শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন




হলি আর্টিজান মামলা হাইকোর্টের কার্যতালিকায়

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৩ ১:৩৯ pm
Holey Artisan Bakery holy restaurants restaurant হামলা গুলি বোমাবর্ষণ বোমা হলি আর্টিজান বেকারি
file pic

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে সন্ত্রাসী হামলা মামলায় সাতজনের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন) এবং আসামিদের আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টের কার্যতালিকায় এসেছে।

বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো.মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে সোমবারের কার্যতালিকার ৬ নম্বরে রয়েছে এ দুটি বিষয়। এ মামলার শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি এই বেঞ্চ ঠিক করে দেন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির (আত্মঘাতী) সদস্যরা। তাদের গুলিতে দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। পরে কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গি।

এ ঘটনায় হওয়া মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান একজনকে খালাস দিয়ে সাতজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসা‌মিরা হ‌লেন জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ। খালাস পেয়েছেন মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান।

ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালত যখন আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেয় তখন ওই দণ্ড কার্যকরের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক মামলার সব নথি হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেয়; যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। ওই নথি আসার পর হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করে। সে অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়।

দে‌শের ই‌তিহা‌সে অন্যতম নৃশংস এ হামলায় ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক ও দুজন বাংলাদেশিসহ মোট ২০ জনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গ্রেনেডের আঘাতে প্রাণ হারান বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন আহমেদ ও সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম।

হামলার পর জিম্মি অবস্থার অবসানে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গি। তারা হলো মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় নিহত হয়েছে নব্য জেএমবির আরও ৮ সদস্য। তাদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।

ওই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় একটি মামলা করেন ওই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিপন কুমার দাস। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির মামলাটি তদন্ত করে ২০১৮ সালের ১ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।

যা ঘটেছিল সেই রাতে

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, জঙ্গিদের ওই হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা— সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও ওসি সালাউদ্দিনসহ ২২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালির নাগরিক, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয় এবং একজন বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক। বাকি দুজন ইশরাত আকন্দ ও ফারাজ আইয়াজ হোসেন বাংলাদেশি নাগরিক।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, ঘটনার সেই রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে পাঁচ জঙ্গি রোহান ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে যান। রাত ৮টা ৪২ মিনিটে প্রথমে তিন জন ও এক মিনিট পরে দুই জন ব্যাগে অস্ত্র ও বোমা নিয়ে ওই রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন। হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানকার বিভিন্ন টেবিলে বসে থাকা বিদেশি নাগরিকদের এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকেন। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তাদের গলায় ও শরীরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। একইসঙ্গে বেকারির টেবিলে বসে থাকা হাসনাত করিম নামে এক ব্যক্তির পরিবার, সাত প্রকাশ নামে একজন ইন্ডিয়ান নাগরিক, তাহমিদ ও তার দুই বান্ধবীকে জিম্মি করে রাখেন তারা। তাদের সঙ্গে জিম্মি করে রাখেন বেকারির প্রায় ১৫ জন কর্মীকে।

ভয়াবহ সেই রাতের বর্ণনা দিয়ে বেকারির স্টাফ শিশির সরকার বিভিন্ন সময়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘সেই রাত ছিল ভয়াবহ। হঠাৎ করেই এলোপাতাড়ি গুলি। আমি আর একজন জাপানি নাগরিক দৌড়ে গিয়ে চিলার রুমে আশ্রয় নিয়েছিলাম। রাত ১২টা থেকে একটার মধ্যে সেই চিলার রুম থেকে আমাদের বের করা হয়। এরপর আমার সামনেই সেই জাপানি নাগরিককে গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা। আমি বেকারির স্টাফ বলে আমাকে মারেনি। কিন্তু পরে তারা আমি হিন্দু না মুসলিম জিজ্ঞাসা করে। আমি ভয়ে ও প্রাণ বাঁচাতে বলি মুসলিম। তারা আমাকে একটি সুরা বলতে বললে আমি লা ইলাহা বলি। তারা আমার কথা বিশ্বাস করে আমাকে হত্যা করেনি।’

শিশির সরকার বিভিন্ন সময়ে এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘আমি চিলার রুম থেকে বের হয়ে দেখি অতিথিদের বসার টেবিলের আশেপাশে লাশ পড়ে আছে। রক্তে ভিজে গেছে পুরো মেঝে। আমি ভয়ে হামাগুড়ি দিয়ে লাশের ওপর দিয়ে আরেক দিকে যাই। পরে জঙ্গিরা আমাকে অভয় দেয়। বলে, মুসলমানদের হত্যা করা হবে না। শেষ রাতে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আমাকে দিয়ে রান্নাও করিয়ে নেয় তারা।’

হলি আর্টিজান বেকারির আরেক স্টাফ আকাশ খানও এই প্রতিবেদকের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলাপকালে বলেন, ‘সেই রাত ছিল আমাদের জন্য ভয়ংকর একটা রাত। আমাদের সবাইকে বাথরুমে আটকে রেখেছিল। সকালে বাথরুম থেকে বের করলে রেস্তোরাঁর মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাশ পড়ে থাকতে দেখি। এই দৃশ্য আমি কখনও ভুলবো না। জঙ্গিরা আমাদের স্টাফ পরিচয় পেয়ে হত্যা করেনি। তাদের টার্গেট ছিল বিদেশি নাগরিক। এখনও সেই রাতের কথা মনে পড়লে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি।’

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ এই হামলার দুই বছরের মাথায় ২১ জনের সম্পৃক্ততা থাকার প্রমাণ পেয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় মামলার তদন্ত সংস্থা-কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। তবে ২১ জনের মধ্যে ১৩ জন অপারেশন থান্ডারবোল্টসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য অভিযানে মারা যাওয়ায় জীবিত ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল এই মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায়ে ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ড দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন। মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান নামে একজনকে খালাশ দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আদালতে আপিল করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষও খালাস পাওয়া আসামির মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করেছেন। বর্তমানে এই মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট জঙ্গিবাদবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। এর মধ্যে ঢাকার জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে গঠিত বিশেষ ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ২০টি অভিযান চালায়। এসব অভিযানে ৬৩ জন জঙ্গি নিহত হয়। হোলি আর্টিজান বেকারিতে নব্য জেএমবি নামে যে জঙ্গি সংগঠনটি হামলা চালিয়েছিল, তাদের প্রায় কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছে।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বুধবার বলেন, ‘নব্য জেএমবিকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে। তাদের আর আগের মতো শক্তি-সামর্থ্য নেই। এই সংগঠনসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই হয় অভিযানে নিহত হয়েছেন, নয়তো গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছে। আমরা নিয়মিত নজরদারি ও অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ অনেকটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনেছি। হোলি আর্টিজানের মতো ঘটনা ঘটাবার মতো শক্তি-সামর্থ্য জঙ্গিদের এখন আর নেই।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD