মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন




সীমান্তের ২১ জেলায় ব্যাংকে সোয়া ৩ লাখ কোটি টাকার নগদ লেনদেন

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৩ ৭:৪২ am
Mobile Banking মোবাইল ব্যাংকিং Bangladesh Bank Explore banking services credit cards loans financial business Guarantee Finance Investment Commerce INTER BANK ‎বাংলাদেশ ব্যাংক ‎বাণিজ্যিক ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং ‎এজেন্ট ব্যাংকিং
file pic

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় নগদ অর্থের লেনদেন বাড়ছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে (২০২১-২২) জামালপুর ছাড়া দেশের সীমান্তবর্তী আর সব জেলায় নগদ অর্থের লেনদেন ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা, যশোর, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় এ ধরনের লেনদেন হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে দিনে ১০ লাখ টাকা বা এর বেশি নগদ জমা অথবা উত্তোলন হলে সেটিকে চিহ্নিত করা হয় ক্যাশ ট্রানজেকশন (সিটিআর) বা নগদ লেনদেন হিসেবে। ব্যাংকগুলোর বিএফআইইউতে এ ধরনের লেনদেনের তথ্য জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটির সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও অপরাধ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় টুল বা মাধ্যম হলো সিটিআর।

বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, দেশের সীমান্তবর্তী ২১ জেলায় গত দুই অর্থবছরে মোট নগদ লেনদেন হয়েছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা, যেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী গত অর্থবছরে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় নগদ অর্থের লেনদেন বেড়েছে ২৭ দশমিক ২৩ শতাংশ।

এসব জেলায় নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধকে দায়ী করছে বিএফআইইউ। এ বিষয়ে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ হলো একবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। এর কারণে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। সীমান্ত এলাকাগুলো এখন মাদক ও মানব পাচার, চোরাচালানের মতো অপরাধগুলোর উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ কারণে এসব এলাকায় অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকিও বেশি। সীমান্ত এলাকায় বড় অংকের লেনদেন এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে দেশের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর তুলনামূলক একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে বিএফআইইউ।

বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরাও। তাদের ভাষ্যমতে, সীমান্তে মাদক ও মানব পাচারের মতো বিষয়গুলো আগেও অনেক বিড়ম্বনার কারণ হয়েছে। এখন এর পাশাপাশি চোরাচালানের মতো অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের ব্যাপ্তিও এখন বাড়ছে। বিশেষ করে ডলার সংকট দেখা দেয়ার পর থেকে মুদ্রাটিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় কেউ কেউ ঝুঁকে পড়ছেন অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের দিকে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় নগদ লেনদেনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার এটি একটি বড় কারণ।

জামালপুর ছাড়া সীমান্তবর্তী প্রায় সব জেলায়ই গত অর্থবছর নগদ অর্থের লেনদেন বেড়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে এ সময় নগদ লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষস্থানে ছিল কুমিল্লা। জেলাটিতে গত অর্থবছরে নগদ অর্থের লেনদেন হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরেও (২০২০-২১) এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার ১১ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে জেলাটিতে নগদ অর্থের লেনদেন বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘কুমিল্লা মাদক ও চোরাচালানের বড় রুট হয়ে উঠেছে এটি ঠিক। আমাদের এখানেই গত বছর মাদক উদ্ধার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যেহেতু এখানেই সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে তার মানে জেলাটিতে মাদক পাচার ও চোরাচালানের বড় রুট রয়েছে। তবে মানব পাচারের বিষয়টি এখানে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নেই। দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি যে বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি, তার অন্যতম হলো মাদক। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে জেলায় টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ডিএমপির মতো এখানেও মাদকের বিরুদ্ধে স্পেশাল ড্রাইভ চালু করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’

মিয়ানমারের সঙ্গে কিছু অংশ বাদ দিলে দেশের স্থল সীমান্তের পুরোটাই ঘিরে রয়েছে ভারত। সীমান্তরক্ষীসহ দেশের নিরাপত্তা খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ এ সীমান্তের বড় একটি অংশ হয় দুর্গম অথবা নদী দিয়ে চিহ্নিত। সীমান্তরক্ষীদের পক্ষে এ ধরনের এলাকায় সার্বক্ষণিক টহল চালানো প্রায় অসম্ভব। কাঁটাতারের বেড়াও নেই। এর সুবাদে সীমান্তের এপার-ওপারে পাচার হয়ে যাচ্ছে নানা ধরনের পণ্য।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২২ পঞ্জিকাবর্ষেই সীমান্তের বিভিন্ন অংশে প্রায় ১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকার (বহির্মুখী ও অন্তর্মুখী) দ্রব্য আটক করেছে বাহিনীটি। বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্য আটক হয়েছে বিপুল পরিমাণে। এছাড়া এ সময় বাহিনীটির হাতে স্বর্ণ আটক হয়েছে ১৯৫ কেজি। এর মধ্যে অধিকাংশই উদ্ধার হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত এখন বাংলাদেশ থেকে ভারতে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ এক রুট হয়ে উঠেছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার মোট ১৮৪ কিলোমিটার সীমান্তের ২০টিরও বেশি স্পট দিয়ে এখন স্বর্ণ চোরাচালান হচ্ছে। এসব এলাকা দিয়ে স্বর্ণ পাচারে যুক্ত রয়েছে অর্ধশতাধিক চক্র। গত বছর এসব জেলার সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ১৬০ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে যশোর থেকে। এখানে বিজিবির যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়ন একাই উদ্ধার করেছে প্রায় সাড়ে ৭৯ কেজি স্বর্ণ। আবার সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে নগদ অর্থের লেনদেনের দিক থেকেও গত অর্থবছরে যশোরের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। জেলাটিতে ২০২১-২২ অর্থবছরে নগদ অর্থের লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। এ সময় জেলাটিতে মোট নগদ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা।

যশোরে নগদ অর্থের লেনদেন বেড়ে যাওয়ার পেছনে সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় ব্যাংকাররাও। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) খুলনা-বরিশাল জোনপ্রধান ফকির আক্তারুল আলম বলেন, ‘সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় যশোরে চোরাচালান হয় বেশি। এখানে নগদ টাকার লেনদেনও বেশি।’

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ‘সীমান্তে নগদ লেনদেন বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, পাচারকালে যে পরিমাণ মাদক বা অবৈধ পণ্য ধরা পড়ে, নিরাপদে সীমান্ত পার হয় এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পাচারকৃত দ্রব্য কেনাবেচা হয় সাধারণত স্থানীয় মুদ্রায়। সীমান্তবর্তী সূত্র ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায়, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এখন বাংলাদেশী টাকার চাহিদা বেড়েছে। সেখানকার অনানুষ্ঠানিক পন্থায় পণ্য রফতানিকারক ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন পণ্যের মূল্য হিসেবে বাংলাদেশী টাকা গ্রহণ করছেন। স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত বাংলাদেশীরা এ টাকা আবার গ্রহণ করছেন পাচারকৃত পণ্যের মূল্য হিসেবে। আবার বাংলাদেশ থেকে স্থল সীমান্তে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খুলতে গিয়ে আন্ডার ইনভয়েসিং (আমদানি পণ্যের পরিমাণ কম দেখানো) ও হুন্ডির মাধ্যমেও টাকা পাচার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চোরাচালানের মাধ্যমে সীমান্ত পার হয়ে দুই দেশেই প্রবেশ করছে প্রচলিত ও নিষিদ্ধ নানা ধরনের পণ্য। এ তালিকায় চাল, পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিস্ফোরক ও মাদকের মতো নিষিদ্ধ পণ্যও। ভারত থেকে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে গবাদিপশু, মাদক, কসমেটিকস, শাড়ি ইত্যাদি দ্রব্য। আবার বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে তুলা, কাপড়, চামড়া, স্বর্ণ, মাছ, ইলেকট্রনিকস ও কম্পিউটার পার্টস, সার, জ্বালানি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্য।

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে গত অর্থবছর নগদ লেনদেনে তৃতীয় স্থানে ছিল দিনাজপুর। গত অর্থবছরে এখানে নগদ লেনদেন হয়েছে ২৮ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের ২১ হাজার ২০৮ কোটি টাকা থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশেরও বেশি।

পরের অবস্থানে আছে ময়মনসিংহ। জেলাটিতে ২০২০-২১ অর্থবছরে নগদ লেনদেনের মোট পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়ে গত অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকায়।

এছাড়া গত অর্থবছরে নগদ লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০-এর তালিকায় অন্য জেলাগুলো হলো সিলেট, নওগাঁ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জামালপুর, নীলফামারী ও কক্সবাজার। এর মধ্যে জামালপুর শীর্ষ ১০-এ থাকলেও গত অর্থবছরে জেলাটিতে নগদ লেনদেন কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলাটিতে নগদ লেনদেন হয়েছিল ১৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। সেখান থেকে প্রায় সোয়া ৬ শতাংশ কমে গত অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮৩২ কোটি টাকায়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে বিজিবি হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বিএফআইইউর প্রধান মাসুদ বিশ্বাস বলেন, ‘সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় আর্থিক অপরাধ চিহ্নিত ও তা প্রতিরোধ করতে তত্পরতা বাড়ানো হয়েছে। যেমন সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় এ ধরনের তত্পরতা চালাতে যেকোনো একটি ব্যাংকের শাখাকে লিড ব্যাংক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় স্থানীয় ব্যাংকের শাখাগুলোকে নিয়ে সীমান্তকেন্দ্রিক আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে সভা ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ২০২২ সালেও ১৩টি সীমান্তবর্তী জেলায় এ ধরনের কার্যক্রম চালানো হয়। সামনের দিনগুলোতেও এ ধরনের কার্যক্রম চালু থাকবে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও নিয়মিতভাবে সীমান্তকেন্দ্রিক সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য দিচ্ছে বিএফআইইউ।’ [বণিক বার্তা]




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD