‘এলাকায় যে কয়ডা দুকান, সব বন্ধ। শহরে আইসেও কোনো ব্যবস্থা করতি পারিনি। এই যে দেহেন, ড্রাম খালি। আমার নিজের ধানও যাচ্ছে, অন্যদেরও যাচ্ছে। গাড়িআলারা তেল পাচ্ছে, আমরা কৃষকরা পাচ্ছিনে। আমরা তো আর তেল নিয়ে নষ্ট করিনে।’
নড়াইল সদর উপজেলার মাছিমদিয়া এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে গতকাল কথাগুলো বলছিলেন কৃষক কবির হোসেন। সকাল থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে শহরের এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছেন। কোথাও ডিজেল পাননি। তাঁর বোরো ধানের জমিতে এখনই সেচ না দিলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা আছে।
এই অবস্থা নড়াইলের কবির হোসেনের একার নয়। দেশের উত্তরাঞ্চল, হাওরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রতিনিধিরা প্রায় একই রকম তথ্য পাঠিয়েছেন। এখন বোরো ধানের ভরা মৌসুম। বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর। ফেব্রুয়ারি থেকে মে– এই সময়ে জমিতে নিয়মিত এক দিন পরপর সেচ দিতে হয়। এলাকাভেদে ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত বোরো ধানের চাষাবাদ হলেও ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ক্ষেত পুরোপুরি সেচনির্ভর থাকে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে। এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ প্রায় অসম্ভব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রবি মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচনির্ভর ফসলের চাষ হয়। চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ৮ মার্চ পর্যন্ত ৪৮ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। শুধু রংপুর অঞ্চলেই পাঁচ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে, যার ৩৫-৪০ শতাংশ পুরোপুরি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
তবে সরকার বলছে, দেশে সেচের জ্বালানির সংকট নেই। তেলের অভাবে কোথাও সেচকাজ ব্যাহত হয়নি। সরকারের তরফে আশ্বস্ত করে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন আর জ্বালানির জন্য এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতোমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখন আর পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুর থেকে ৪১ শতাংশ, ২৪ শতাংশ মালয়েশিয়া, ১৪ শতাংশ ভারত, ২১ শতাংশ অন্যান্য দেশ থেকে ডিজেল আসছে। তবু বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষকরা কৃষির জন্য আলাদা ডিজেল বরাদ্দ, ড্রাম ব্যবহারকারীদের জন্য তেল বিক্রির স্পষ্ট নির্দেশনা, মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ডিজেলে ভর্তুকি ও বিদ্যুৎচালিত সেচ সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেছেন, বোরো থেকে আসে ৬০ শতাংশ চাল। এটা পুরোটাই সেচনির্ভর। সংকট নিরসনে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকের কাছে সরাসরি ডিজেল বিক্রি করতে হবে।
কৃষক মনে উদ্বেগ
মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম থেকে প্রতিনিধিরা জানান, বেশির ভাগ পাম্পে সীমিত পরিমাণে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার ড্রাম বা জারিকেনে তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি গ্রামের বোরো চাষি হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘পাম্পে গেলে এক থেকে দুই লিটার তেল দেয়। তিন বিঘা জমিতে সেচ দিতে গেলে এটা দিয়ে কিছুই হয় না।’ হাজরাহাটি গ্রামের কৃষক সাব্বির মুন্সি বলেন, ‘তেল পেতে লাইন ধরতে হয়। চাহিদামতো পাওয়া যায় না। এ সময় ধান ও ভুট্টায় বেশি পানি লাগে। তেল না পেলে কীভাবে সেচ দেব?’
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের কৃষক রুস্তম আলী বলেন, ‘আগে ১০৫-১১০ টাকায় তেল পেতাম, এখন ১২০-১৩০ টাকা দিয়েও পাই না।’ মিঠামইনের কৃষক সুজন মিয়া বলেন, ‘এই সময় ধানের শীষ বের হয়। পানি না দিলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। তেল নেই, পাম্পও কম দিচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জে কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, ১০ বিঘা জমিতে প্রতিদিন ৫ লিটার ডিজেল লাগে। পাম্প থেকে তা পাওয়া যাচ্ছে না।
ঠাকুরগাঁওয়ে অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ। কিছু স্টেশনে অল্প পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে। কুড়িগ্রামে ড্রাম বা জারিকেনে তেল বিক্রির স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পাম্পগুলো কৃষকদের তেল দিচ্ছে না। শ্যালো পাম্প চালাতে না পেরে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন।
নাটোরের বাগাতিপাড়ার কৃষক মালেক আলী বলেন, ‘জমিতে পানি দিতে পারছি না। সামনে ঝড়বৃষ্টি, সময়মতো ফসল তুলতে না পারলে বড় ক্ষতি হবে।’
নড়াইলের কৃষক শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখন বোরোর ভরা মৌসুম চলতিছে। আমি ২০ কিলোমিটার দূর থেকে ড্রাম নিয়ে আইছি ডিজেল নিতে। তিনটে পাম্পে গেছি, তিনটেই বন্ধ, ডিজেল নেই। কীভাবে কৃষকরা ধানে পানি দেবে?’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, কোথাও তেলের সমস্যা নেই। ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে কিনা– কৃষকের মধ্যে এমন আতঙ্ক কাজ করছে। তাই পাম্পগুলোতে ভিড় করছে। তবে তেলের অভাবে দেশের কোনো জমিতে সেচ দেওয়া যায়নি– এমন নজির নেই।
ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানান, মাঠ পর্যায়ে সেচের জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সক্রিয় আছেন।
পাকা গম কাটা এবং আমেও প্রভাব
মেহেরপুরে পাকা গম মাঠে পড়ে আছে, ডিজেলের অভাবে কাটার যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। কৃষক আনসার আলী বলেন, ‘গম কাটার সময় চলে গেছে, কিন্তু মেশিন নেই। তেল না থাকলে মেশিন চলবে কীভাবে?’ একই গ্রামের কৃষক লিটন আহমেদ বলেন, ‘মেশিন মালিকরা বলছেন, তেল নেই। তাই কাজ করছে না। এখন গম মাঠেই নষ্ট হচ্ছে।’
তেলের সংকট চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ওপর প্রভাব ফেলছে। বাগান মালিক সোহেল রানা বলেন, প্রতিদিন ১০ লিটার তেল দরকার হলেও পাচ্ছেন ৪-৫ লিটার। অনেকেই বিকল্প হিসেবে ব্যাটারিচালিত স্প্রে মেশিন ব্যবহার শুরু করেছেন। তবে এতে সময় ও শ্রম খরচ বেশি, আর উঁচু গাছে কাজ করা কঠিন।
সতর্কতা
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল জানান, মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশের সেচে ব্যবহার হয় শ্যালো পাম্প। বাকিটা গভীর নলকূপ ও লো-লিফট পাম্প দিয়ে সেচ হয়। দেশে চলমান প্রায় ১৪ লাখ শ্যালো পাম্পের মধ্যে প্রায় ১১ লাখই চলে ডিজেল পুড়িয়ে। বাকি লাখ তিনেক বিদ্যুৎচালিত। এগুলো বেশ কিছুর আবার স্ট্যান্ডবাই ডিজেল ইঞ্জিনও রাখতে হয়, যাতে প্রচণ্ড গরমের সময় বোরো ধানের থোড় আসার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলেও অতি আবশ্যকীয় সেচকাজ অব্যাহত রাখা যায়। একটি শ্যালো পাম্প চালাতে পুরো বোরো মৌসুমে গড়পড়তা ৩০০ লিটার ডিজেল লাগে। তবে তা জমির পরিমাণ ও মাটিভেদে কমবেশি হতে পারে।
সাত্তার মণ্ডল বলেন, জাতীয় খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সামনের প্রধান বোরো ফসলের প্রতি যে কোনো মূল্যে বাড়তি মনোযোগ দিতেই হবে। খাদ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে যেতেই হবে।
সরকার যা বলছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম জানান, মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষক ও পাম্প মালিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, গ্রীষ্মের তাপদাহ ও সেচের চাপের কারণে ডিজেল কিংবা বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি দেখা দিলে সরকার কৃষি খাতকেই অগ্রাধিকার দেবে। কৃষির সেচ কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখা হচ্ছে। সমকাল