনের কাজ চলছে। এলাকাবাসী জানান, একসঙ্গে দুইটি বাড়ির কাজ চলছে। দেখা ভবনটির একতলার পিলার উঠে গেছে। পাশে হাজার হাজার ইটের স্তুপ করা রয়েছে। বালি ও রড মজুত করে রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে কলাউজান এলাকায় বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতি করে সেলিম। তার বিরুদ্ধে কথা বললে নানা অত্যাচার নেমে আসতো।

কলাউজান এলাকায় হেলাল নামে এক বাসিন্দা তার বাড়ির উঠানের ওপর দিয়ে বিদ্যুতের লেইন নিতে বাধা দিলে সেলিম নিজ হাতে তাকে কুপিয়ে জখম করে। তারপরও ভয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট লোহাগাড়া থানার তৎকালীন ওসি আরিফের রুমে বিক্ষুব্ধ লোকজন তাকে গণধোলাই দেয়। বতর্মানে সেলিম জামায়াত-বিএনপির ‘খাস লোক’ পরিচয়ে দিয়ে আবার নানা অপকর্ম শুরু করেছে।

সেলিমের রয়েছে আমিরাবাদ স্টেশনে ‘ওয়েল ফুড’ নামে বিশাল শোরুম। এতে কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে তার। এ ছাড়া তার লোহাগাড়া উকিলের এলাকায় রয়েছে ‘ফ্রেশ বাইট’ নামে একটি বিশাল বেকারি। গত বছর প্রায় ৪ কোটি টাকার খরচ করে বটতলী কাঁচা বাজার ঠিকাদারী নিয়েছিলেন এই বিতর্কিত সেলিম।

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান সেলিম বলেন, ‘আমি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে কাজ করি। এখানে দালালির কিছু নেই। তার কাছে বিপুল সম্পদ থাকা কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি ল্যান্ডের ব্যবসা করি। আমিরাবাদে ‘হালাল ডাইন’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিয়েছিলাম। এটিকে লস করেছি। ‘ওয়াল ফুড’ প্রতিষ্ঠানটি আমরা দুজনের। ‘ফ্রেশ বাইট’ নামে প্রতিষ্ঠানটি ৯ জনের নামে। এছাড়া গত বছর আমিরাবাদ কাঁচা বাজার একটি সিন্ডিকেট করে ইজারা নিয়েছিল বলেও তিনি স্বীকার করেন।

একইভাবে ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ানে মোজাম্মেল হকেরও অনিয়মের শেষ নেই। লোহাগাড়া উপজেলার লোহার দীঘির পাড়ে তার রয়েছে তিন তলা বাড়ি। পল্লী বিদ্যুতের অফিস ঘেঁসে রয়েছে ‘ইমতিয়াজ ইলেকট্রনিক্স’ একাটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া নামে বেনামে রয়েছে তার অঢেল সম্পদ।

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান মোজাম্মেল হক বলেন, ‘দুদক অভিযোগগুলো যাছাই করুক। বাড়িসহ আমার কাছে সবকিছু আছে জানান তিনি।’

জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান বলেন, তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি এই অফিসের যোগদান করেছি মাত্র এক বছর। আমরা নিজেরাও অফিসকে দালালমুক্ত রাখার চেষ্টা করছি। আমি কোনো অনিয়মে জড়িত নই।

পল্লী বিদ্যুৎ লোহাগাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খান সোমবার বিকালে বলেন, কিছু কিছু অনিয়ম হয়েছে এসব আমার জানা আছে। যে কোনো সংস্থা তদন্ত করুক সমস্যা নেই। ইলেকট্রিশিয়ান সেলিম ও মোজাম্মেল হকের কাছে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস জিম্মি কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা হাইকোর্ট থেকে রায় নিয়ে আসছে যাতে অফিসে কাজ করতে পারেন। তবে তার কাছে রায়ের কপি নেই বলে জানান।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD